লং মার্চে সাদিক কায়েম
একের পর পর বোমা হামলা ও গাড়িতে আগুন দেওয়া ও ভাংচুরের মতো ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। এর পাশাপাশি কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল তো আছেই। গত কয়েকদিনে পত্রিকার পাতা উল্টালে দেখা যায়, এক দিনেই রাজধানীর ছয় জায়গায় ১০টি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে গেছে। এমনকি খোদ রাজধানীর একটি থানার (কাফরুল) সামনে ফাঁকা বাসে আগুনের ঘটনা ঘটেছে। কে বা কারা আগুন লাগিয়েছে, তা নিশ্চিত করে বলতে পারছে আইন শৃংখলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনী। কাফারুলের এই ঘটনার কিছুক্ষণ পরে রামপুরায় বিটিভি ভবনের দুটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
এর-ই মধ্যে মাত্র সাত মাসে মাথায় এক দফা আন্দোলনে যাবে বলে হুঙ্কার দিচ্ছে ক্ষমতাসীন বিএনপির দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতের নেতৃত্বে থাকা ১১ দলীয় জোট, চলছে তাদের লংমার্চ, সমাবেশের মতো কর্মসূচি। এব্যাপারে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জনগণের ৮ দফা দাবি মেনে না নিলে তা এক দফার আন্দোলনে পরিণত হতে পারে। জানালেন ‘তখন আন্দোলন আরও কঠোর হবে।’
এদিকে জামায়াত জোট তাদের পক্ষ থেকে রাস্তায় নেমে লংমার্চেরও একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন। তাদের মতে, যদি জুলাই সনদের পাশাপাশি গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন করা হতো ও একিই সাথে দেশে যদি দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ হতো এবং কৃষকরা ঠিকমতো সার পেতেন, তাহলে আমাদের লংমার্চ করতে হতো না।
নাগরিকরা উদ্বেগে
এদিকে এসব নিয়ে দেশের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ উৎকন্ঠার শেষ নেই। এতো ত্যাগ তিতিক্ষার পথ জাতি একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন পেলো। এর মধ্য দিয়ে একটি সরকারও ক্ষমতা এসেছে। এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে দাবি আদায়ের নামে জাতীয় সংসদ বাদ দিয়ে অতীতের সব বিরোধী দলের মতো রাস্তায় নেমে তা আদায় করার চেষ্টা। অথচ এইবার জনগণের ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে বসতে না বসতে এবং এর পাশাপাশি জাতীয় সংসদেরও একটি অধিবেশন শেষ না হতেই প্রধান বিরোধী দলের এমন আচরণকে কেউ স্বাভাবিক ভাবে নিচ্ছে না। তাদের আশঙ্কা এর পেছনে কোনো পক্ষের ‘ভালো গেম’ আছে। কারো কারো ধারণা নিজেরা নিজেরা ধর ধর বলে আবার ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আসার খেলা কি-না তা-ও এর পেছনে থাকতে পারে। কেননা রাজপথের আন্দোলনে শরিক একজন নেতা দেশ প্রতিনিধিকে জানান, ‘তারাও বুঝতে পারছেন না কেনো তাদের আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা? আবার এই আন্দোলন কর্মসূচি দেওয়ার সাথে সাথে দেশে কোনো এতো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে যাচ্ছে? কারা এমন করছে। কারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ককটেল ফাটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে?
গৎ বাধা অভিযোগ
এদিকে এসব ঘটনার পেছনে একটা আত্মপক্ষ বক্তব্য দাঁড় করিয়ে বেশ দৃঢ়তার সাথে বক্তব্য দিয়েছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)’র কর্মকর্তারা। বলা হয় বিদেশে পালিয়ে থাকা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের নির্দেশনায় রাজধানীতে ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। আর এবাপারে আরও বিস্তারিত বলতে গিয়ে জানানো হয় যে, রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বংশাল এলাকার একটি ইউনিটের দপ্তর সম্পাদকসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ জানালেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় ও নিষিদ্ধ দলের তথাকথিত কর্মসূচির প্রতিক্রিয়ায় এসব নাশকতার চেষ্টা করা হয়। হাইকোর্ট গেট ও যাত্রাবাড়ী এলাকার ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িতদের মোটরসাইকেলসহ গ্রেফতার করা হয়েছে।
জামায়াত ইঙ্গিত দিল অন্য কিছুর
এদিকে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের লোকের মুখে যখন এমন বয়ান তখন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার দিলেন অন্য তথ্য। তিনি বললেন, সরকারের ইঙ্গিতেই শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠন সারা দেশে বিক্ষোভ মিছিল করেছে। জামায়াতের এই নেতা আরও বলেন, ‘সরকারের প্রশ্রয়-আশ্রয় না থাকলে, এখানে ইন্টেলিজেন্স আছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আছে, পুলিশ আছে, তার সমস্ত এজেন্সি রয়েছে ল-এনফোর্সিং এজেন্সি, তার সামনে প্রতিটি জেলায় তারা মিছিল করতে পারল। কেউ কি বিশ্বাস করবে যে সরকারের কোনো ইঙ্গিত এখানে নাই। নিশ্চয়ই আছে।’
না-কি ‘গোপন সমঝোতা আঁতাত’ ধাপাচাপা দিতে?
এদিকে সরকারের সাথে সম্পৃক্ত বেশ কয়েকজনের মতে, জামায়াত সরকারকে চাপে নয়, বরং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে একটি পক্ষে সহায়তায় নিজেদের নির্বাচনের অংশ নেওয়ার দলগুলির ‘গোপন সমঝোতা আঁতাত’ ধাপাচাপা দিতে মাঠে আন্দোলন আন্দোলন খেলা খেলছে। যা জামায়াতের সাথে জোট বাধা শরিকরা-ও জানে। তাদের মতে, ওই গোপন সমঝোতা চেপে রাখতে জামায়াত জোটের শরিকদের একটা কিছু একটা দিয়ে এখন ব্যস্ত রাখছে। কারো কারো মতে, আবার ওই সমঝোতায় বর্তমানে ক্ষমতাসীনদের একটি বড়ো অংশও রয়েছে।
তার-ও কিছু নমুনা পাওয়া গেছে ইতোমধ্যে
জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১দলীয় ঐক্য একদিকে যখন আট দফা দাবিতে লংমার্চ কর্মসূচি নিয়ে ব্যস্ত, তখন দলটির ৩৪ জন সংসদ সদস্য (এমপি) রয়েছেন বিদেশ সফরে। ১৭ দিনের এই সফরে তাঁদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যরাও রয়েছেন। সব মিলিয়ে সফরকারী দলের সদস্য ৭১ জন, যা একটি গণমাধ্যমের খবরে দেখা যায়। এমন খবরের ব্যাপারে জামায়াত জানিয়েছে বলছে, এই সফর পূর্বনির্ধারিত। দলের পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এমপিদের বিদেশে নেওয়া হয়েছে। অথচ এই সফরকারী দলের ৩৪ জন এমপির মধ্যে ২৫ থেকে ২৬ জন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গেছেন। তাঁদের সঙ্গে রয়েছেন দলের কে›ন্দ্রীয় মজলিশে শুরা সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন এবং সাবেক এমপি ও সম্প্রতি জামায়াতে যোগ দেওয়া মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান। এ ছাড়া লেখক জিয়াউল হকও সফরসঙ্গী হয়েছেন। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে রাজনৈতিক মাঠে আন্দোলনের এতো হাকডাকের মধ্যে খোদ প্রধান শরিক দলের বিশাল বহর কি করে এতো বড়ো সফরে শরিক হয়ে যায়? তা হলে কি মাঠের এসব আন্দোলন এক দফার হাকডাক কেবল ‘ছেলে ভোলানো খেলা”?
না-কি নির্বাচিত সরকারকে বিব্রত করা?
এদিকে আরেকটি পক্ষ মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন। ২৪ সেপ্টেম্বর তিনি সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেবেন। এছাড়া ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস কর্তৃক রাষ্ট্র-সরকার প্রধানদের সম্মানে আয়োজিত এক স্বাগত প্রাতরাশ সভায় যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। পরে তিনি অন্য বিশ্বনেতাদের সঙ্গে সাধারণ পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশনে যোগ দেবেন। সন্ধ্যায় রাষ্ট্র-সরকারপ্রধান ও তাঁদের জীবনসঙ্গীদের সম্মানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আয়োজিত একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন তিনি। জাতিসংঘে তারেক রহমানের ভাষণ ও জিয়া পরিবারের চার দশকের ইতিহাসের এমন সময়ে তার দেশের প্রধান বিরোধী দল রাজপথে আন্দোলন সংগ্রাম করছে? দেশের ভেতরে এমন নেতিবাচক অবস্থান তুলে ধরতেই জামায়াত এমন পূর্বপরিকল্পনা নিয়েছে বলে কারো কারো অভিমত। আবার তারেক রহমান যখন বিদেশের মাটিতে ঠিক তখনই দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দিল সরকার, যা অনেকের কাছে কিছুটা রহস্যের-ও সৃষ্টি করেছে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, রোববার রাতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে নতুন দাম নির্ধারণের কথা জানানো হয়েছে।
না-কি তৃতীয় পক্ষের খেলার পার্ট
এদিকে কারো কারো মতে, জামায়াত যদি একদফার আন্দোলনে যোগ দেয় বা একে তরান্বিত করে বিএনপিকে ক্ষমতা থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেয় সেক্ষেত্রে কারা লাভবান হবে? কারো কারো বিশ্লেষন এক্ষেত্রে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামীকে ক্ষমতায় নিয়ে আনতে কিংবা ডিসেম্বরে ও-ই দলটির সভাপতি বাংলাদেশে ফেরার পথ তৈরি করে দেওয়া হবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এটা কি জামায়াত করতে পারে, বা রাজনৈতিক পরিকল্পনায় থাকতে পারে? সেক্ষেত্রে কারো কারো অভিমত অতীতের বিভিন্ন ধরনের ঘটনা। কেননা তারা দেশের অতীত রাজনেতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি বর্তমানে ভূ-রাজনীতির পরিস্থিতিও কেউ কেউ আমলে নিচ্ছেন। কেননা স্বৈরাচার শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সরকারের সরকারের আমলে ১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি, বরং দলটি ওই নির্বাচন বয়কট করেছিল। তবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং জামায়াতে ইসলামী সেই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল।
অন্যদিকে বর্তমানে ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে একসময়ের চরম শত্রু তালেবানের সঙ্গে ভারত এখন বাস্তবসম্মত ও pragmatist (বাস্তবমুখী) কূটনৈতিক সম্পর্কের দিকে এগিয়ে চলেছে। ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর ভারত কাবুল থেকে নিজেদের দূতাবাস গুটিয়ে নিলেও, পরবর্তীতে পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ধীরে ধীরে সম্পর্ক বদলাতে শুরু করে। শত্রু থেকে এই বন্ধুত্বের সমীকরণের পেছনে রয়েছে কিছু সুনির্দিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণ। একসময় তালেবানের প্রধান মিত্র বা আশ্রয়দাতা হলেও বর্তমানে পাকিস্তান ও তালেবান সরকারের মধ্যে তীব্র তিক্ততা ও সীমান্ত বিরোধ চলছে। বাংলাদেশের রাজনীতির খেলার মাঠে বর্তমানে প্রধান বিরোধী দলকে তাদের অতীতের ঘনিষ্ট মিত্র থেকে দুরে সরিয়ে কোনো দেশ ‘তালেবানি কৌশলে’ কাছে টানছে কি-না তা সময় বলে দেবে। অন্যদিকে এমন ভূ-রাজনৈতিক খেলায় আবার কোনো পক্ষ চোরাবালিতে পড়তে যাচ্ছে কি-না তা সময় বলে দেবে।