জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য রাখছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ২২ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার প্রায় ৩৭ মিনিটের ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ, ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাত, ভেনেজুয়েলা, কিউবা, গ্রিনল্যান্ড, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এবং জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান তুলে ধরেছেন। ভাষণের বড় অংশজুড়ে ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পক্ষে ট্রাম্পের যুক্তি। একই সঙ্গে তিনি ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তির সম্ভাবনার কথা বললেও চুক্তি না হলে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দেন।
ট্রাম্প বলেন, তাঁর প্রশাসন শুধু আলোচনা বা কূটনৈতিক বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংকটে সরাসরি পদক্ষেপ নিয়েছে। ইরান থেকে ভেনেজুয়েলা এবং গ্রিনল্যান্ড থেকে ইউক্রেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক শক্তি ব্যবহারের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি নিজের পররাষ্ট্রনীতির ব্যাখ্যা দেন।
ইরান যুদ্ধ: পারমাণবিক অস্ত্র ঠেকানোর দাবি
ভাষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ইরান। ট্রাম্প বলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, সেটিই তাঁর প্রশাসনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানকে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, সামরিক পদক্ষেপের ফলে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতার ওপর আঘাত করা হয়েছে এবং তেহরানকে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
তবে ইরানকে নিয়ে তাঁর বক্তব্যে সামরিক হুমকির পাশাপাশি আলোচনার পথও খোলা রাখার ইঙ্গিত ছিল। ট্রাম্প বলেন, ইরান যদি একটি চুক্তিতে রাজি হয়, তাহলে দেশটি নতুনভাবে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারে। অর্থাৎ তাঁর বক্তব্যে একদিকে সমঝোতার সম্ভাবনা, অন্যদিকে সামরিক চাপ—দুই ধরনের বার্তাই ছিল।
চুক্তি না হলে ইরানকে ধ্বংসের হুঁশিয়ারি
ইরান প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, তাঁর সামনে একটি বড় সিদ্ধান্ত রয়েছে ইরানের সঙ্গে এমন একটি চুক্তি হবে কি না, যার মাধ্যমে দেশটি পুনর্গঠন করে নতুন ভবিষ্যতের দিকে যেতে পারবে, নাকি যুক্তরাষ্ট্র আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেবে। তিনি ইরানের ইসলামিক রিপাবলিককে অ্যানিহিলেট বা ধ্বংস করার সম্ভাবনার কথাও প্রকাশ্যে উল্লেখ করেন। ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানকে এমন অবস্থায় যেতে দেওয়া হবে না, যেখানে তারা পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করে যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য দেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।তবে ইরানের বিরুদ্ধে পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা সময়সীমা তিনি ঘোষণা করেননি। তাঁর বক্তব্যে মূলত তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং সম্ভাব্য চুক্তির জন্য একটি কঠোর অবস্থান তুলে ধরা হয়।
ইরানের ওপর সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার আহ্বান
ট্রাম্প বিশ্বের অন্যান্য দেশকেও ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি ইরানের ওপর ‘সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা’ কার্যকর করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চান। তাঁর যুক্তি হলো, ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো হলে দেশটির সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা দুর্বল হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ইরানকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা গেলে জ্বালানি বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি পরিবহনের ওপর ইরান-সংক্রান্ত সংকটের প্রভাবের কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, সংঘাতের কারণে তেলের দাম বেড়েছে। তাঁর মতে, ইরানের ওপর চাপ বাড়লে এবং জ্বালানি পরিবহনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তেলের দাম আবার কমে আসতে পারে।
মধ্যবর্তী নির্বাচন ইরান নীতিকে প্রভাবিত করবে না: ট্রাম্প
ইরান যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও ট্রাম্প কথা বলেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন তাঁর ইরান-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে না।ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক হিসাব বা নির্বাচনী ফলাফল নয়, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে—সেটিই তাঁর প্রধান বিবেচনা। তিনি বলেন, ইরান নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর কাছে অন্য কোনো রাজনৈতিক বিষয় গুরুত্বপূর্ণ নয়।এতে তিনি ইরান যুদ্ধকে মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বাইরে একটি জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে উপস্থাপন করেন।
হরমুজ প্রণালি ও বিশ্ব জ্বালানি বাজার
ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল এবং বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস পরিবহনের একটি পথ হিসেবে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব বহু বছর ধরেই আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে রয়েছে। ট্রাম্প তাঁর ভাষণে এই জলপথের নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরেন। তিনি ইরানের ওপর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপের পাশাপাশি জ্বালানি পরিবহনের নিরাপত্তাকে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করেন।
তিনি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে ইরানের জাহাজ চলাচল-সংক্রান্ত হামলার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার জন্য ধন্যবাদও জানান। ফলে জাতিসংঘের সমালোচনা করলেও নির্দিষ্ট একটি বিষয়ে সংস্থাটির ভূমিকার প্রশংসা করেন ট্রাম্প।
ইউক্রেন যুদ্ধ: দ্রুত সমাধানের প্রত্যাশা
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও ট্রাম্প তাঁর আগের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, যুদ্ধ আর দীর্ঘায়িত হওয়া উচিত নয় এবং যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া ও ইউক্রেনের নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, যুদ্ধের অবসান অনেকের ধারণার চেয়েও দ্রুত হতে পারে। তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি যুদ্ধ শেষ করার আহ্বান জানান।
তবে তিনি যুদ্ধ বন্ধের জন্য কোনো নতুন বিস্তারিত শান্তি পরিকল্পনা বা নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করেননি। যুদ্ধের অবসানের ক্ষেত্রে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে আলোচনার প্রয়োজনীয়তার কথাই তিনি বেশি গুরুত্ব দেন।
ইউক্রেন নিয়ে জেলেনস্কির সঙ্গে আলোচনার প্রস্তুতি
জাতিসংঘ অধিবেশন ঘিরে ট্রাম্পের আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে ইউক্রেনও গুরুত্বপূর্ণ স্থান পায়। তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে আলোচনার প্রস্তুতি নেন এবং রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাত কমানোর উপায় নিয়ে কথা বলার ইঙ্গিত দেন।
ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি বাজারে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধকেও যুক্ত করা হয়। রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর ইউক্রেনের হামলা এবং হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি—দুই দিক থেকেই বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে বলে আলোচনায় উঠে আসে।
ভেনেজুয়েলা: মাদুরো গ্রেপ্তার ও তেল চুক্তির পক্ষে ট্রাম্প
ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে গ্রেপ্তারের বিষয়টিও ট্রাম্প তাঁর ভাষণে তুলে ধরেন। তিনি ওই অভিযানের পক্ষে যুক্তি দেন এবং ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপের কথাও উল্লেখ করেন। মাদুরোর পর দেশটির অন্তর্বর্তী নেতৃত্বে আসা ডেলসি রদ্রিগেসের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বিষয়টি ট্রাম্প বিশেষভাবে তুলে ধরেন। ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন চুক্তির কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার ঘটনাকে পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল, যুক্তরাষ্ট্র তার নিকটবর্তী অঞ্চলে এমন কোনো শক্তির উপস্থিতি মেনে নেবে না, যাকে ওয়াশিংটন নিজের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে।
পশ্চিম গোলার্ধে মাদক ও নিরাপত্তা
ভেনেজুয়েলার পাশাপাশি মাদক কারবার ও সংগঠিত অপরাধ নিয়েও ট্রাম্প কথা বলেন। তিনি মাদক কার্টেলগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থানের কথা তুলে ধরেন এবং কিছু কার্টেলের কার্যক্রমকে সন্ত্রাসী সংগঠনের হুমকির সঙ্গে তুলনা করেন।মেক্সিকো ও লাতিন আমেরিকার কিছু অঞ্চলেও মাদক কার্টেলের প্রভাব নিয়ে ট্রাম্প উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্যে পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও নিরাপত্তা ভূমিকা আরও সক্রিয় রাখার অবস্থান ফুটে ওঠে।
কিউবা: সরকারের পতনের পূর্বাভাস
কিউবা নিয়েও ট্রাম্প কঠোর বক্তব্য দেন। তিনি দেশটির কমিউনিস্ট সরকারকে ব্যর্থ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং সরকারটির ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবর্তনের সম্ভাবনার কথা বলেন।ট্রাম্প জানান, তাঁর প্রশাসনের কর্মকর্তারা কিউবার সঙ্গে আলোচনাও করছেন। অর্থাৎ কিউবা নিয়ে চাপের পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগও চালু রয়েছে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
তবে কিউবার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য ছিল অনেকটাই পরিবর্তনের প্রত্যাশাভিত্তিক। তিনি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সমাধানের রূপরেখা দেননি।
গ্রিনল্যান্ড: নতুন নিরাপত্তা চুক্তি
গ্রিনল্যান্ড ছিল ট্রাম্পের ভাষণের অন্যতম আলোচিত বিষয়। ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র একটি ত্রিপক্ষীয় আর্কটিক নিরাপত্তা চুক্তিতে পৌঁছানোর কথা তুলে ধরে ট্রাম্প বলেন, আর্কটিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো হবে। চুক্তির অংশ হিসেবে গ্রিনল্যান্ডে দুটি বড় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনার কথা তিনি জানান। তাঁর মতে, এর মাধ্যমে উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ এবং আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদার করা সম্ভব হবে।
গ্রিনল্যান্ডের ভৌগোলিক অবস্থান, উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক অঞ্চলের সামরিক গুরুত্ব এবং রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বিষয়টিও ট্রাম্পের বক্তব্যে উঠে আসে।
গ্রিনল্যান্ডে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের উপস্থিতি নিয়ে সতর্কতা
ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো দেশকে গ্রিনল্যান্ডে সামরিক উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করতে দেওয়া হবে না। একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ বা সংবেদনশীল বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে বলে তিনি জানান।এই অবস্থানের মাধ্যমে ট্রাম্প আর্কটিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের গুরুত্ব তুলে ধরেন। একই সঙ্গে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতাকে নতুন কাঠামোর মধ্যে আনার কথা বলেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য ছিল তাঁর ভাষণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি এআই প্রযুক্তির ওপর আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ আরোপের বিরোধিতা করেন।ট্রাম্পের মতে, এআই এমন একটি প্রযুক্তি, যার বিকাশ ভবিষ্যতের অর্থনীতি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে আমূল পরিবর্তন করতে পারে। তিনি বলেন, এর বিকাশ থামিয়ে দেওয়া হলে যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে।
এআইয়ের সম্ভাব্য বিপদ নিয়ে যেসব সতর্কতা রয়েছে, সেগুলোকেও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর ভাষায়, এআই উন্নয়নের কারণে যে বড় ধরনের বিপদের কথা বলা হচ্ছে, তার অনেকটাই ‘হোক্স’ বা ভিত্তিহীন ভয় দেখানো।
আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নয়, সুপার ইন্টেলিজেন্স
ভাষণে ট্রাম্প এআইয়ের জন্য ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ শব্দটি ব্যবহারের প্রস্তাব দেন। তাঁর যুক্তি, ‘আর্টিফিশিয়াল’ শব্দটি প্রযুক্তিটিকে কৃত্রিম বা নকল কিছু হিসেবে বোঝায়, অথচ বর্তমান প্রযুক্তির ক্ষমতা তার চেয়ে অনেক বেশি।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এআই বা সুপার ইন্টেলিজেন্স এমন পরিবর্তন আনতে পারে, যা শিল্পবিপ্লবের চেয়েও বড় হবে। তাই এর বিকাশে যুক্তরাষ্ট্রকে পিছিয়ে রাখা উচিত নয় বলে তিনি মনে করেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসির বিরুদ্ধে অবস্থান
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসি নিয়েও ট্রাম্প কঠোর অবস্থান নেন। তিনি আদালটিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বর্ণনা করেন এবং সদস্য দেশগুলোকে আইসিসি থেকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানান।
ট্রাম্প বিশেষ করে মার্কিন সামরিক সদস্যদের আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারের আওতায় আনার সম্ভাবনার বিরোধিতা করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক সদস্যদের এমন কোনো আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে দেবে না, যার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃত এখতিয়ার নেই।তিনি আইসিসির বিচারিক কার্যক্রমকে যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে উপস্থাপন করেন।
জাতিসংঘের সমালোচনা ও সংস্কারের দাবি
ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই জাতিসংঘের প্রশাসনিক কাঠামো, ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এবারের ভাষণেও তিনি জাতিসংঘের আমলাতান্ত্রিক কাঠামো ও ব্যয়ের সমালোচনা করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নের বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে আরও কার্যকর ব্যবস্থা দরকার। তাঁর বক্তব্যে জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়।
তবে একই ভাষণে তিনি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেন। বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের অবস্থানের কথা উল্লেখ করেন।
মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক
এবারের ভাষণে ট্রাম্প আগের কিছু বক্তব্যের তুলনায় মিত্র দেশগুলোর প্রতি তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক মন্তব্যও করেন। বিশেষ করে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের প্রশংসা করেন তিনি।
ডেনমার্কের সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের পর নতুন নিরাপত্তা চুক্তির কথাও তিনি ইতিবাচকভাবে তুলে ধরেন। এর মাধ্যমে ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারের বার্তা দেওয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মজুত ও বিশেষ করে গোলাবারুদের সক্ষমতা নিয়েও ট্রাম্প কথা বলেন। ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জামের মজুত কমে যাচ্ছে এমন উদ্বেগ তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ রয়েছে এবং সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে দেশটি যথেষ্ট শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি একই সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোকে সতর্ক এবং মার্কিন জনগণকে সামরিক সক্ষমতা নিয়ে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন।
শুধু কথা নয়, আমরা কাজ করেছি
পুরো ভাষণে ট্রাম্প তাঁর প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতিকে সরাসরি পদক্ষেপের ওপর ভিত্তি করে উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা হলেও তাঁর প্রশাসন বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাস্তব পদক্ষেপ নিয়েছে।
ইরানে সামরিক অভিযান, ভেনেজুয়েলায় অভিযান, গ্রিনল্যান্ডে নিরাপত্তা চুক্তি এবং ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করার কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে তিনি তাঁর প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন।ট্রাম্পের বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক চাপ এবং কূটনৈতিক প্রভাব—এই তিনটি হাতিয়ারকে একসঙ্গে ব্যবহারের নীতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
জাতিসংঘে ট্রাম্পের ভাষণের সামগ্রিক বার্তা
ট্রাম্পের ২০২৬ সালের জাতিসংঘ ভাষণে ইরান ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও তাঁর বক্তব্য শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ইউক্রেন যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার আহ্বান, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন পদক্ষেপের ব্যাখ্যা, কিউবায় রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা, গ্রিনল্যান্ডে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর পরিকল্পনা, এআই নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা এবং আইসিসির সমালোচনা—সব মিলিয়ে ভাষণটি ছিল বিস্তৃত পররাষ্ট্রনীতি-কেন্দ্রিক।
ইরানের ক্ষেত্রে ট্রাম্প একদিকে চুক্তির সম্ভাবনার কথা বলেছেন, অন্যদিকে চুক্তি না হলে আরও সামরিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ইউক্রেনের ক্ষেত্রে দ্রুত শান্তির প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। আর গ্রিনল্যান্ড ও এআইয়ের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
ভাষণের মধ্য দিয়ে ট্রাম্প আবারও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থকে পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে রাখার অবস্থান তুলে ধরেছেন। ইরান যুদ্ধ, ইউক্রেন শান্তি আলোচনা, গ্রিনল্যান্ড নিরাপত্তা চুক্তি, ভেনেজুয়েলার তেলনীতি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক, এসব ক্ষেত্রে পরবর্তী পদক্ষেপই তাঁর জাতিসংঘ ভাষণের বাস্তব প্রভাব নির্ধারণ করবে।