২৬ অগাস্ট ২০২৬, বুধবার, ০৮:২৭:৩৩ অপরাহ্ন
শিরোনাম :


পাবলিক চার্জ যুক্তি খারিজ ফেডারেল আদালতের
বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের অভিবাসী ভিসা স্থগিতের নীতি বাতিল
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৬-০৮-২০২৬
বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের অভিবাসী ভিসা স্থগিতের নীতি বাতিল ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব স্টেট


ট্রাম্প প্রশাসনের ৭৫টি দেশের নাগরিকদের সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া বা ভবিষ্যতে পাবলিক চার্জ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার আশঙ্কা বেশি রয়েছে বলে অভিবাসী ভিসা প্রদান স্থগিত রাখার নীতিকে আইনবহির্ভূত ঘোষণা করে বাতিল করেছেন নিউইয়র্কের নিউ ইয়র্কের ফেডারেল আদালত। ইউএস সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট অব নিউইয়র্কের বিচারক জেনেট এ ভার্গাস গত ২১ আগস্ট দেওয়া ৬১ পৃষ্ঠার রায়ে বলেন, নীতিটি অভিবাসন ও জাতীয়তা আইনের একাধিক বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তার আইনগত ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করে এ নীতি জারি করেছেন।

আদালত একই সঙ্গে ওই নীতির ভিত্তিতে একমাত্র কারণে যেসব অভিবাসী ভিসা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল, সেসব প্রত্যাখ্যানও বাতিল করে সংশ্লিষ্ট আবেদনগুলো কনস্যুলার কর্মকর্তাদের কাছে পুনর্বিবেচনার জন্য পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। তবে কোনো আবেদনকারীকে অন্য কোনো স্বতন্ত্র আইনগত কারণে অযোগ্য ঘোষণা করে ভিসা প্রত্যাখ্যান করা হয়ে থাকলে সে প্রত্যাখ্যান এ রায়ের আওতায় বাতিল হবে না। বিচারক ভার্গাস ঘোষণা করেছেন যে ৭৫টি দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা স্থগিত করার নির্দেশ দিয়ে সরকার ৮ ইউএসসি ১২০১(জি), ৮ ইউএসসি ১১৫২(এ)(১)(এ) এবং ২২ সিএফআর ৪০.৬ লঙ্ঘন করেছে। একই সঙ্গে নীতিটি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ৮ ইউএসসি ১১০৪(এ)-এর অধীন ক্ষমতার সীমাও অতিক্রম করেছে।

স্টেট ডিপার্টমেন্ট গত ১৪ জানুয়ারি ঘোষণা করে যে ২১ জানুয়ারি থেকে ৭৫টি দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা প্রদান স্থগিত করা হবে। প্রশাসনের ঘোষিত যুক্তি ছিল, এসব দেশের অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি কল্যাণমূলক সুবিধা গ্রহণ বা ‘পাবলিক চার্জ’ হয়ে যাওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন। ঘোষণায় বলা হয়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চান অভিবাসীরা আর্থিকভাবে স্বনির্ভর থাকুন এবং মার্কিন জনগণের ওপর আর্থিক বোঝা হয়ে না দাঁড়ান।

একই দিনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বিশ্বের বিভিন্ন মার্কিন দূতাবাস ও কনস্যুলেটে একটি নির্দেশনা বা কেবল পাঠান। এতে ২১ জানুয়ারি থেকে সংশ্লিষ্ট ৭৫ দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা প্রত্যাখ্যানের নির্দেশ দেওয়া হয়, যদি তারা অন্য কোনো অযোগ্যতার কারণে আগে থেকেই প্রত্যাখ্যাত না হয়ে থাকেন।

কোন ৭৫ দেশ ছিল তালিকায়

আদালতের রায়ে তালিকাভুক্ত ৭৫টি দেশ হলো: আফগানিস্তান, আলবেনিয়া, আলজেরিয়া, অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বাহামাস, বাংলাদেশ, বার্বাডোস, বেলারুশ, বেলিজ, ভুটান, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, ব্রাজিল, বার্মা, কম্বোডিয়া, ক্যামেরুন, কেপ ভার্দে, কলম্বিয়া, কোট দিভোয়ার, কিউবা, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, ডমিনিকা, মিশর, ইরিত্রিয়া, ইথিওপিয়া, ফিজি, গাম্বিয়া, জর্জিয়া, ঘানা, গ্রেনাডা, গুয়াতেমালা, গিনি, হাইতি, ইরান, ইরাক, জ্যামাইকা, জর্ডান, কাজাখস্তান, কসোভো, কুয়েত, কিরগিজ রিপাবলিক, লাওস, লেবানন, লাইবেরিয়া, লিবিয়া, মলদোভা, মঙ্গোলিয়া, মন্টেনেগ্রো, মরক্কো, নেপাল, নিকারাগুয়া, নাইজেরিয়া, উত্তর মেসিডোনিয়া, পাকিস্তান, রিপাবলিক অব কঙ্গো, রাশিয়া, রুয়ান্ডা, সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস, সেন্ট লুসিয়া, সেন্ট ভিনসেন্ট অ্যান্ড দ্য গ্রেনাডিনস, সেনেগাল, সিয়েরা লিওন, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, সুদান, সিরিয়া, তানজানিয়া, থাইল্যান্ড, টোগো, তিউনিসিয়া, উগান্ডা, উরুগুয়ে, উজবেকিস্তান ও ইয়েমেন।

আদালতের মতে, এ নীতি কার্যত বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয়তার ভিত্তিতে একটি ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার মুখে ফেলেছিল।

কনস্যুলার কর্মকর্তাদের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল

রায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে কনস্যুলার কর্মকর্তাদের আইনগত ক্ষমতা। আদালত ব্যাখ্যা করে যে অভিবাসন ও জাতীয়তা আইনের অধীনে প্রত্যেক অভিবাসী ভিসা আবেদন কনস্যুলার কর্মকর্তাকে ব্যক্তিভিত্তিকভাবে যাচাই ও সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তারা আবেদনকারীর চিকিৎসাঅবস্থা, অপরাধমূলক ইতিহাস, আর্থিক অবস্থা এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য পর্যালোচনা করে ভিসা পাওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণ করেন।

আইন অনুযায়ী, কোনো আবেদনকারী ভিসার জন্য যোগ্য হলে এবং ভিসা প্রত্যাখ্যানের জন্য আইনে নির্দিষ্ট কোনো কারণ না থাকলে কনস্যুলার কর্মকর্তাকে ভিসা দিতে হয়। আবার আবেদনকারী আইনগতভাবে অযোগ্য হলে ভিসা প্রত্যাখ্যান করতে হয়। আদালত উল্লেখ করেছে, ২২ সিএফআর ৪০.৬ অনুযায়ী আইনে বা সংশ্লিষ্ট বিধিতে নির্দিষ্ট কারণ ছাড়া ভিসা প্রত্যাখ্যান করা যায় না।

কিন্তু রুবিওর নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, ৭৫ দেশের নাগরিক কোনো আবেদনকারী অন্য কোনো কারণে অযোগ্য না হলেও ২২১(জি) ধারায় ভিসা প্রত্যাখ্যান করতে হবে। ফলে কনস্যুলার কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে আবেদনকারীকে যোগ্য মনে করলেও শেষ পর্যন্ত তাকে ভিসা প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য হতেন।

বিচারক ভার্গাস লিখেছেন, কর্মকর্তারা স্বাভাবিক যাচাই-বাছাই করতে পারলেও শেষ পর্যন্ত তাদের হাতে মাত্র একটি ফলাফল রাখা হয়েছিল-ভিসা প্রত্যাখ্যান। ফলে কংগ্রেস যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কনস্যুলার কর্মকর্তাদের দিয়েছে, তা কার্যত সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

‘পাবলিক চার্জ’ নিয়ে আদালতের ব্যাখ্যা

মামলার অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল ‘পাবলিক চার্জ’ বা সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার আশঙ্কা। অভিবাসন আইনের ২১২(এ)(৪)(এ) ধারায় কোনো ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রে ভবিষ্যতে পাবলিক চার্জ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলে তাকে অযোগ্য ঘোষণা করা যেতে পারে। তবে আদালত উল্লেখ করে, এ সিদ্ধান্ত ব্যক্তিভিত্তিক হতে হবে। কনস্যুলার কর্মকর্তাদের আবেদনকারীর বয়স, স্বাস্থ্য, পারিবারিক অবস্থা, সম্পদ ও আর্থিক পরিস্থিতি, শিক্ষা ও দক্ষতা-এ পাঁচটি বিষয় বিবেচনা করতে হয়। স্টেট ডিপার্টমেন্টের নিজস্ব নির্দেশনাতেও আবেদনকারীর সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনার কথা বলা হয়েছে এবং কোনো একক বিষয় সাধারণত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করতে পারে না।কিন্তু আদালতের মতে, ৭৫ দেশের নীতি সে ব্যক্তিভিত্তিক মূল্যায়নের ফলকে কার্যত অর্থহীন করে দিয়েছিল।

মার্ক রুবিওর কেবলে বলা হয়েছিল, কর্মকর্তারা আবেদনকারীদের সাক্ষাৎকার নেবেন এবং সব ধরনের অযোগ্যতার বিষয় যাচাই করবেন। কোনো আবেদনকারীকে পাবলিক চার্জ হওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে মনে হলে সেই কারণেই প্রত্যাখ্যান করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু কর্মকর্তা যদি মনে করতেন আবেদনকারী পাবলিক চার্জ হওয়ার সম্ভাবনা নেই এবং অন্য কোনো অযোগ্যতাও নেই, তাহলেও তাকে ২২১(জি) ধারায় প্রত্যাখ্যান করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

এমনকি কোনো আবেদনকারী অতিরিক্ত প্রমাণ দিয়ে প্রমাণ করতে সক্ষম হলেও যে তিনি পাবলিক চার্জ হওয়ার আশঙ্কা থেকে মুক্ত, তবুও তাকে ২২১(জি) ধারায় প্রত্যাখ্যান করার নির্দেশ ছিল।

আগে অনুমোদিত হয়ে যাওয়া কোনো ভিসার কাগজ এখনো কনস্যুলেটে থাকলেও সেই আবেদন পুনরায় খুলে ২২১(জি) ধারায় প্রত্যাখ্যান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। আবেদনকারীকে বলা হতো, মার্কিন আইনের অধীনে তার যোগ্যতা নির্ধারণের জন্য অতিরিক্ত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া প্রয়োজন।

৭৫ দেশ কীভাবে নির্বাচিত হয়েছিল

আদালতের নথি অনুযায়ী, ৭৫টি দেশ নির্বাচনের ক্ষেত্রে কাউন্সিল অব ইকোনমিক অ্যাডভাইজার্সের সরকারি সহায়তা ও কল্যাণমূলক সুবিধা ব্যবহারের পরিসংখ্যান ব্যবহার করা হয়েছিল। বিভিন্ন দেশের অভিবাসী পরিবারের কত শতাংশ কোনো ধরনের সরকারি সহায়তা গ্রহণ করে, তা বিবেচনা করা হয়।যেসব দেশের ক্ষেত্রে সরকারি সহায়তা গ্রহণকারী পরিবারের হার ৩০ শতাংশের বেশি ছিল, সেসব দেশের নাগরিকদের সাধারণভাবে এই নীতির আওতায় আনা হয়েছিল। কিছু দেশকে পররাষ্ট্রনীতিগত কারণে ব্যতিক্রম রাখা হয়েছিল।

এ নীতি জারির আগে কোনো নোটিশ ও জনমত গ্রহণের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।

জাতীয়তার ভিত্তিতে বৈষম্য : আদালতের প্রধান সিদ্ধান্ত

বিচারক ভার্গাস বলেন, অভিবাসী ভিসা প্রদানের ক্ষেত্রে জাতীয়তা, জাতি, লিঙ্গ, জন্মস্থান বা বসবাসের স্থানের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া বা বৈষম্যের শিকার করা যাবে না-এমন স্পষ্ট বিধান রয়েছে ৮ ইউএসসি ১১৫২ ধারায়।

আদালতের মতে, ৭৫ দেশের নীতি সরাসরি জাতীয়তার ভিত্তিতে ভিসা প্রত্যাখ্যান করছিল। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো কনস্যুলার কর্মকর্তা যদি ইতিমধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন যে আবেদনকারী আইনের অধীনে অযোগ্য নন, তারপরও শুধু তার জাতীয়তার কারণে ভিসা প্রত্যাখ্যানের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছিল। আদালত এটিকে আইনের পরিপন্থী বলে ঘোষণা করে।

২০১৮ সালের ট্রাম্প ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে পার্থক্য

মামলায় ট্রাম্প প্রশাসন ২০১৮ সালের সুপ্রিম কোর্টের ‘ট্রাম্প বনাম হাওয়াই’ মামলার রায়ের ওপরও নির্ভর করেছিল। ওই মামলায় ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হয়েছিল।কিন্তু বিচারক ভার্গাস বলেন, বর্তমান মামলার বিষয়টি ভিন্ন। ২০১৮ সালের মামলায় প্রেসিডেন্টের যুক্তরাষ্ট্রে কারা প্রবেশ করতে পারবেন তা সীমিত করার ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। বর্তমান নীতি সরাসরি ভিসা প্রদান প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করছে।

আদালত বিশেষভাবে উল্লেখ করে যে সুপ্রিম কোর্ট ২০১৮ সালের রায়ে প্রবেশের যোগ্যতা এবং ভিসা প্রদানের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য স্বীকার করেছিল। বর্তমান নীতি যেহেতু ভিসা প্রদানকেই নিয়ন্ত্রণ করছে, তাই ২০১৮ সালের রায় এই নীতিকে বৈধ করার ভিত্তি হতে পারে না।

মার্কো রুবিওর ক্ষমতা অতিক্রম

আদালত আরো সিদ্ধান্ত দিয়েছে যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ৮ ইউএসসি ১১০৪(এ) ধারার অধীনে নিজের আইনগত ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছেন।

এই ধারায় কংগ্রেস পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রশাসনিক ক্ষমতার ক্ষেত্রে স্পষ্ট সীমা নির্ধারণ করেছে এবং কনস্যুলার কর্মকর্তাদের ভিসা প্রদান বা প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তার কাছ থেকে বাদ দিয়েছে। কিন্তু রুবিওর কেবল ৭৫ দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে দিয়েছিল, যদি অন্য কোনো অযোগ্যতা না থাকে, তাহলেও ভিসা প্রত্যাখ্যান করতে হবে। আদালতের মতে, এর মাধ্যমে রুবিও এমন একটি বিষয়ে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কংগ্রেস কনস্যুলার কর্মকর্তাদের দিয়েছে।

আদালত নোটিশ ও কমেন্ট দাবিও আংশিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে

বাদীরা আরো দাবি করেছিলেন, নীতিটি কার্যকর করার আগে প্রশাসনের প্রশাসনিক কার্যপ্রণালি আইনের অধীনে নোটিশ ও জনমত গ্রহণের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। আদালত এই দাবিতে সরকারের বিরুদ্ধে রায় দেয়নি।

বিচারক বলেন, নীতিটি আইনবহির্ভূত হলেও এটি এমন একটি ‘লেজিসলেটিভ রুল’ নয়, যার জন্য বাধ্যতামূলকভাবে নোটিশ ও কমেন্ট প্রক্রিয়া প্রয়োজন ছিল। আদালত আরো বলেন, নীতিটি সংশ্লিষ্ট দুটি প্রবিধান-২২ সিএফআর ৪০.৬ এবং ৪২.৮১-আনুষ্ঠানিকভাবে সংশোধন করেনি। তাই এ নির্দিষ্ট দাবিতে সরকারের পক্ষে আংশিক রায় দেওয়া হয়।

অ্যাকার্ডি নীতিও লঙ্ঘন

আদালত একই সঙ্গে অ্যাকার্ডি ডকট্রিনের অধীনেও বাদীদের পক্ষে সিদ্ধান্ত দেয়। এ আইনি নীতি অনুযায়ী, সরকারি সংস্থাকে নিজেদের বৈধ নিয়ম ও অভ্যন্তরীণ পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়, বিশেষ করে যখন তা ব্যক্তিদের অধিকার ও স্বার্থকে প্রভাবিত করে।

বিচারক বলেন, ৭৫ দেশের নীতি কেস বাই কেস মূল্যায়ন ছাড়াই আবেদন প্রত্যাখ্যান করার নির্দেশ দিয়ে স্টেট ডিপার্টমেন্টের বিদ্যমান আইন ও পদ্ধতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়েছে।

কারা মামলা করেছিলেন

মামলাটির প্রধান বাদী ছিল ক্যাথলিক লিগ্যাল ইমিগ্রেশন নেটওয়ার্ক ইনক বা ক্লিনিক এবং আফ্রিকান কমিউনিটিজ টুগেদার বা অ্যাক্ট। ক্লিনিক একটি জাতীয় অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, যা ৪৯টি অঙ্গরাজ্যে ৪১৫টির বেশি সহযোগী ক্যাথলিক ও কমিউনিটিভিত্তিক অভিবাসন আইন কর্মসূচির প্রায় তিন হাজার কর্মীকে প্রশিক্ষণ, সহায়তা ও সম্পদ সরবরাহ করে। তাদের প্রায় ৭৯ শতাংশ সহযোগী প্রতিষ্ঠান কনস্যুলার প্রসেসিং সেবা দেয়।হারলেমভিত্তিক আফ্রিকান কমিউনিটিজ টুগেদার আফ্রিকান অভিবাসী ও তাদের পরিবারকে বিভিন্ন সেবা দেয়। এর মধ্যে অভিবাসন আইনি সহায়তা, পরিবারভিত্তিক আবেদন, অ্যাফিডেভিট অব সাপোর্ট, কনস্যুলার প্রসেসিং, স্বাস্থ্যবীমা, সরকারি স্কুলে ভর্তি, পরিচয়পত্রের আবেদন, চাকরি ও নেতৃত্ব উন্নয়ন এবং খাদ্য ও আবাসনের জন্য সহায়তা রয়েছে।

মামলায় ১১ জন ব্যক্তিও বাদী ছিলেন। তাদের মধ্যে ছয়জন মার্কিন নাগরিক, যারা বিদেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রে আনার জন্য পরিবারভিত্তিক আবেদন করেছিলেন। তারা হলেন অ্যাগনেস কায়েরেমা, প্যাট্রিসিয়া রিচার্ডসন, সিজার আন্দ্রেদ আগুয়েরে, মারু মাহমুদ হাসান, মুনতাজ মাহমুদ হাসান এবং অ্যাড্রিয়ান মিচেল।

অন্য পাঁচজন ছিলেন সম্ভাব্য অভিবাসী, যারা কর্মসংস্থানভিত্তিক ভিসার জন্য নিজেরাই আবেদন করেছিলেন। তারা হলেন হুয়ান ডেভিড বুইত্রাগো কাগুয়া, আলেহান্দ্রা আলসেন্দ্রা মস্কোতে, আন্দ্রেস আলফোনসো মেদিনা রামিরেজ, ফার্নান্দো লিসকানো লোসাদা এবং লিনা মার্গারিটা অ্যাঙ্গুলো পেনারান্ডা। পাঁচজনই কলম্বিয়ার নাগরিক।

গত ১১ মার্চ পর্যন্ত তিনজন মার্কিন নাগরিক বাদীর পরিবারের সদস্যদের কনস্যুলার সাক্ষাৎকার হয়নি। অন্য পাঁচজন সম্ভাব্য অভিবাসী এবং আরো তিনজন মার্কিন বাদীর পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাৎকার ইতিমধ্যে হয়েছিল। সাক্ষাৎকার শেষ হওয়া আবেদনকারীদের ভিসা ২২১(জি) ধারায় প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। মার্কিন নাগরিক বাদীদের পরিবারের সদস্যদের জানানো হয়েছিল যে তারা ঘানা, গুয়াতেমালা ও জ্যামাইকার নাগরিক হওয়ায় নীতিটির আওতায় পড়েছেন। সম্ভাব্য অভিবাসী রামিরেজের ভিসা প্রত্যাখ্যানের নোটিশেও এই নীতির উল্লেখ ছিল।

আদালতের চূড়ান্ত প্রতিকার

আদালত বলেছে, নীতির ত্রুটিগুলো শুধু প্রক্রিয়াগত নয়; এগুলো নীতিটির মূল কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত এবং সংশোধনযোগ্য নয়। জাতীয়তার ভিত্তিতে ভিসা নিষেধাজ্ঞা, যোগ্য আবেদনকারীদের ২২১(জি) ধারায় প্রত্যাখ্যানের বাধ্যবাধকতা এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কনস্যুলার সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ-সবগুলোই গুরুতর ও মৌলিক আইনগত সমস্যা। তাই নীতিটি বাতিল করাই একমাত্র উপযুক্ত প্রতিকার।

সরকার যুক্তি দিয়েছিল, নীতি বাতিল করলে ভিসা ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে। আদালত এই যুক্তির পক্ষে কোনো প্রমাণ পায়নি। বরং আদালত বলেছে, নীতি বাতিল করলে আগের দীর্ঘদিনের ভিসা প্রক্রিয়াই পুনরায় কার্যকর হবে। আদালত স্পষ্ট করেছে, এই সিদ্ধান্ত শুধু মামলার ১১ জন ব্যক্তির জন্য সীমাবদ্ধ নয়। প্রশাসনিক কার্যপ্রণালী আইনের অধীনে কোনো অবৈধ সংস্থাগত নীতি বাতিল হলে সেটি পুরো নীতিকেই বাতিল করে। ফলে ৭৫ দেশের নীতিটি সামগ্রিকভাবে বাতিল হয়েছে।

তবে আদালত শুধু এ নীতির কারণে প্রত্যাখ্যাত ভিসাগুলো বাতিল করেছে। কোনো আবেদনকারী যদি ৮ ইউএসসি ১১৮২ বা অন্য কোনো আইনগত কারণে অযোগ্য হয়ে থাকেন, সেই প্রত্যাখ্যান বহাল থাকবে, এমনকি প্রত্যাখ্যানের নোটিশে একই সঙ্গে ৭৫ দেশের নীতির কথাও উল্লেখ করা হয়ে থাকলেও।

নীতিটি নিজে বাতিল করার ক্ষেত্রে আদালত সরকারকে পুনরায় বিষয়টি বিবেচনার জন্য রিমান্ড করেনি। বিচারকের মতে, এটি এমন একটি বিরল পরিস্থিতি যেখানে রিমান্ডের কোনো অর্থপূর্ণ উদ্দেশ্য নেই, কারণ সমস্যাগুলো মূলত আইনগত এবং আরো প্রশাসনিক আলোচনা করে সেগুলো সংশোধন করা সম্ভব নয়।

অন্যদিকে নীতির কারণে প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তিগত ভিসা আবেদনগুলো কনস্যুলার কর্মকর্তাদের কাছে ফেরত পাঠানো হয়েছে। কর্মকর্তারাই আইন অনুযায়ী প্রতিটি আবেদন নতুন করে বিবেচনা করবেন এবং আদালত তাদের কোনো নির্দিষ্ট ফলাফল নির্দেশ করেনি। তবে নতুন কোনো প্রত্যাখ্যান ৭৫ দেশের বাতিল নীতির ওপর ভিত্তি করে করা যাবে না।

আদালতের ঘোষণামূলক রায়

বিচারক ভার্গাস ঘোষণা করেছেন যে ৭৫টি দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা স্থগিত করার নির্দেশ দিয়ে সরকার ৮ ইউএসসি ১২০১(জি), ৮ ইউএসসি ১১৫২(এ)(১)(এ) এবং ২২ সিএফআর ৪০.৬ লঙ্ঘন করেছে। একই সঙ্গে নীতিটি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ৮ ইউএসসি ১১০৪(এ)-এর অধীন ক্ষমতার সীমাও অতিক্রম করেছে।

আদালত আরো বলেছে, ঘোষণামূলক রায় দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে একই ধরনের ত্রুটিপূর্ণ নীতি আবার চালু করা হলে তার আইনগত সীমা পরিষ্কার থাকে এবং একই বিষয়ে নতুন করে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের প্রয়োজন না হয়।

আদালত মামলার তিনটি দাবির মধ্যে প্রথম ও সপ্তম দাবিতে বাদীদের পক্ষে এবং তৃতীয় দাবিতে সরকারের পক্ষে আংশিক রায় দিয়েছে। বাকি দাবিগুলো নিয়ে মামলাটি চলবে। পক্ষগুলোকে আগামী ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অবশিষ্ট দাবিগুলো কীভাবে এগিয়ে নেওয়া হবে, সে বিষয়ে আদালতে যৌথ চিঠি জমা দিতে বলা হয়েছে।

গত ২১ আগস্ট নিউইয়র্কে বিচারক জেনেট এ ভার্গাস রায়ে স্বাক্ষর করেন। রায়ের ফলে ৭৫ দেশের নাগরিকদের ওপর আরোপিত সামগ্রিক অভিবাসী ভিসা স্থগিত নীতি বাতিল হয়েছে এবং শুধু ওই নীতির ভিত্তিতে প্রত্যাখ্যাত আবেদনগুলো পুনরায় কনস্যুলার পর্যায়ে বিবেচনার পথ খুলেছে।

শেয়ার করুন