বাংলাদেশ মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের অকৃত্রিম বন্ধু দেশ ভারতের সঙ্গে এখন বাংলাদেশের বৈরী তিক্ত সম্পর্ক। আর এ বৈরী সম্পর্কের জন্য দুদেশের কিছু অপরিণামদর্শী উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তিকে দায়ী করবো। অথচ দুদেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানি বণ্টন, সীমান্ত সমস্যা, বাণিজ্যিক অসমতা, সীমান্ত হত্যা, পুশইন, পুশব্যাকসহ নানা বিষয় অমীমাংসিত রয়ে গেছে। এ সমস্যাগুলো অমীমাংসিত থাকলে কখনোই পারস্পরিক সৌহার্দ্যমূলক সুসম্পর্ক স্থাপিত হবে না। প্রয়োজন দুদেশের সরকার প্রধানের মধ্যে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে সমস্যাগুলোর সমাধানে উদ্যোগী হওয়া। আর এ উদ্যোগের সূচনা হতে পারে ভারতের আমন্ত্রণে বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের মাধ্যমে।
কিছু ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম পরাশক্তি ভারতের দায় থাকলেও বাংলাদেশের ভারতবিরোধী অপশক্তির দায় কম না। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী সরকারের অপসারণের পর থেকেই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এবং স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের ভারত বিচ্ছিন্ন করার হুমকি ধামকি, নানা পলিটিকাল আস্ফালন এবং একই সঙ্গে ভারতের বড় ভাইসুলভ আচরণ দুদেশের সম্পর্ক সর্বনিম্ন পর্যায়ে উপনীত হয়। সবার জানা, দুদেশের উচ্চপর্যায়ের সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়ার পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার পুনর্গঠিত আইসিটির মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার এবং ২০২৬ ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা বিএনপি জোট সরকার শেখ হাসিনাকে প্রত্যার্পনের দাবি জানিয়ে আসলেও ভারত তার রাজনৈতিক কৌশলের কারণে সাড়া দেয়নি। অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনাকে দণ্ডিত আসামি হিসাবে বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি করে আসছে। এখানে স্মরণীয় যে বাংলাদেশের বর্তমান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ভারতে ৯ বছর ভারতে ছিলেন। তৎকালীন বাংলাদেশের দাবি সত্ত্বেও ভারত সালাহউদ্দিন আহমেদকে হস্তান্তর করেনি। সহজেই অনুমেয় বর্তমান অবস্থায় শেখ হাসিনাকে ভারত বাংলাদেশে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ফিরিয়ে দেবে না।
পাশের বাড়ির প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়ার উচিত সরকার প্রধানের যথাযোগ্য মর্যাদা নিয়ে ভারত সফর করা। প্রায় চতুর্দিক থেকে ভারত পরিবেষ্টিত বাংলাদেশে বিরাজমান বিবিধ সমস্যার জট খুলতে হলে দুদেশের শীর্ষ নেতার বৈঠকে আলোচনায় হতে পারে বরফ গলার পথ।
শেখ হাসিনা সরকারকে বিরোধীরা স্বৈরাচার বা একনায়ক যে উপাধি দেওয়া হোক না কেন ভারত বাংলাদেশের সুসম্পর্কের কারণে উভয় দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাহীনভাবে আগুয়ান হয়েছিল। ভারত থেকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি আমদানি দেশের বিদ্যুৎ জ্বালানি সরবরাহ ব্যাবস্থায় ব্যাপক ভূমিকা রাখে। বিভিন্ন সীমান্ত পথে সড়ক রেল এবং জলপথে যোগাযোগ উন্মুক্ত হতে থাকায় দুই দেশের বাণিজ্য সমতা সৃষ্টি হতে থাকে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্র যেমন তিস্তাসহ অভিন্ন নদীগুলোর পানি বণ্টন বিষয়ের জটিলতা অনেকের মতে ভারতের একগুঁয়েমির জন্য ঝুলে থাকে।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ কিন্তু স্বাধীনচেতা। কোনোভাবেই আত্মমর্যাদাশীল ভারতপন্থী নয়। কোনো অবস্থায় ভারত এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ মেনে নিতে সম্মত নয়।
আমি ব্যক্তিগতভাবে ভারতের আমন্ত্রণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফর করতে পরামর্শ দেবো। দুই পর্যায়ের শীর্ষ বৈঠকের মাধ্যমে অমীমাংসিত সমস্যাগুলোর সমাধানের পথ খুলে যেতে পারে। নতজানু পররাষ্ট্রনীতি নয় পারস্পরিক সার্বভৌমিক সমতার ভিত্তিতেই বিদ্যমান থাকুক দুদেশের সম্পর্ক।