২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বুধবার, ১০:২৬:০৬ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
হোয়াইট হাউসে প্রবেশাধিকার বন্ধ : ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা মসজিদ ও ডিয়ারবর্নের মেয়রকে হুমকির অভিযোগে রোজভিলের নারী অভিযুক্ত ইসলামবিরোধী বক্তব্যের বিরুদ্ধে টেক্সাসে মুসলিমদের পাল্টা লড়াই তিন ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীকে গুলি : জেসন ইটন দোষী সাব্যস্ত অনথিভুক্ত শিশুদের সরকারি শিক্ষার অধিকার নিয়ে নতুন বিতর্ক প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রবাসী বাংলাদেশী ফোরামের ৯ দাবি ‘বেস্ট অব দ্য ওয়েস্ট’ ইয়ুথ লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ডে সম্মানিত তাহমিদ চৌধুরী সরকারি কর্মকর্তা সেজে বাড়ছে প্রতারণা চল্লিশ বছর আগের সেই দিনটির কথা দিয়েই শুরু ড. খলিলের চুক্তি না হলে ইরানকে ধ্বংসের হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের


আবারো নতুন করে ইমেজ সঙ্কটে জামায়াত
সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৩-০৯-২০২৬
আবারো নতুন করে ইমেজ সঙ্কটে জামায়াত


রাজনৈতিক অঙ্গনে দু’টি ঘটনায় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে জামায়াতে ইসলামী। এনিয়ে দলের ভেতরে চাপা ক্ষোভ হতাশার সৃষ্টি করেছে। একইসাথে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে দলটি আবারও দেশে বিদেশে ইমেজে সঙ্কটে পড়েছে। কেনো কি কারণে বিষয়গুলি এইসময়ে উঠে আসলো, সেটি ভাবাচ্ছে দলটিকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আবদুল মালেকের ছবি প্রদর্শন নিয়ে জামায়াত বেকায়দা পড়েছে। এনিয়ে দলটি যতই বক্তব্য বাড়াচ্ছে ততই পড়ছে বেকায়দায়। বির্তক এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে, বিক্ষুদ্ধ একদল শিক্ষার্থী জিন্নাহ ও জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমের ছবি পায়ের নিচে রেখে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এই ধরনের ঘটনা দেশ জুড়ে-তো হয়েছেই এমনকি বিদেশেও জামায়াতের অতীতের কর্মকান্ড প্রশ্নে ইমেজ সঙ্কট তৈরি করেছে।

রাজ্জাকের বই আগুন ঘি ঢাললো

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও আবদুল মালেকের ছবি প্রদর্শন নিয়ে যখন দেশজুড়ে তুলকালাম কান্ড চলছে, তখন জামায়াতেরই একসময় তাত্ত্বিক নেতার বইয়ে প্রকাশিত তথ্য ভিন্ন আলোচনার ঝড় বইছে। জামায়াতের সাবেক নেতা ও সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী প্রয়াত ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী: এর ইতিহাস ও রাজনীতি’ শীর্ষক বই যেনো চলমান বির্তকের আগুনে ঘি ঢেলে দিলো। গণমাধ্যম থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব ইস্যুতে মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে তুলোধুনা করে ফেলা হচ্ছে। 

কি আছে সে বইয়ে

ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক বই প্রকাশ করেছে ইউপিএল। তিনি ১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে যোগ দেন। দলে প্রায় অনেকের মধ্যে বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে ব্যাপক আস্থা অর্জন করেন তিনি। ১৯৮৮ সালে রুকন হয়ে যান। ১৯৯১ সালের শুরুর দিকে কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরায় যোগ দেন। দলে তার দ্রুত গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা পেলে ২০০৩ সালে তাঁকে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হন। বলা হয় এতোদূর আসতে পেরেছেন কেনোনা দলটির একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি দলের ব্যাপক সংস্কারের পক্ষে থাকায় অপেক্ষাকৃত তরুণদের কাছে তিনি গ্রহণযোগ্য নেতায় পরিণত হন। বইটি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠেছে যে তা-তে তথ্য দেওয়া হয়েছে ২০১৯ সালে একপর্যায়ে জামায়াতের নির্বাহী কমিটি একাত্তরের বিষয়টি মোকাবিলা, দল বিলুপ্ত করা ও নতুন দল গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পরে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। এর পরপরই ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন বলে তুলে ধরেন। 

তার বইয়ে একাত্তরের ভূমিকার ব্যাপারে জামায়াতের ক্ষমা চাওয়ার ব্যাপারে দলের ভেতরে ত্ব্রী মতভেদের বিষয়টি উঠে আসে। দলের কট্টরপন্থীরা জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকার কারণে ক্ষমা চাইতে যে রাজি না তা ফুটে উঠেছে। বইটির মাধ্যমে জানা গেলো যে, ১৯৯৪ সালের ২২ জুন সুপ্রিম কোর্টের রায়ে গোলাম আযমের বাংলাদেশের নাগরিকত্বের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রায় এক বছর আগে, ১৯৯৩ সালের ৪ জুলাই, জামায়াতের তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল মতিউর রহমান নিজামীকে চিঠি লিখেছিলেন আবদুর রাজ্জাক। নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়ার পর গোলাম আযমের জাতির উদ্দেশে প্রথম ভাষণে একাত্তরের ভূমিকার বিষয়টি তুলে ধরার পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি। বইয়ের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালের ২২ জুন সুপ্রিম কোর্টের রায়ে গোলাম আযমের বাংলাদেশের নাগরিকত্বের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রায় এক বছর আগে, ১৯৯৩ সালের ৪ জুলাই, জামায়াতের তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল মতিউর রহমান নিজামীকে চিঠি লিখেছিলেন আবদুর রাজ্জাক। নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়ার পর গোলাম আযমের জাতির উদ্দেশে প্রথম ভাষণে একাত্তরের ভূমিকার বিষয়টি তুলে ধরার পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু রায়ের পর ২৪ জুন ঢাকার বায়তুল মোকাররমে বিজয় সমাবেশ হয়। গোলাম আযমের বক্তব্য প্রস্তুতে একটি কমিটি করা হয়েছিল। কিন্তু সমাবেশে গোলাম আযম কেবল বলেন, ‘অতীতে যদি আমি কোনো ভুল করে থাকি, দয়া করে আমাকে ক্ষমা করবেন।’ এই ব্যাপারে রাজ্জাকের মতে, গণমাধ্যম মূলত বক্তব্যটি উপেক্ষা করেছিল। তিনি একে বড়জোর দায়সারা ক্ষমা প্রার্থনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে এটি ক্ষমা প্রার্থনাই ছিল না। গুরুতর একটি বিষয় মোকাবিলার অসংলগ্ন চেষ্টা ছিল। 

জামায়াতকে স্বাধীনতা বিরোধী দলই মনে করতেন

রাজ্জাকের ওই বইয়ে বিভিন্ন তথ্যে দখো জামায়াতে যোগ দিলেও তিনি আসলে একে একটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী দল হিসাবেই মনে করতেন। তা-ই দলটিকে এই পথ থেকে সরে আসতে পরামর্শ দিতেন। বইয়ের একটি প্রসঙ্গেও উল্লেখ করে রাজ্জাক লিখেছেন, ‘সেখানে তিনি যুক্তি দেন, কোনো দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী দল নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে-বিশ্বের ইতিহাসে এমন নজির নেই। বাংলাদেশে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে হলে জামায়াতকে একাত্তরের বিষয়টি মোকাবিলা করতে হবে।

বইয়ে আরেকটি বিষয়ের উল্লেখ করতে গিয়েও রাজ্জাক জানালেন জামায়াত আসলে মুক্তিযুদ্ধের যে একটি বিরোধী দল ছিল এবং এই ব্যাপারে দলটির শীর্ষ নেতারা যে দায়সারা ভাবে পাশ কেটে যেতেন তা ফুটে উঠেছে। তার বইয়ে জানানো হয় যে, ২০০৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০১০ সালের জুনে নিজামীসহ নেতারা গ্রেপ্তার হওয়ার আগ পর্যন্ত ওয়ার্কিং কমিটি ও নির্বাহী কমিটিতে একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে বহুবার আলোচনা হয়। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এসব বৈঠকে তিনি বারবার প্রশ্ন তোলেন বলে বইয়ে তথ্য তুলে ধরা হয়। বলা হয় ‘১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সমর্থন করা জামায়াতের জন্য রাজনৈতিক ও নৈতিকভাবে সঠিক ছিল কি না। সঠিক মনে করলে দলকে তা প্রকাশ্যে বলতে হবে। তা না হলে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে।’ এব্যাপারে ব্যারিস্টার রাজ্জাক লিখেছেন, ‘একাত্তর নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান না নেওয়ায় ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে জামায়াতের নেতৃত্বকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়ের পর যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে জামায়াত নেতাদের বিচার প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়।’

এখন কি হবে

এককভাবে পাওয়া ৬৮টি আসন নিয়ে দেশের সংসদের ইতিহাসে চতুর্থ বৃহত্তম দল জামায়াতে ইসলামী। দলের আমির শফিকুর রহমানকে বিরোধী দলীয় নেতা। আর উপনেতা হচ্ছেন নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের। অপেক্ষাকৃত তরুণরা বিগত আওয়ামী সরকারের পতনে বড়ো ভূমিকা রেখেছে বলে দলের ভেতরে আওয়াজ তুলে তাদের অবস্থান ভারী করেছেন। প্রভাবও তাদের বেশি। এই তরুণা আর জামায়াতকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর কিংবা মুক্তিযুদ্ধে জামায়াত একটি সত্যিকার ভাবেই স্বাধীনতা বিরোধী দল হিসাবে ছিল বলে দেখতে চায় না। কারো কারো মতে, একারণেই ডাকসু সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আবদুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের পাশাপাশি ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের প্রকাশিত বইয়ের তথ্যগুলি এসময়ে জামায়াত-শিবিরকে একটি বড়ো ঝাকুনি দিচ্ছে। জানান দিচ্ছে তাদের দলের অতীত কতটা নির্মম। এর প্শাাপাশি সে-ই অবস্থান স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া বিষয়টিতে দলটি কতটা কট্টর তা-ও স্পস্ট হয়ে উঠছে। অতীত অবস্থান থেকে সরে আসতে চুল পরিমাণ ছাড় দিতে-ও যে তারা কতটা নারাজ তা-ও জানতে পারছে দলটিতে এখনো আঁকড়ে থাকা এই প্রজন্মের তরুণরা।

শেয়ার করুন