২৩ জুলাই ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ০৭:০৬:২০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
স্ত্রী-সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে দগ্ধ নোয়াখালীর সোহাগের মৃত্যু ব্রঙ্কসে ‘ডিটেকটিভ ফার্স্ট গ্রেড দিদারুল ইসলাম ওয়ে’ ফিলাডেলফিয়ার মসজিদে অগ্নিবোমা হামলা : গ্রেফতার ভিনসেন্ট ল্যাং নেতানিয়াহুকে গ্রেফতারের আইনি সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন মেয়র ইতিহাসের দ্বারপ্রান্তে আবদুল এল-সায়েদ নিউইয়র্কে ২.১ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি, পর্যটন ও ব্যবসায় বড় সাফল্য টেক্সাসে মুসলিম শিক্ষাবিদের মামলা গ্রিনকার্ড আবেদনকারীদের জন্য ১ লাখ ডলারের বন্ড বিবেচনায় ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসন অভিযানে ব্যাপক নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এসিএলইউর প্রতিবেদনে গ্রিনকার্ড মূল্যায়নে মেডিকেইড, ফুড স্ট্যাম্প ও আবাসন সহায়তা বিবেচনায় নেবে ট্রাম্প প্রশাসন


মহাসড়কের রক্তক্ষরণ : লক্ষ্যমাত্রা অর্জন আসলেই কী সম্ভব?
বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট করা হয়েছে : ২২-০৭-২০২৬
মহাসড়কের রক্তক্ষরণ : লক্ষ্যমাত্রা অর্জন আসলেই কী সম্ভব?


জাতিসংঘ সদর দপ্তরে নিউইয়র্কের চোখ ধাঁধানো মিলনায়তনে দাঁড়িয়ে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ পুনর্সংকল্প ব্যক্ত করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও আহতের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনা হবে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ২০২৭ সালের মধ্যে সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন চূড়ান্তকরণ, এআই-ভিত্তিক গতি নিয়ন্ত্রণ এবং ‘সেইফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’-এর কথা বলছেন। উচ্চপর্যায়ের এসব বৈঠক আর কূটনীতির টেবিল যখন প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়িতে উজ্জ্বল, তখন বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র ঠিক কতটা ভিন্ন? 

গত তিন বছরে (২০২৪-২০২৬) দেশের মহাসড়কগুলোতে ঝরে পড়া তাজা প্রাণের পরিসংখ্যান এবং আইনি সংস্কারের চিত্র বিশ্লেষণ করলে উঠে আসে এক রূঢ ও নির্মম সত্য। পরিসংখ্যানের আয়নায় গত তিন বছরে মৃত্যুকূপের খতিয়ান আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বাংলাদেশ রোড সেফটি অথরিটি (বিআরটিএ) এবং যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যের আলোকে যে চিত্র পাওয়া যায়, তা কোনো আশার বাণী শোনায় না। পরিসংখ্যান বলছে, গতিসীমা বা আইন সংশোধনের প্রতিশ্রুতি কাগজেই বেশি বন্দি থেকেছে।

গত তিন বছরে দেশে প্রতি বছর গড়ে ৬ হাজারের বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং কেবল সরকারি ও বেসরকারি রেকর্ড অনুসারেই বছরে সাড়ে ৬ থেকে ৭ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি। 

জাতিসংঘে মন্ত্রী দেশে যা ঘটছে নিউ ইয়র্কের বৈশ্বিক বৈঠকে তিনি কয়েকটি প্রতিশ্রুতি ও অগ্রগতির কথা তুলে ধরেছেন, যার সাথে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার ব্যবধান চোখে পড়ার মতো। যদিও দ্বায়িত্ব প্রাপ্ত মন্ত্রী ও সরকারের বয়স সবে পাচ মাসের মত। পূর্ববর্তি সরকারের ঢিলেঢালা উদ্যোগ ও দায়হীন পথচলায় অভ্যস্তদের কঠোর নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসা এ সরকারের বড় চ্যালেঞ্জও। তবে আশার কথা, রাজধানীতে গুটি কয়েকস্থানে এআই’র ব্যবহারে সন্তোষজনক রেজাল্ট এসেছে। ফলে মানুষ আশাবাদী এর ব্যাবহার ব্যাপক হলে মন্ত্রী ও সরকারের লক্ষমাত্রা অর্জন সম্ভব। 

এআই ও প্রযুক্তিনির্ভর গতি নিয়ন্ত্রণ 

মন্ত্রী এআই ভিত্তিক গতিনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের কথা বলেছেন। অথচ দেশের প্রধান মহাসড়কগুলোর বড় অংশে এখনও সাধারণ স্পিড গান দিয়েও নিয়মিত গতিসীমা তদারকি করা হয় না। 

২০২৭ সালের মধ্যে নতুন আইন

‘সেইফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’-এর অধীনে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সমন্বিত আইন প্রবর্তনের কথা বলা হয়েছে। তবে সড়ক পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ না করে শুধু নতুন আইনের অপেক্ষায় থাকা দুর্ঘটনা কমানোর ক্ষেত্রে বিলম্ব ঘটাচ্ছে। 

পথচারী ও জরুরি সেবা

পথচারী নিরাপত্তা ও দুর্ঘটনার পর দ্রুত জরুরি সেবার হার উন্নত করার অঙ্গীকার করা হলেও, গ্রামীণ ও দূরপাল্লার মহাসড়কগুলোতে এখনও ট্রমা সেন্টার ও অ্যাম্বুলেন্স সেবা চরমভাবে অপ্রতুল।

তাহলে ৫০% কমানোর লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত?

পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রাণহানি ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনা পুরোপুরি অসম্ভব নয়, তবে এটি কেবল আন্তর্জাতিক ফোরামে ভাষণ বা সাইড-ইভেন্টে যৌথ-সভাপতি দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে অর্জিত হবে না। এর জন্য প্রয়োজন চারটি মৌলিক স্তম্ভের কঠোর বাস্তবায়ন:

১. অবকাঠামোগত পরিবর্তন: মহাসড়কে পথচারীদের জন্য আলাদা পারাপার ও থ্রি-হুইলারের জন্য ডেডিকেটেড লেনের অভাব দূর করা।

২. আইনের প্রয়োগ: রাজনৈতিক প্রভাবে ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও লাইসেন্সহীন চালকদের রেহাই বন্ধ করা।

৩. প্রযুক্তি ব্যবহার: নামমাত্র এআই নয়, বরং দেশের সকল হাইওয়েতে স্বয়ংক্রিয় ই-প্রসিকিউশন ও সিসিটিভি মনিটরিং নিশ্চিত করা।

৪. জরুরি চিকিৎসা সেবা: দুর্ঘটনার গোল্ডেন আওয়ারের (প্রথম এক ঘণ্টা) মধ্যে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে জাতীয় সড়ক-জরুরি সেবার পরিকাঠামো তৈরি।

শেষ কথা

জাতিসংঘে বিএনপি সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ রোড সেফটি প্রকল্পের গুরুত্ব তুলে ধরে যে বার্তা দিয়েছে, তা বৈশ্বিক রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রতিফলন। কিন্তু জাতিসংঘের এসি কক্ষে দেওয়া বক্তব্য আর টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার মহাসড়কের রিয়েলিটি এক নয়। ২০৩০ সাল ছুঁতে আর মাত্র কয়েক বছর বাকি। আইনের খসড়া তৈরি আর আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির গণ্ডি পেরিয়ে সরকার কত দ্রুত মহাসড়কে দৃশ্যমান কঠোরতা ও প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটাতে পারে তার ওপরই নির্ভর করছে রাজপথ মৃত্যুর মহাসড়ক থাকবে, নাকি সাধারণ মানুষের নিরাপদ চলাচলের গ্যারান্টি দেবে।

তবে সরকারের সদিচ্ছ হলে এটা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে কঠোর হওয়া প্রয়োজন হবে। সরকারের বয়স সবে পাঁচ মাস। এরই মধ্যে যুগ যুগ ধরে চলে আসা সিষ্টেমকে নিয়মনীতির মধ্যে নিয়ে আসা সরকারের জন্য বিশাল বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু সরকার, প্রশাসনই নয়, জনগন, ড্রাইভার, পথচারি সহ সবাইকেই এ নিয়ম নীতি কঠোরভাবে মেনে চলা ও প্রশাসনকে সহায়তা করারও প্রয়োজন রয়েছে এভাবে সম্মলিতভাবে সবাই আন্তরিকার সঙ্গে একে অপরকে সহায়তা করলে ওই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সম্ভব। নতুবা সরকার একা আন্তরিক হলেও প্রশাসন নিরলস কাজ করলেও বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে যাবে।

শেয়ার করুন