২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বুধবার, ০৮:০৩:৪৭ অপরাহ্ন


লং মার্চেও জামায়াতের এক দফার হুঁশিয়ারি
বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৩-০৯-২০২৬
লং মার্চেও জামায়াতের এক দফার হুঁশিয়ারি বক্তব্য রাখছেন জামাতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান


সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার আসনে বসেও রাজপথের ভাষায় কথা বলছেন ডা. শফিকুর রহমান। প্রশ্ন উঠছে, সাত মাস বয়সী একটি নির্বাচিত সরকারকে বারবার “একদফা”র ভয় দেখানো কি গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভাষা?

শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ৯টায় রংপুর জিলা স্কুল মাঠে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-রংপুর লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর আমির আবারও সেই পুরনো হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, চলমান আট দফা “যেকোনো সময় জাতির প্রয়োজনে একদফায় পরিণত হতে পারে”। সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় না হলে তাঁরা “বসে বসে আঙুল চুষবেন না”, এ কথাও বলেছেন। তিনি দাবী করেন, লংমার্চে জনগন তাকে এক আঙুল দেখিয়েছেন। সেটা যে এক দফার আন্দোলন চাচ্ছেন তারা সেটাও তিনি বুঝে ফেলেছেন। এর আগেও চট্টগ্রামের লংমার্চেও তিনি আট দফা না মানলে এক দফার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। 

রাজপথে সংসদ-নেতা

১৯ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে যাত্রা শুরু করে লংমার্চটি গাজীপুর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও গাইবান্ধায় পথসভা করে রংপুরে পৌঁছায়। আট দফায় আছে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-গ্যাস-সার সংকট নিরসন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি, দলীয়করণ বন্ধ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন। দাবিগুলোর অনেকটাই সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের কষ্টের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু প্রশ্ন হলো দাবির ন্যায্যতা নয়, দাবি আদায়ের পদ্ধতি ও সময় নিয়ে।

সাত মাসে “একদফা”

একটি সরকারের কাছে জবাবদিহি চাওয়া বিরোধী দলের অধিকার, বরং দায়িত্ব। সংসদ সেই জবাবদিহির প্রধান জায়গা। কিন্তু ডা. শফিকুর রহমান নিজেই বলেছেন, “সংসদের ভেতরে তীব্র প্রতিবাদ হবে, সমান্তরাল রাজপথেও আন্দোলন চলবে।” অর্থাৎ সংসদে বিরোধী দলের নেতৃত্ব নিয়েও রাজপথের চাপ তৈরির কৌশল থেকে সরছেন না তাঁরা।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় “একদফা” শব্দটি নিছক একটি দাবির নাম নয়। এর অর্থ সরকারের পদত্যাগ ও ক্ষমতার পালাবদল। যে দল সংসদে আসন নিয়ে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছে, তারা সাত মাসের মাথায় বারবার (চট্টগ্রামের পর রংপুর লংমার্চ) এই শব্দ ব্যবহার করলে প্রশ্ন ওঠে, কর্মসূচি কি আসলে নীতিগত দাবি আদায়ের, নাকি সরকারকে অস্থিতিশীল করার? সমালোচকদের মতে, সরকারকে কাজ করার সময় না দিয়ে শুরু থেকেই পদত্যাগের হুমকির সুরে কথা বলা রাজনৈতিক পরিপক্বতার লক্ষণ নয়।

কড়া ভাষা, প্রশ্নবিদ্ধ দাবি

সমাবেশের বক্তব্যে আরও কয়েকটি বিষয় নজর কাড়ে। তিনি অভিযোগ করেছেন, সরকার সেই পথেই হাঁটছে, যে পথে হাসিনা ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিলেন। তুলনাটি তীব্র, কিন্তু সাত মাসের একটি নির্বাচিত সরকারকে পতিত ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকা একটি স্বৈরাচারের সঙ্গে এক কাতারে ফেলার পক্ষে তথ্যপ্রমাণ কতটা, তা তিনি বক্তব্যে দেখাননি। তিনি বলেছেন, চাঁদাবাজির কারণে দ্রব্যমূল্য “তিন গুণ চার গুণ” হয়েছে। এই দাবির পক্ষেও কোনো পরিসংখ্যান দেওয়া হয়নি।

সিরাজগঞ্জে জামায়াত কর্মীদের ওপর হামলার যে অভিযোগ তিনি তুলেছেন, তা গুরুতর। সত্য হলে অবশ্যই তদন্ত ও বিচার হওয়া উচিত। তবে “১৮ কোটি মানুষকে সঙ্গে নিয়ে সন্ত্রাসীদের কালো হাত ভেঙে দেওয়া হবে” জাতীয় বক্তব্য আইনের শাসনের বদলে উত্তেজনার ভাষাই বেশি বহন করে। এমনকি “একটা দাবিও দলীয় নয়, ১৮ কোটি মানুষের দাবি” বলে নিজেদের দাবিকে পুরো জাতির কণ্ঠস্বর হিসেবে উপস্থাপনও বিতর্কিত। সংসদে জামায়াতের অবস্থান ও নির্বাচনী ম্যান্ডেট আছে, কিন্তু ১৮ কোটি মানুষের একক প্রতিনিধিত্বের দাবি কোনো দলই করতে পারে না। বিশেষ করে যদি সংসদের আসনের পরিসংখ্যানটাও দেখা হয়। 

গণভোট ও সংবিধানের প্রশ্ন

জামায়াতের প্রধান অভিযোগ, সরকার গণভোটের রায় মানছে না। তাঁর হিসাবে ৭০ ভাগ মানুষ “হ্যাঁ” ভোট দিয়েছে, অথচ সরকার “ইনিয়ে-বিনিয়ে” বলছে, সংবিধানে গণভোট নেই। এই বিতর্কে ন্যায্য প্রশ্ন আছে। গণভোটের রায় কীভাবে আইনি ও সাংবিধানিক কাঠামোয় বাস্তবায়িত হবে, তা স্পষ্ট করা সরকারের দায়িত্ব। আবার জামায়াতের যুক্তি, “সংবিধানে গণভোট না থাকলে ২৬ সালে নির্বাচনও নেই, সরকারও নেই”, সাংবিধানিক জটিলতাকে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে রূপ দেওয়ার কৌশল হিসেবেও পড়া যায়। এই জটিল বিষয়ের সমাধান হতে পারে সংসদীয় আলোচনা, আইনি পথ ও সর্বদলীয় সংলাপে। হুমকি ও পাল্টা হুমকির পথে নয়।

পরিণতি কার জন্য?

সরকারের দিকেও বলার আছে। বিদ্যুৎ-গ্যাস-সার সংকট, তিস্তা প্রকল্পে ধীরগতি, দ্রব্যমূল্য ও আইনশৃঙ্খলা, সবই সাধারণ মানুষের জীবনের বাস্তব সমস্যা। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিরোধী দলের প্রশ্ন তোলার অধিকার আছে। যে সরকার সাত মাসেও দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে পারেনি, তাকে জবাব দিতেই হবে।

তবে সংকটের সমাধান রাজপথের উত্তেজনায় নয়। অর্থনীতি যখন চাপে, তখন দীর্ঘ লংমার্চ, অবরোধ বা একদফার আবহ সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে খেটে-খাওয়া মানুষেরই। দিনমজুর, পরিবহনশ্রমিক ও ছোট ব্যবসায়ীর আয় বন্ধ হলে সংকট আরও বাড়ে। জামায়াত যে ১৮ কোটি মানুষের নামে কথা বলছে, তাদেরই আগে জিজ্ঞেস করা দরকার, তারা অস্থিরতা চায় নাকি সমাধান।

সংসদে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে ডা. শফিকুর রহমানের হাতে সবচেয়ে কার্যকর মঞ্চ আছে। সেখানে তথ্য, পরিসংখ্যান ও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব নিয়ে সরকারকে চাপে ফেলাই হতো পরিপক্ব রাজনীতির পথ। আন্দোলনের অধিকার সবার আছে, কিন্তু সাত মাসের মাথায় চট্টগ্রামের পথে লংমার্চ এ বলার পর আবারও রংপুরের লংমার্চে দ্বিতীয় দফায় “একদফা”র ঘোষণা মানুষের মনে আশার বদলে শঙ্কাই বাড়ায়।

শেয়ার করুন