০৭ মে ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ০৫:৩৮:২১ অপরাহ্ন


উচ্চ আবাসন ব্যয় ও আর্থিক চাপ
যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ির ফোরক্লোজার ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চে
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৬-০৫-২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ির ফোরক্লোজার ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চে বাড়ির ফোরক্লোজার


যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ির মালিকানা ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশটিতে ফোরক্লোজার বা ঋণ খেলাপির কারণে বাড়ি হারানোর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ফোরক্লোজার ফাইলিং ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা আবাসন বাজারে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সম্পত্তি তথ্য প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাটম-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রথম প্রান্তিকে প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার সম্পত্তিতে ফোরক্লোজার ফাইলিং হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি। এটি ২০২০ সালের পর সর্বোচ্চ স্তর, যখন মহামারি-পরবর্তী সহায়তা কর্মসূচির কারণে ফোরক্লোজার হঠাৎ কমে গিয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এই বৃদ্ধি সরাসরি কোনো বড় সংকটের ইঙ্গিত নয়, বরং এটি মহামারির আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাওয়ার প্রবণতা। তবে বাড়ি মালিকদের জন্য খরচ বৃদ্ধি এখন বড় চাপের কারণ হয়ে উঠছে।

বিশেষ করে বাড়ি বিমা, সম্পত্তি কর, বিভিন্ন বিল এবং হোমওনার অ্যাসোসিয়েশন ফি দ্রুত বাড়ছে, যা মাসিক খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে। একই সঙ্গে অনেকের ক্ষেত্রে ছাত্রঋণ পরিশোধ পুনরায় শুরু হয়েছে এবং ক্রেডিট কার্ড ও গাড়ি ঋণের বকেয়াও বাড়ছে, যা আর্থিক চাপ আরো বাড়িয়ে তুলছে। যারা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাড়ি কিনেছেন তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন, কারণ তারা তুলনামূলক বেশি সুদের হারে ঋণ নিয়েছেন। অনেক এলাকায় বাড়ির দাম কমে যাওয়ায় কিছু মালিক এখন তাদের সম্পত্তিতে ঋণের চেয়ে কম মূল্যের অবস্থায় রয়েছেন, যাকে আন্ডারওয়াটার বলা হয়।

মর্টগেজ ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের অর্থনীতিবিদ মারিনা ওয়ালশ বলেন, কর, বিমা ও অন্যান্য ব্যয়ের কারণে অনেকের মাসিক পেমেন্ট হঠাৎ বেড়ে গেছে, যা তাদের জন্য বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, গড় বার্ষিক বাড়ি বিমার খরচ এখন প্রায় ২ হাজার ৯৪৮ ডলার, যা এক বছরে ১২ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে গড় সম্পত্তি করও ৩ শতাংশ বেড়ে ৪ হাজার ৪২৭ ডলারে পৌঁছেছে। যেসব পরিবারের আয়ের বড় অংশ আবাসন ব্যয়ে চলে যায়, তারা ঋণ পরিশোধে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে বেশি থাকে।

আইনি সহায়তা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ফোরক্লোজার-সংক্রান্ত আইনি পরামর্শের চাহিদাও ২০ শতাংশ বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, প্রাথমিকভাবে বাড়ির মালিকরা মাসিক খরচ সামাল দিতে পারলেও পরবর্তীতে কর ও বিমার খরচ বেড়ে যাওয়ায় তারা পিছিয়ে পড়ছেন। ফেডারেল হাউজিং অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের নীতিগত পরিবর্তনের কারণে এখন আর সহজে বারবার ঋণ পুনর্গঠন বা সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না, ফলে অনেক পরিবার দ্রুত আর্থিক সংকটে পড়ছে। কিছু এলাকায় বাড়ির মালিকরা বাড়ি বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন, তবে যেসব অঞ্চলে বাজার দুর্বল সেখানে পরিস্থিতি আরো খারাপ হচ্ছে এবং ফোরক্লোজার বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ আবাসন ব্যয়, বাড়তি কর ও বিমার চাপ এবং ঋণ পুনর্গঠনের সীমিত সুযোগ, এ তিনটি কারণ একত্রে মিলে নতুন করে ফোরক্লোজার সংকট তৈরি করছে।

যুক্তরাষ্ট্রে ফোরক্লোজার বাড়ছে: ফেডারেল হাউজিং সহায়তা কমানোয় সম্ভাব্য নতুন সংকট

যুক্তরাষ্ট্রে আবাসন খাতে চাপ আবারও বাড়তে শুরু করেছে। পূর্ববর্তী বাইডেন প্রশাসনের সময় চালু করা একটি গুরুত্বপূর্ণ হাউজিং সহায়তা কর্মসূচি কমিয়ে দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ি ফোরক্লোজারের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে বলে নতুন তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে আগামী মাসগুলোতে আরো বড় সংখ্যক মানুষ তাদের বাড়ি হারাতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাসে গত বছরের তুলনায় ফোরক্লোজার ফাইলিং প্রায় ২৮ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে অ্যাটম। যদিও এই সংখ্যা এখনো ২০১৯ সালের তুলনায় কম, অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন যে প্রবণতা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হতে পারে।

এই সংকট মূলত ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব হাউজিং অ্যান্ড আরবান ডেভেলপমেন্টের একটি পূর্ববর্তী সহায়তা কর্মসূচির পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত। এ কর্মসূচির মাধ্যমে ফেডারেল হাউজিং অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ঋণগ্রহীতারা আর্থিক সংকটে পড়লে পার্শিয়াল ক্লেইম নামে একটি সহায়তা পেতেন, যার মাধ্যমে বকেয়া পরিশোধ করে তারা বাড়িতে থাকতে পারতেন। কোভিড মহামারির সময় এই সুবিধার ওপর সীমাবদ্ধতা তুলে নেওয়া হয়েছিল, ফলে একাধিকবার সহায়তা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে এই সুবিধার অপব্যবহার হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। উদাহরণ হিসেবে দেখা গেছে, একজন ঋণগ্রহীতা একটি বাড়ির বিপরীতে একাধিকবার সহায়তা নিয়ে প্রায় ৯৬ হাজার ডলার পর্যন্ত বকেয়া সুবিধা পেয়েছেন, যা কার্যত দীর্ঘমেয়াদি সুদবিহীন ঋণের মতো কাজ করেছে।

পরবর্তীতে নতুন নিয়মে কঠোরতা আনা হয়। বর্তমান নীতিমালায় বলা হয়েছে, এখন থেকে একজন ঋণগ্রহীতা দুই বছরের মধ্যে একাধিকবার এই সহায়তা নিতে পারবেন না এবং সহায়তা পাওয়ার আগে টানা তিনটি মর্টগেজ কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। এই পরিবর্তনকে প্রশাসন ঋণ ব্যবস্থার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।

এই কঠোর নিয়মের ফলে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ ঋণগ্রহীতা সহায়তা পাওয়ার অযোগ্য হয়ে পড়বেন এবং এর ফলেই ফোরক্লোজারের সংখ্যা বাড়তে পারে। হাউজিং ডেটা বিশ্লেষক জন কোমিস্কির মতে, আগামী ১২ থেকে ১৮ মাসে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ তাদের বাড়ি হারাতে পারেন, হয় ফোরক্লোজার, স্বেচ্ছায় বিক্রি বা শর্ট সেলের মাধ্যমে।বর্তমানে এফএইচএ ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে প্রায় ১১ দশমিক ৬ শতাংশ বকেয়া অবস্থায় রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ঋণ সাধারণত প্রথমবার বাড়ি কেনা ও নিম্ন আয়ের পরিবারের মধ্যে বেশি দেখা যায়, যা তাদের জন্য ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দেয়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, কিছু অঞ্চলে বাড়ির দাম এখনও বাড়ছে, ফলে কিছু মালিক অ্যাক্সিডেন্টাল ইকুইটি ব্যবহার করে বাড়ি বিক্রি করে ঋণ শোধ করতে পারছেন। তবে যেসব অঞ্চলে হাউজিং মার্কেট দুর্বল, সেখানে ফোরক্লোজারের কারণে বাড়ির দাম আরো কমে যেতে পারে এবং স্থানীয় বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ পরিস্থিতি শুধু ঋণগ্রহীতাদের জন্য নয়, আশপাশের বাড়ির বাজার এবং সামগ্রিক আবাসন ব্যবস্থার ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তারা সতর্ক করছেন, নীতিগত পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক চাপ একসঙ্গে কাজ করলে যুক্তরাষ্ট্রে আবাসন সংকট আরো গভীর হতে পারে।

শেয়ার করুন