১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ০৪:১২:৫৬ অপরাহ্ন
শিরোনাম :


৬ দফা না মানলে ১ দফা : কী চায় জামায়াত
বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট করা হয়েছে : ১০-০৯-২০২৬
৬ দফা না মানলে ১ দফা : কী চায় জামায়াত ১১ দলের নেতৃবৃন্দ


দীর্ঘ ১৭ বছর পর নির্বাচিত সরকার হিসেবে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে ছয় মাস হলো। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে, আর সংসদে জামায়াতে ইসলামী প্রথমবারের মতো প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসেছে। এক সময়ের জোটসঙ্গী আজ প্রতিদ্বন্দ্বী—এই নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন এক অধ্যায় যোগ করেছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের পর দুই দল মিলে দেশ পুনর্গঠনে গঠনমূলক ভূমিকা রাখবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। অভিযোগ, জামায়াত কেনই যেন মেনেই নিতে পারছে না বিএনপিকে! ৬ মাস যেতে না যেতেই সরকার পতনের আলিন্টমেটাম জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের। 

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রেক্ষাপট

শেখ হাসিনার পতনের অন্যতম কারণ ছিল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ভয়াবহ অবক্ষয়। বিদ্যুৎ উৎপাদনের নামে কুইক রেন্টাল ব্যবস্থার আড়ালে একশ্রেণির সুবিধাভোগীকে অস্বাভাবিক মূল্যে বিদ্যুৎ ক্রয়ের চুক্তি দেওয়া হয়েছিল, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় কোষাগার ও জনগণের ওপরই পড়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতি, রিজার্ভ সংকট আর দুর্নীতির জালে দেশ যখন প্রায় দেউলিয়ার মুখে, মানুষ যখন মুক্তির উপায় খুঁজে তটস্থ, তখনই এক গণজাগরণের মধ্য দিয়ে পটপরিবর্তন ঘটে। আওয়ামী সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বিএনপি সরকার অর্থনীতি পুনর্গঠনের যে পথে হাঁটছে, তা মূলত ধারাবাহিক ও কাঠামোগত সংস্কারের চেষ্টা—যদিও ফলাফল রাতারাতি দৃশ্যমান হওয়ার কথা নয়। সাধারণ মানুষ এটাই বলছে। সময় দিতে হবে। চোখ কান খোলা রাখতে হবে। সংসদে বিরোধী দলের নেতাও বলছেন এ সমস্যা হুট করে আসেনি। এই ৬ মাসে হয়নি। এটা পুরানো সমস্যার ধারাবাহিকতা। আবার পরক্ষণে এ ইস্যুতে লংমার্চ, সরকারের বিরুদ্ধে। সেখানে বলাও হচ্ছে এ আন্দোলন সরকার পতনের নয়। আবার সে আন্দোলনে ৬ দফা দাবি না মানলে ১ দফা এ ঘোষণাও দেয়া হয়। এ যে তালগোল পাকানো কথাবার্তা, যেটার মহিমা মানুষ বুঝতে হিমশিম খাচ্ছে। 

বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন

সংসদে বিরোধী দলের আচরণ সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। ওয়াকআউট, প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে মুখে কালো কাপড় বেঁধে প্রদর্শনী, একদিকে সরকারের কঠোর সমালোচনা, আবার অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা—এই দ্বৈত আচরণ জনগণের কাছে সামঞ্জস্যহীন মনে হচ্ছে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ইস্যুতে ডাকা লংমার্চে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশিত সম্পৃক্ততার অভাব, এটাই প্রমাণ করে যে, রাজপথের কর্মসূচির চেয়ে মানুষ এখন স্থিতিশীলতা ও ধারাবাহিকতাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

৬ দফা না মানলে ১ দফা 

গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ ছয় দফা দাবিতে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে ‘লং মার্চ’ করে। এতে নেতৃবৃন্দ স্পষ্ট করে বলেছেন , ৬ দফা না মানলে ১ দফার আন্দোলন শুরু করবেন তারা। 

কী সেই ৬ দফা- 

গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন: গণভোটে অনুমোদিত জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী হুবহু সংবিধান সংস্কার করা।

জুলাই গণহত্যার বিচার: জুলাই বিপ্লবে সংঘটিত গণহত্যার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা।

সংকট নিরসন: বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট দূর করা।

মূল্য নিয়ন্ত্রণ: নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কমানো বা ঊর্ধ্বগতি রোধ করা।

দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ: সমাজ থেকে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি কঠোরহস্তে দমন করা।

আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসন: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা।

দাবি, হুমকি ও অনিশ্চয়তা

ছয় দফা দাবি না মানলে ডিসেম্বরের মধ্যে এক দফা আন্দোলনের হুমকি, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার গুঞ্জন, সরকার ফেলে দেওয়ার আভাস—এই সবকিছু মিলিয়ে একটি অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। মুখে সরকার-পতনের আন্দোলন নয় বলা হলেও কার্যক্ষেত্রে যেসব কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে, তাতে উদ্দেশ্য নিয়ে জনমনে সংশয় স্বাভাবিক। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, সদ্য গঠিত সরকারকে স্থিতিশীল হওয়ার ন্যূনতম সময় না দিয়ে চাপ প্রয়োগের কৌশল দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

অশ্রাব্য গালি দানকারীর পক্ষালম্বন 

সর্বশেষ, লংমার্চের ঠিক আগের দিন গাজীপুরে কুড়ি বছর বয়সী একজন ছাত্র ফেসবুক লাইভে এসে যে অশ্রাব্য গালীগালাজ করেছে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার বাবা মা’কে তুলে। সে ভাষা দ্বিতীয়বার কেউ শুনতে চান না। তারেক রহমানের বাবা-মা কে সেটা কারোর অজানা নয়। তিনি জারজ সন্তান বলতেও ছাড় দেননি। 

একজন সন্তান, একজন ছাত্র কিভাবে এত নোংরা, অসভ্য ভাষা ব্যবহার করতে পারে এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড়। ওই ছাত্রের যে দাবি সেটা গাজীপুর পল্লীবিদ্যুৎ বারবার চেক করেছে, তদন্ত করে তার অভিযোগের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কিছুই পাননি। অথচ তিনি বলেন, বিগত দুই মাসে এক মাসে ৫ হাজার অন্য মাসে চার হাজার টাকা বিল দিয়েছে। যা ভৌতিক বিল ছিল বলে তার দাবি। 

পরের দিন লংমার্চের সভায় ওই ছাত্রকে ছেড়ে দেয়ার দাবি তোলে জামায়াত ইসলামের আমীর ডা. শফিকুর রহমান। সভায় তিনি বলেন, “অতিষ্ঠ্য হয়ে, বিরক্ত হয়ে সিফাত নামের একজন তরুণ কী বলেছিল, তাতে বাংলাদেশ ওলট পালট হয়ে যাবার মতো..। তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। দলীয় সন্ত্রাসীরা থানায় যেয়ে তাকে নাজেহাল করেছে। আমরা পরিস্কারভাবে বলে দিতে চাই। সিফাতের মুখের ভাষা নয়, যে বিষয়ে সে প্রতিবাদ করেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ প্রয়োজনে সিফাত হয়ে গর্জন করবে। ওরে ছেড়ে দেন। ভালোয় ভালোয় ছেড়ে দেন। যদি না ছাড়েন। তা হলে মনে রাখবেন। এক নূর হোসেন, এক ইয়াসমিন, এক ডাক্তার মিলন অনেকের গদি একেবারে ওলট পালট করে দিয়েছিল। কখন যে পচা শামুকে পা কাটবে তা কেউ বলতে পারবে না।” 

এখন আসা যাক কী বলেছিল সিফাত। যে জন্য গ্রেফতার করা হয়। কীইবা তার পরিচয়। সিফাত নিজেকে এনসিপি’র সদস্য দাবি করলেও প্রথমে গাজীপুরের এনসিপির নেতৃবৃন্দ সনাক্তকরণ শেষে ওই ছেলে তাদের কোনো কর্মী নন বলে সংশ্লিষ্ট থানার ওসিকে জানিয়ে চলে যায়। জামায়াতও বা অন্য কেউ ওই ছেলের দায়িত্ব নেয়নি। এমনকি তাকে দল থেকেও বহিষ্কার করেনি। অতীতে এনসিপির শীর্ষ এক নেতাকে এমন অশ্রাব্য গালির জন্য বহিষ্কার করলেও (বগুড়াতে) এবার এনসিপি দায়িত্ব নেয়নি। পরে দেখা গেছে ওই সিফাত নামের ছেলে ছাত্র লীগের কর্মকান্ডে জড়িত। পাঁচ তারিখের পট পরিবর্তনের পর সে নিজেকে পরিবর্তন করে ফেলে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও তে দেখা যায় ও বলতে শোনা যায়- (দুটি বিদ্যুৎ বিল হাতে দেখিয়ে) 

“মাদা**চোদ বিএনপি সরকার, খা**কির পোলা , টাকা কী গাছে ধরে। ওই শু**রের বাচ্চা। টাকা কী তোর বাপে দিব না তোর মায়ে দিব। তুই তো একটা জারজ। তুই জারজ, তোর চৌদ্দগুষ্টি জারজ। বাংলাদশকে দিসজ হোগা মাইরা ৬ মাসের মধ্যে, শু**রের বাচ্চা। নির্বাচন দে, নির্বাচন দে- কু***র বাচ্চা, নির্বাচন দেয়ার পর কী এ অবস্থা করে বাংলাদেশের? ক***ত্তার বাচ্চা তেল নাই, বিদ্যুৎ নাই খানকির পোলা। লোড শেডিং মা** চোদ। চাঁদাবাজি করস শু***র বাচ্চারা।”

পরবর্তীতে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সিফাতকে গ্রেফতার কারে ৪ সেপ্টেম্বর কারাগারে পাঠানো হয়। 

সবশেষ 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরোধী দলের ভূমিকা কখনোই কেবল প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়—এটি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করারও একটি হাতিয়ার। কিন্তু জবাবদিহিতা আর অস্থিরতা সৃষ্টির মধ্যে সীমারেখা টানা জরুরি। সদ্য গঠিত সরকারের সামনে অর্থনীতি পুনর্গঠন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার আর জনআস্থা পুনরুদ্ধারের বিশাল কাজ। এই সময়ে বিরোধী দলগুলোর কাছ থেকে গঠনমূলক সমালোচনা ও নীতিনির্ধারণী বিতর্কে সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রত্যাশিত, রাজপথের উত্তেজনা নয়।

তবে এটাও মনে রাখা দরকার, ভিন্নমত পোষণকারীরা এই একই ঘটনাপ্রবাহকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করবেন। জামায়াত ও তাদের সমমনা দলগুলোর পক্ষ থেকে বলা হতে পারে যে, বিদ্যুৎ-জ্বালানি নীতি ও অন্যান্য ইস্যুতে তাদের আন্দোলন প্রকৃতপক্ষে জনস্বার্থ রক্ষার একটি বৈধ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। সরকারকে মুখে সহায়তার কথা বললেও জনমনে এমন সব বক্তব্য বিরোধী দল দিয়ে বেড়ায় যাতে সাধারন মানুষ উত্তপ্ত হয়ে যেন মাঠে নেমে এ সরকারের পতন ঘটায়। এমন প্রেক্ষাপটে ৬ মাসের এ চিত্র সামনে রেখে দুই পক্ষ কিভাবে দেশ পূর্নগঠনে এগিয়ে যাবে এ নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তাও আছে!

শেয়ার করুন