প্রতীকী ছবি
মুদ্রাস্ফীতি আর দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতি নিয়ে যখন বাংলাদেশের মানুষের জনজীবন বিপর্যস্ত ঠিক তখন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন গঠিত বিদ্যুৎ মূল্য বৃদ্ধির ঘোষণা এলো, ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে। জ্বালানি সংকটের অভিঘাতে বিপুল দেনার দায় নিয়ে মহা সংকটে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। সরকারি সংস্থাকে বিপুল সবসিডি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হচ্ছে, নতুন সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছে ১০০ দিন পার হলো। জুন মাসেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পাস করতে হবে। এমতাবস্থায় জ্বালানি বিদ্যুৎ খাতকে বিপুল সাবসিডির দায় কিছুটা কমানোর জন্য বিদ্যুৎ মূল্য বাড়ানো ছাড়া বিকল্প খুব একটা ছিল না।
তবে বিদ্যুৎ মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি অনুষ্ঠানের পর দ্রুততম সময়ে গড়ে ১৬-২০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দিয়ে নয়া নজির স্থাপন করলো। বিদ্যুৎ জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি সব সময় চক্রাকারে সব কিছুর মূল্যবৃদ্ধি করে মুদ্রাস্ফীতি বিস্তৃততর করে। এক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হবে না। সীমিত আয়ের মানুষ যাদের নুন আনতে পানতা ফুরোয় তাদের দৈনিক জীবন পড়বে সীমাহীন অস্বস্তিতে। প্রকৃত পক্ষে শিল্প, বাণিজ্যসহ সব ধরনের গ্রাহক পড়বে মহাবিপদে। অথচ জ্বালানি বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাবস্থার বর্তমান সংকটের জন্য কোনো দায় নেই ভোক্তাদের। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাড়তি মূল্য দিয়েও মানসম্মত ও প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ার কোন নিশ্চয়তা নেই কোনো গ্রাহকের।
অপরদিকে মূল্য বৃদ্ধির পরেও অন্তত একচল্লিশ হাজার কোটি টাকার সাবসিডি দিতে হবে সরকারকে। সবাই জানে মধ্যপ্রাচ্যে (ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র -ইসরায়েল যুদ্ধ), রাশিয়া -ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে জ্বালানি মূল্য আকাশ ছুঁয়েছে। আমলা দূষিত জ্বালানি ব্যবস্থাপনার বলি হয়ে বাংলাদেশ নিজেদের জ্বালানি সম্পদ আহরণ উপেক্ষা করে ক্রমাগত আমদানিকৃত জ্বালানি (কয়লা, তরল জ্বালানি, এলএনজি, এলপিজি) নির্ভর হয়ে অসহায় অবস্থায় পড়েছে। বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি উচ্চমূল্যের জ্বালানি আমদানি করতে হিমশিম খাচ্ছে। উপরন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বহুমাত্রায় বৃদ্ধি পাওয়ায় বিপুল ঘাটতি নিয়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। এরই মাঝে গ্রীষ্ম কালে বিদ্যুৎ চাহিদা বেড়ে ১৭ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাওয়ায় দেশ ব্যাপী লোড শেডিং মহামারি রূপ নিচ্ছে। ২৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা থাকলেও জ্বালানির অভাবে ১৭ হাজার মেগাওয়াট নিয়মিত উৎপাদন করা যাচ্ছে না। জ্বালানি বিদ্যুৎ সংকটে অনেক শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বেকার সমস্যা প্রকট হচ্ছে। রফতানি বাণিজ্যে বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি হচ্ছে।
অনেকের মতে পরিকল্পিত উপায়ে দেশের নিজস্ব জ্বালানি সম্পদ (গ্যাস, কয়লা) অনুসন্ধান করে ব্যবহার করা হলে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি (সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ) ব্যবহার বৃদ্ধি করা হলে বর্তমান পরিস্থিতি এড়ানো যেত। রূপপুর বিদ্যুৎ প্রকল্পকে প্রাধিকার দিয়ে যথাসময়ে শেষ করা হলেও কিছুটা স্বস্তি মিলতো।
নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে নবায়ণযোগ্য জ্বালানির অবদান বাড়ানোর পাশাপাশি সাগরে গ্যাস অনুসন্ধানের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এগুলোর সুফল পেতে নিদেন পক্ষে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগবে। তবে অনন্যোপায় হয়ে জ্বালানি বিদ্যুৎ মূল্যবৃদ্ধির প্রতিক্রিয়ায় জনজীবনে অস্বস্তি এড়ানোর দায় দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। সব পর্যায়ে জ্বালানি বিদ্যুতের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি অবৈধ ব্যবহার চুরি বন্ধ করতে হবে, জ্বালানি আমদানিতে শুল্ক কর সমন্বয় করে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কমাতে হবে, জনগণকে সচেতন হয়ে বিদ্যুৎ জ্বালানি ব্যাবহারে কৃচ্ছ্রতা নিশ্চিত করতে হবে।