সুপ্রিম কোর্টে ১ এপ্রিল জন্মসূত্রে স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব বাতিলের ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ নিয়ে মৌখিক শুনানির সময় মার্কিন সলিসিটর জেনারেল ডি. জন সাওয়ার এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে গত ১ এপ্রিল জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের উদ্যোগকে ঘিরে সাম্প্রতিক শুনানিতে বিচারপতিদের মধ্যে গভীর সংশয় প্রকাশ পেয়েছে। এ গুরুত্বপূর্ণ মামলাটি আরো তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে আদালতে উপস্থিত থেকে তার আইনজীবীর পুরো যুক্তি উপস্থাপন শুনেছেন। শুনানিতে তিনি ৯০ মিনিট উপস্থিত ছিলেন। এটি সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে একেবারেই বিরল ঘটনা। সাধারণত সাবেক বা বর্তমান প্রেসিডেন্টদের এমনভাবে আদালতে উপস্থিত থাকতে দেখা যায় না, ফলে তার এই উপস্থিতি মামলাটির রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক গুরুত্বকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এদিকে সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে এ মামলার চূড়ান্ত রায় আগামী গ্রীষ্মের শুরুর দিকেই ঘোষণা করা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রায় দেড়শ বছর আগে, গৃহযুদ্ধের পরপরই, মার্কিন কংগ্রেস ১৪তম সংশোধনী প্রণয়ন করে যেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয় যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী বা স্বাভাবিকীকৃত এবং যুক্তরাষ্ট্রের অধিক্ষেত্রের আওতাধীন সব ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। দীর্ঘদিন ধরে এই বিধানটি খুবই সরলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অর্থাৎ কিছু সীমিত ব্যতিক্রম ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী প্রত্যেকেই নাগরিক, তাদের বাবা-মায়ের নাগরিকত্ব বা অভিবাসন অবস্থান যাই হোক না কেন।
কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন এ প্রতিষ্ঠিত ব্যাখ্যাকে চ্যালেঞ্জ করে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে একটি নির্বাহী আদেশ জারি করে, যাতে বলা হয় যে এমন শিশু যারা যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেয় কিন্তু তাদের বাবা-মা কেউই নাগরিক বা গ্রিনকার্ডধারী নয়, তারা জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাবে না। এ আদেশটি অবিলম্বে বিভিন্ন আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে এবং প্রতিটি আদালতই তা স্থগিত করে দেয়। এরপর বিষয়টি সর্বোচ্চ আদালতে গড়ায়, যেখানে সম্প্রতি মৌখিক শুনানিতে বিচারপতিরা ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তোলেন।
এ বিতর্কের শিকড় অনেক পুরোনো। ১৮৯৫ সালে সান ফ্রান্সিসকোতে জন্ম নেওয়া চীনা বংশোদ্ভূত যুবক ওয়ং কিম আর্ক যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসার সময় প্রবেশাধিকার থেকে বঞ্চিত হন। তার বাবা-মা তখনকার আইনে নাগরিকত্ব পাওয়ার অযোগ্য ছিলেন। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে তিনি ‘বিদেশি শক্তির অধীন’ এবং তাই ১৪তম সংশোধনীর আওতায় পড়েন না। কিন্তু ১৮৯৮ সালে সুপ্রিম কোর্ট ঐতিহাসিক রায়ে জানায় যে যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী সবাই নাগরিক, কেবলমাত্র কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া যেমন কূটনীতিকদের সন্তান, শত্রু সেনাবাহিনীর দখলদারিত্বের সময় জন্ম নেওয়া শিশু, বা সার্বভৌম নেটিভ আমেরিকান গোত্রের সদস্যদের সন্তান।
এ রায়ের পর থেকে ১২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব একটি প্রতিষ্ঠিত নীতি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন সেই পুরোনো বিতর্ককে আবার সামনে নিয়ে আসে। তাদের যুক্তি ছিল, ‘যুক্তরাষ্ট্রের অধিক্ষেত্রের আওতাধীন’ বলতে শুধু তাদের বোঝানো হয়েছে যারা পুরোপুরি রাজনৈতিক আনুগত্য বহন করে। ফলে অবৈধ অভিবাসী বা অস্থায়ী ভিসাধারীদের সন্তানরা এ শর্ত পূরণ করে না।
মৌখিক শুনানিতে সরকারের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল জন সাওয়ার যুক্তি দেন যে ১৪তম সংশোধনীর মূল উদ্দেশ্য ছিল দাসপ্রথার শিকার আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা এবং এটি প্রচলিত সাধারণ আইনভিত্তিক জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের ধারণা থেকে সরে এসেছে। তিনি আরো বলেন, নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য ডোমিসাইল বা স্থায়ীভাবে বসবাসের ইচ্ছা থাকা জরুরি, যা অস্থায়ী ভিসাধারী বা অবৈধ অভিবাসীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তবে বিচারপতিরা এই যুক্তিগুলোকে সহজভাবে মেনে নেননি। প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস মন্তব্য করেন যে সরকারের ব্যাখ্যাটি ‘অদ্ভুত’ এবং এটি পূর্ববর্তী নজিরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি ইঙ্গিত দেন যে আধুনিক নীতিগত উদ্বেগ, যেমন ‘বার্থ ট্যুরিজম’, সংবিধানের ভাষাকে পরিবর্তন করতে পারে না। বিচারপতি নিল গারচানও প্রশ্ন তোলেন কেন ‘ডোমিসাইল’ বা আনুগত্যের মতো ধারণাগুলো ১৪তম সংশোধনী নিয়ে কংগ্রেসের বিতর্কে খুব কমই উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে বিচারপতি অ্যামি কোনি ব্যারেট বাস্তবিক সমস্যার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি জানতে চান, যদি কোনো শিশুর বাবা-মায়ের পরিচয়ই জানা না যায়, তাহলে তার নাগরিকত্ব কীভাবে নির্ধারণ করা হবে। বিচারপতি কেতানজি ব্রাউন জ্যাকসনও প্রশ্ন তোলেন, জন্মের সময়ই কীভাবে নাগরিকত্ব নির্ধারণ করা সম্ভব হবে এবং ভুল হলে কীভাবে তা সংশোধন করা হবে।
শুনানিতে বিচারপতিদের প্রশ্নে স্পষ্ট হয় যে তারা কেবল আইনি তত্ত্ব নয়, বাস্তব প্রভাব নিয়েও উদ্বিগ্ন। যদি ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যাখ্যা গৃহীত হয়, তাহলে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ শিশু নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত হবে। অনেক ক্ষেত্রে তারা রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়তে পারে, কারণ তাদের বাবা-মায়ের দেশও তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি নাও দিতে পারে। এর প্রভাব শুধু অভিবাসীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া প্রতিটি শিশুর নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হলে তাদের বাবা-মায়ের নাগরিকত্ব বা অভিবাসন সংক্রান্ত কাগজপত্র জমা দিতে হতে পারে। জন্ম সনদ এককভাবে যথেষ্ট প্রমাণ হিসেবে আর গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। এতে প্রশাসনিক জটিলতা যেমন বাড়বে, তেমনি নাগরিক অধিকার নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। এছাড়া অতীতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। যদিও ট্রাম্প প্রশাসনের নির্বাহী আদেশটি ভবিষ্যতের জন্য প্রযোজ্য ছিল, তবে যদি সুপ্রিম কোর্ট ১৪তম সংশোধনীর নতুন ব্যাখ্যা দেয়, তাহলে অতীতে জন্ম নেওয়া বহু মানুষের নাগরিকত্বও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। এতে করে আইনি ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শুনানিতে বিচারপতি ব্রেট কাভানাও মন্তব্য করেন যে নীতিগতভাবে তিনি কিছু যুক্তির সঙ্গে একমত হতে পারেন, তবে আদালতের কাজ হলো সংবিধানের ব্যাখ্যা করা, অন্য দেশের নীতির সঙ্গে তুলনা করা নয়। তিনি ইঙ্গিত দেন যে যদি আদালত পূর্ববর্তী রায়গুলোর প্রতি সম্মান দেখায়, তাহলে এ মামলার সিদ্ধান্ত খুব সংক্ষিপ্ত হতে পারে। সামগ্রিকভাবে, শুনানিতে বিচারপতিদের প্রশ্ন ও মন্তব্য থেকে বোঝা যায় যে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান আদালতে খুব বেশি সমর্থন পাচ্ছে না। তবে এখনো চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হয়নি, এবং আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জুন মাসের শেষ নাগাদ প্রত্যাশিত।
এই মামলাটি শুধু একটি আইনি বিতর্ক নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বের মৌলিক ধারণা এবং সংবিধানের ব্যাখ্যার ওপর একটি বড় পরীক্ষা। ১৪তম সংশোধনী দীর্ঘদিন ধরে সমতা ও অন্তর্ভুক্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তাই এর ব্যাখ্যায় কোনো পরিবর্তন এলে তা দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোতে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই বিতর্ক দেখায় যে অভিবাসন ও নাগরিকত্ব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিভাজন কতটা গভীর হয়েছে। একই সঙ্গে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও উত্থাপন করে-সংবিধানের ভাষা কি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত ব্যাখ্যার মাধ্যমে নতুনভাবে প্রয়োগ করা উচিত, নাকি এর মূল অর্থ অক্ষুণ্ণ রাখা উচিত।
বর্তমানে দেশজুড়ে এ মামলাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলছে, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করা হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী হবে। অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের সমর্থকরা দাবি করছেন, এটি অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।
সব মিলিয়ে, সুপ্রিম কোর্টের এই মামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নাগরিকত্ব নীতিনির্ধারণে একটি মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে। আদালত শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেয়, তার ওপর নির্ভর করবে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভবিষ্যৎ এবং সংবিধানের একটি মৌলিক নীতির ভবিষ্যৎ ব্যাখ্যা।