২৬ অগাস্ট ২০২৬, বুধবার, ০৮:২৭:২৩ অপরাহ্ন
শিরোনাম :


জ্বালানি বিদ্যুৎ সংকট সহসা কাটছে না
সালেক সুফী
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৬-০৮-২০২৬
জ্বালানি বিদ্যুৎ সংকট সহসা কাটছে না


দুই সপ্তাহের বাংলাদেশ অবস্থানকালে বাংলাদেশ গ্যাস বিদ্যুৎ সরবরাহ চেনের গুরুত্বপূর্ণ চোক পয়েন্টসসমূহ পরিদর্শন এবং সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে উপলব্ধি করছি অন্তত ২০৩০-এর আগে বাংলাদেশে ঘনীভূত হতে থাকা জ্বালানি বিদ্যুৎ সংকটমুক্ত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। আর এ তীব্র সংকটের পাশাপাশি অন্যান্য সংকট মোকাবিলায় বিএনপি জোট সরকারকে অনেকটা বেসামাল মনে হচ্ছে। পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত একটি গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য ৬ মাস খুব বেশি সময় না হলেও দেখে শঙ্কা লাগছে সরকার জ্বালানি বিদ্যুৎ সংকটের ব্যাপকতা এবং গভীরতা সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারছে না। প্রতিদিন প্রিন্ট ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় দেশের তথাকথিত জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের নানা উদ্ভট বিশ্লেষণ আর পরামর্শ সংকটকে আরো ঘনীভূত করছে। ভেবে পাই না দেশে এতো জ্বালানি বিশেষজ্ঞ থাকা সত্ত্বেও কেন দেশে এ সংকট?

দেখুন দেশে বিরাজমান সংকটের মূল কারণ প্রাথমিক জ্বালানি সংকট। আর এ সংকটের সূচনা হয়েছে ২০০০ থেকেই। দীর্ঘ আড়াই দশক সময়েও দেশের নিজস্ব প্রাথমিক জ্বালানি কয়লা, গ্যাস অনুসন্ধান আর উন্নয়নের বিষয়ে সব সরকার নিদারুণ ব্যর্থতা দেখিয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়নের মিশনেও যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। দেশের জ্বালানি বিদ্যুৎ খাতে গড়ে উঠেছে সরকারি-বেসরকারি ব্যাক্তিদের সমন্বয়ে একটি অশুভ সিন্ডিকেট। আর এ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে বিপিডিবি, বিপিসি আর পেট্রোবাংলার মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় দেউলিয়া হয়ে পড়েছে। ক্রমাগত দুর্বৃত্তায়িত হতে থাকা জ্বালানি বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক লুটপাট হয়েছে। ভেবে দেখুন ৩৩ হাজার ৯২ মেগাওয়াট গ্রিড অব গ্রিড বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ধারাবাহিকভাবে এমনকি ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। ২০০০ থেকেই সরকারগুলোর ভ্রান্ত সিদ্ধান্তে দেশীয় প্রাথমিক জ্বালানি উন্নয়ন উপেক্ষা করে জ্বালানি বিদ্যুৎ আমদানির দিকে ঝুঁকে পড়ে। ফলশ্রুতিতে একসময়ে নিজস্ব জ্বালানির ওপর ৯০ শতাংশ নির্ভরশীল শক্তি খাত এখন ৬০%+ আমদানি নির্ভর। সবাই জ্বালানি যুদ্ধ আর সংঘাত বিক্ষুব্ধ বিশ্ব জ্বালানি বাজারে জ্বালানি মূল্যে লেগেছে আগুন, সরবরাহ চেনে হয়েছে ছেদ। এর সঙ্গে যোগ করুন বৈদেশিক মূল্যের ব্যাপক সংকট।

আমি ঢাকার আসে পাশের শিল্প অঞ্চলসমূহে গ্যাসের তীব্র সংকট দেখেছি। আমি গ্যাস সঞ্চালন নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রসমূহে গ্যাসের চাপ ভয়াবহভাবে কম দেখেছি। এমনিতেই ১০০০-১০৫০ মিলিয়ন আর এলএনজি সহ ২৭০০ এমএমসিএফডি গ্যাস উৎপাদন ক্ষমতা নিয়েও ১০০০-১২০০ এমএমসিএফডি গ্যাস ঘাটতিতে ভুগছিল সব গ্রাহক। ২১ জুলাই কক্সবাজার এলাকার মহেষখালী উপকূলে থাকা ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে কথিত অগ্নিদুর্ঘটনার কারণে এলএনজি সরবরাহ ৫০০-৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে যায়। সৃষ্টি হয় তীব্র জ্বালানি সংকট। বিদ্যুৎ, সার, শিল্প, সিএনজি সব ক্ষেত্রেই শুরু হয় আতঙ্ক। গ্যাস ফ্রাঞ্চাইজ এলাকায় গৃহিণীরা চুলায় গ্যাস না পাওয়ায় জন দুর্ভোগের সৃষ্টি হয়। কীভাবে একটি বিশেষায়িত গ্যাস সরবরাহ ইউনিটে অগ্নি দুর্ঘটনা ঘটেছে সেটি নিয়ে আছে নানা গুজব। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের একটি কোম্পানি কেন টার্মিনাল মেরামতে প্রায় ৩ সপ্তাহ সময় নিলো সেটির সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা চাইতেই পারে সাধারণ জনগণ। বিস্ময় লেগেছে যখন আনাড়ি পরিকল্পনার কারণে পর্যায়ক্রমে দুটি ভাসমান টার্মিনালে এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হলো। শুনছি জ্বালানি মন্ত্রীকেও ভাসমান টার্মিনালে যেতে দেওয়া হয়নি। এদিকে সর্বগ্রাসী মহল এলএনজি ক্রয় এবং সরবরাহে অশুভ প্রবাহ সৃষ্টি করে বিষয়টিকে ঘোলাটে করে ফেলেছে। কেন কীভাবে আরামকো প্রেরিত এলএনজি জাহাজের কার্গো ফেরত পাঠানো হলো? কোন মহল কি সরকারকে বিব্রত করার মিশন বাস্তবায়ন করছে?

যাহোক, এলএনজি আমদানি নিয়ে অনভিজ্ঞ মহল উদ্ভট কথা বলছে। বাংলাদেশে আইএসও ট্যাংকারে করে এলএনজি আমদানি করে ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই, মাতারবাড়ী, মহেশখালী চ্যানেল ছাড়া অন্য কোথাও ভাসমান টার্মিনাল স্থাপনের কোনো অনুকূল পরিবেশ নেই। আর একান্ত এলএনজি জ্বালানিনির্ভর হয়ে স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশ কোনোভাবেই জ্বালানি নিরাপত্তা অর্জন করতে পারবে না।

দেখুন জ্বালানি দুর্ভিক্ষের সময়ে সরকার পেট্রোবাংলার মোট গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় চেয়ারম্যান নিয়োগ দিতে খাবি খাচ্ছে। শুনেছি পেট্রোবাংলায় মন্ত্রণালয় থেকে আশা এখন পরিচালক ক্ষমতার অপব্যাবহার করে সংকট সৃষ্টি করছে। সরকারকে পরামর্শ দেবো সংখ্যায় মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের অপসারণ করে দক্ষ, অভিজ্ঞ কারিগরি এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়ার। বর্তমান অবস্থায় বেশ কয়েকজন দক্ষ অভিজ্ঞ কারিগরি কর্মকর্তাদের ওএসডি করে রাখা হয়েছে।

আমি মাঠ পর্যায়ে ব্যাপক অনুসন্ধান করে দেখেছি ২০২৭-২০২৮ গ্যাস সংকট আরো ঘনীভূত হতে পারে। উৎপাদনরত গ্যাস ক্ষেত্র থেকে উৎপাদন প্রতিদিন কমে যাচ্ছে। এলএনজি সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ থেকেও ২০৩০-এর আগে সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। ভোলার আবিষ্কৃত গ্যাস গ্রিড সংযুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হলেও অন্তত ৩ বছরের আগে সুফল মিলবে না।

আমি জাতীয় আর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিবিড় যোগাযোগ করে সাগরে গ্যাস অনুসন্ধান নিয়ে শীর্ষ স্থানীয় আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোকে আগ্রহ দেখতে পাচ্ছি না। বাংলাদেশ নয় মায়ানমার, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ থেকে উন্নত পরিবেশ থাকায় সেখানেই ঝুঁকি বিনিয়োগ নেওয়া যুক্তিযুক্ত ভাবছে সবাই।

এমতাবস্থায় জ্বালানি বিদ্যুৎ সংকটকে জাতীয় অগ্রাধিকার বিবেচনা করে কিছু ব্যাতিক্রমধর্মী উদ্যোগ না নিলে জ্বালানি বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে পারে।

শেয়ার করুন