বাই নাউ, পে লেটার
নিউইয়র্কে ‘বাই নাউ, পে লেটার’ ঋণ ব্যবস্থার ওপর কঠোর ভোক্তা সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নতুন ও যুগান্তকারী নিয়ন্ত্রণ কাঠামো ঘোষণার উদ্যোগ নিয়েছেন স্টেট গভর্নর। নিউ ইয়র্ক স্টেট ডিপার্টমেন্ট অফ ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস প্রকাশিত প্রস্তাবিত বিধিমালায় এই খাতের জন্য লাইসেন্সিং ও তদারকি ব্যবস্থা চালু, অতিরিক্ত ফি সীমিতকরণ, বাধ্যতামূলক তথ্য প্রকাশ, বিরোধ নিষ্পত্তির মানদণ্ড নির্ধারণ এবং গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিধান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। দ্রুত বর্ধনশীল এই আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নেওয়া পদক্ষেপটি নিউইয়র্ককে আবারও জাতীয় পর্যায়ে ভোক্তা অধিকার সুরক্ষায় অগ্রগামী অবস্থানে নিয়ে গেছে।
এই বিধানের লক্ষ্য নিউইয়র্কবাসী যারা ‘এখন কিনুন, পরে পরিশোধ করুন’ ধরনের আর্থিক সুবিধা ব্যবহার করেন, তাদের জন্য স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ন্যায্যতার নিশ্চয়তা প্রদান। প্রস্তাবিত এই নিয়মাবলি গভর্নরের ২০২৬ অর্থবছরের বাজেটের অংশ হিসেবে স্বাক্ষরিত আইনের বাস্তবায়ন কাঠামো নির্ধারণ করবে এবং এখন কিনুন, পরে পরিশোধ করুন ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য লাইসেন্সিং ও তদারকি ব্যবস্থা চালু করবে। একই সঙ্গে এতে বাধ্যতামূলক তথ্য প্রকাশ, বিরোধ নিষ্পত্তির মানদণ্ড, ফি নির্ধারণে সীমা এবং ভোক্তার ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনলাইন ও খুচরা বাজারে এখন কিনুন, পরে পরিশোধ করুন সেবা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ক্রেতারা তাৎক্ষণিকভাবে পণ্য কিনে কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের সুযোগ পাচ্ছেন, যা অনেকের কাছে স্বল্পমেয়াদি আর্থিক স্বস্তি এনে দিয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, এই খাতে স্পষ্ট নিয়ম না থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত ফি, বিলম্ব মাশুল এবং অস্পষ্ট শর্তের মাধ্যমে গ্রাহকদের আর্থিক চাপে ফেলছে। গভর্নর হোচুল বলেন, অনেক নিউইয়র্কবাসী কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বুঝেছেন যে কিছু এখন কিনুন, পরে পরিশোধ করুন পণ্য গ্রাহকদের সহায়তা করার বদলে জটিল শর্ত ও অপ্রয়োজনীয় ফাঁদে ফেলে। তার ভাষায়, নতুন নিয়মাবলি নিশ্চিত করবে যে ঋণদাতারা পরিষ্কার তথ্য দেবে, ফি’র সীমা মানবে এবং কার্যকর তদারকির আওতায় থাকবে যাতে পরিবারগুলো ঋণের দুষ্টচক্রে আটকে না পড়ে।
ডিপার্টমেন্ট অব ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের ভারপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট ক্যাটলিন অ্যাসরো এক বিবৃতিতে বলেন, আর্থিক খাতে উদ্ভাবন অবশ্যই শক্তিশালী ভোক্তা সুরক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। তার মতে, নতুন বিধিমালা বাই নাউ, পে লেটার কোম্পানিগুলো কীভাবে পরিচালিত হবে তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করবে এবং অতিরিক্ত ফি আদায়, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার ও অস্বচ্ছ ঋণ শর্ত থেকে নিউইয়র্কবাসীকে সুরক্ষা দেবে। একই সঙ্গে গ্রাহক অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য ন্যায্য ও সময়োপযোগী প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা হবে।
বর্তমানে বাই নাউ, পে লেটার ঋণগুলো ঐতিহ্যবাহী ভোক্তা ঋণের মতো একক ও সমন্বিত নিয়মের আওতায় নেই। অনেক ক্ষেত্রেই ঋণের শর্ত, তথ্য সুরক্ষা, ক্রেডিট রিপোর্টিং এবং ফি কাঠামো নিয়ে স্পষ্ট বাধ্যবাধকতা নেই। ২০২৫ সালে গভর্নর হোচুল দ্রুত বর্ধনশীল এই খাতে কঠোর নজরদারি প্রতিষ্ঠার পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন এবং একটি আইন প্রণয়ন করেন, যা বাই নাউ, পে লেটার প্রদানকারীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ লাইসেন্সিং ও তদারকি কাঠামো তৈরি করে। ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত প্রস্তাবিত নিয়মাবলি সেই আইনের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে।
নতুন বিধিমালার অধীনে নিউইয়র্কে বাই নাউ, পে লেটার কার্যক্রম পরিচালনাকারী যে কোনো প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স নিতে হবে এবং রাজ্যের তদারকির আওতায় আসতে হবে। অতিরিক্ত বা অযৌক্তিক ফি আরোপ নিষিদ্ধ করা হবে, বিশেষ করে কনভিনিয়েন্স ফি নামে পরিচিত চার্জ। বিলম্ব ফি ও অন্যান্য জরিমানা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখতে হবে। ঋণদাতাদের স্পষ্টভাবে জানাতে হবে যে গ্রাহকের ঋণ তথ্য ক্রেডিট রিপোর্টিং এজেন্সিতে পাঠানো হবে কিনা। গ্রাহক বিরোধ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা ও পদ্ধতি নির্ধারণ করা হবে। পাশাপাশি ভোক্তার ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য অপব্যবহার বা বাণিজ্যিক শোষণ থেকে রক্ষার জন্য কঠোর তথ্য সুরক্ষা বিধান থাকবে।
ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে, খসড়া বিধিমালা তৈরির আগে তারা প্রাক-নিয়ম প্রণয়ন পর্যায়ে বিভিন্ন পক্ষের মতামত সংগ্রহ করেছে। ফি কাঠামো, আন্ডাররাইটিং প্রক্রিয়া এবং সুদের সীমা ব্যবসায়িক কার্যক্রমে কী প্রভাব ফেলতে পারে। এসব বিষয়ে প্রাপ্ত তথ্য বিবেচনায় নিয়েই চূড়ান্ত খসড়া তৈরি করা হয়েছে। ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ দিনের প্রাক-প্রস্তাব মন্তব্যকাল শুরু হয়েছে। এরপর স্টেট রেজিস্টারে প্রকাশের পর ৬০ দিনের জন্য জনমত গ্রহণ করা হবে। বিধিমালা গৃহীত হলে ১৮০ দিনের মধ্যে কার্যকর হবে এবং যারা ইতোমধ্যে নিউইয়র্কে বাই নাউ, পে লেটার সেবা দিচ্ছে তাদের জন্য একটি অতিরিক্ত রূপান্তরকাল থাকবে।
গভর্নর হোচুলের ভাষ্য অনুযায়ী, এই পদক্ষেপ তার বৃহত্তর ভোক্তা সুরক্ষা কর্মসূচির অংশ। ২০২৬ অর্থবছরের নির্বাহী বাজেটে তিনি প্রথমবারের মতো সার্ভেইলেন্স প্রাইসিং নিয়ন্ত্রণ আইন, অনলাইন সাবস্ক্রিপশন সহজে বাতিলের ব্যবস্থা, অনলাইন খুচরা পণ্যের রিটার্ন ও রিফান্ড মানসম্মত করা এবং অন্যায্য ওভারড্রাফট ফি কমানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। এসব উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় বাই নাউ, পে লেটারখাতেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে চায় প্রশাসন।
অনেকের মতে, বাই নাউ, পে লেটার বাজারের দ্রুত সম্প্রসারণ তরুণ ও নিম্ন-মধ্য আয়ের গ্রাহকদের কাছে আকর্ষণীয় হলেও, যথাযথ নিয়ন্ত্রণ না থাকলে এটি উচ্চ সুদ ও ফি’র মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অনেক গ্রাহক একাধিক প্ল্যাটফর্মে একসঙ্গে ঋণ নিয়ে দেনার বোঝা বাড়িয়ে ফেলেন, যা শেষ পর্যন্ত তাদের ক্রেডিট স্কোর ক্ষতিগ্রস্ত করে। নতুন বিধিমালা এই অনিয়ন্ত্রিত প্রবণতা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
গভর্নরের কার্যালয় জানিয়েছে, বাই নাউ, পে লেটার খাতে স্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে নিউইয়র্ক আবারও জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের অবস্থান নিয়েছে। অন্যান্য স্টেটও অনুরূপ নীতিমালা বিবেচনা করছে, ফলে নিউইয়র্কের মডেল ভবিষ্যতে দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করতে পারে। সব মিলিয়ে, প্রস্তাবিত বিধিমালা নিউইয়র্কে ডিজিটাল আর্থিক সেবার দ্রুত পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যদি এটি চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয়, তবে বাই নাউ, পে লেটার ঋণ গ্রহণকারীরা স্পষ্ট তথ্য, সীমিত ফি এবং শক্তিশালী তথ্য সুরক্ষার নিশ্চয়তা পাবেন। একই সঙ্গে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় এনে বাজারে একটি স্বচ্ছ ও টেকসই পরিবেশ গড়ে তোলাই হবে এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।