অ্যাগ্রিকালচার সেক্রেটারি ব্রুক রোলিন্স সম্প্রতি সিনেট শুনানিতে বক্তব্য দেন
যুক্তরাষ্ট্রে নিম্নআয়ের মানুষের খাদ্য সহায়তার অন্যতম প্রধান কর্মসূচি সাপ্লিমেন্টাল নিউট্রিশন অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম (স্ন্যাপ) থেকে প্রায় ৪ দশমিক ৩ মিলিয়ন মানুষ বাদ পড়েছে। এ নিয়ে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, জালিয়াতি দমন এবং শক্তিশালী অর্থনীতির কারণে এই পতন ঘটেছে। তবে গবেষক ও নীতিবিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ বলছেন, বাস্তবে নতুন আইনগত পরিবর্তনই এই ব্যাপক হ্রাসের মূল কারণ। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে স্ন্যাপ সুবিধাভোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় বলে ইউ এস ডিপার্টমেন্ট অব অ্যাগ্রিকালচার-এর প্রাথমিক তথ্য থেকে জানা গেছে। এই সময়ে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৪২ দশমিক ৮৩ মিলিয়ন থেকে নেমে দাঁড়ায় প্রায় ৩৮ দশমিক ৫৫ মিলিয়নে, যা প্রায় ১০ শতাংশ হ্রাস নির্দেশ করে।
ডিপার্টমেন্ট অব অ্যাগ্রিকালচার সেক্রেটারি ব্রুক রোলিন্স সম্প্রতি সিনেটে শুনানিতে এক বক্তব্যে বলেন, আমরা ৪ দশমিক ৩ মিলিয়ন মানুষকে ফুড স্ট্যাম্প কর্মসূচি থেকে সরিয়ে এনেছি। এর অনেকটাই জালিয়াতি ছিল, অনেকেই অযোগ্য হয়েও সুবিধা নিচ্ছিলেন, আর একটি বড় কারণ হলো অর্থনীতির উন্নতি। মানুষ এখন আর এই সহায়তার ওপর নির্ভরশীল নয়। তিনি আরো দাবি করেন, মজুরি বৃদ্ধি এখন মূল্যস্ফীতির চেয়েও বেশি হারে বাড়ছে, যা ২০২১ সালের পর প্রথমবার ঘটেছে। প্রশাসনের এই বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, বিশেষজ্ঞরা এর সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন। তারা বলছেন, এই ব্যাখ্যা আংশিক এবং বাস্তব চিত্রকে পুরোপুরি প্রতিফলিত করে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্ন্যাপ থেকে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের বাদ পড়ার প্রধান কারণ হলো গত বছর কংগ্রেসে পাস হওয়া ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট (এইচআর-১) নামের একটি বিশাল কর ও ব্যয় হ্রাস আইন। এই আইনের মাধ্যমে স্ন্যাপ কর্মসূচিতে কঠোর নিয়ম আরোপ করা হয়েছে এবং অনেক মানুষের জন্য এই সুবিধা পাওয়া আগের তুলনায় অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস (সিবিও)-এর হিসাব অনুযায়ী, এই আইন আগামী ১০ বছরে স্ন্যাপ খাতে প্রায় ১৮৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় কমাবে, যা মোট ব্যয়ের প্রায় ২০ শতাংশ। ফলে স্বাভাবিকভাবেই অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কমে যাওয়ার একটি কাঠামোগত ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
রজার ফিগুয়েরোয়া, যিনি কর্নেল ইউনিভার্সিটি-এ খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে গবেষণা করেন, বলেন যে ডেটা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় স্ন্যাপ অংশগ্রহণ কমার মূল কারণ হলো কর্মসূচিতে প্রবেশের বাধা বৃদ্ধি। তার ভাষায়, আমরা যে প্রবণতা দেখছি, তাতে স্পষ্ট যে কর্মসূচিটি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হয়ে গেছে। একইভাবে কেটলিন ক্যাসপি, ইউনিভার্সিটি অব কানেকটিকাট-এর একজন গবেষক, বলেন যে জালিয়াতি কমে যাওয়ার কারণে এত বড় পতন হয়েছে বলে এমন কোনো শক্ত প্রমাণ নেই।
প্রকৃতপক্ষে স্ন্যাপ কর্মসূচিতে জালিয়াতির হার অত্যন্ত কম। ২০২৩ অর্থবছরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মোট ৪২ মিলিয়নেরও বেশি অংশগ্রহণকারীর মধ্যে মাত্র ৪১ হাজার ৪৭৬ জনকে জালিয়াতির কারণে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছিল, যা ১ শতাংশেরও কম। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে জালিয়াতি এত বড় পরিমাণে অংশগ্রহণ কমার প্রধান কারণ হতে পারে না। তবুও প্রশাসন জালিয়াতির বিষয়টি সামনে এনে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছে।
এ বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্রড-বেসড ক্যাটেগরিক্যাল এলিজিবিলিটি (বিবিসিই) নামের একটি নীতি, যা অনেক রাজ্যে স্ন্যাপ সুবিধা পাওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণে নমনীয়তা দেয়। এই নীতির আওতায়, কেউ যদি অন্য কোনো সরকারি সহায়তা কর্মসূচির জন্য যোগ্য হন, তবে তিনি স্ন্যাপ-এর জন্যও যোগ্য হতে পারেন। সমালোচকদের মতে, এই নীতির কারণে অনেক অযোগ্য ব্যক্তি সুবিধা পাচ্ছেন। তবে বর্তমানে এটি একটি বৈধ নীতি এবং বহু রাজ্যে এটি কার্যকর রয়েছে। প্রশাসন ভবিষ্যতে এটি বাতিল করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে, কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়িত হয়নি।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ২০২৫ সালে মোটামুটি শক্তিশালী ছিল। বছরের শুরুতে কিছুটা ধাক্কা থাকলেও পরে প্রবৃদ্ধি ফিরে আসে। ২০২৬ সালের শুরুতে অর্থনীতি প্রায় ২ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এই সামগ্রিক উন্নতি সমাজের সব স্তরে সমানভাবে প্রভাব ফেলেনি। খাদ্যের দাম ২০২৫ সালে ৩ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে এবং ২০২৬ সালে আরো ২ দশমিক ৯ শতাংশ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা নিম্নআয়ের মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
কেট বাওয়ার, ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান-এর একজন পুষ্টি বিশেষজ্ঞ, বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে দারিদ্র্য একটি স্থায়ী সমস্যা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য বিশাল। এমনকি অর্থনীতি ভালো থাকলেও অনেক মানুষ তাদের পরিবারকে দারিদ্র্য থেকে বের করতে পারেন না। তার মতে, শুধুমাত্র অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্ন্যাপ অংশগ্রহণ কমার যথেষ্ট ব্যাখ্যা নয়।
মজুরি ও মূল্যস্ফীতির বিষয়টিও এই বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে মজুরি বৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৪ শতাংশ, যেখানে মূল্যস্ফীতি ছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ মজুরি সামান্য বেশি হারে বেড়েছে। তবে এটি ২০২১ সালের পর প্রথমবার নয়, যেমনটি প্রশাসন দাবি করেছে। এছাড়া উচ্চ আয়ের মানুষরা এই প্রবৃদ্ধি থেকে বেশি উপকৃত হলেও নিম্নআয়ের পরিবারগুলো এখনো মূল্যবৃদ্ধি ও সীমিত আয়ের কারণে চাপে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা আরো উল্লেখ করেছেন যে স্ন্যাপ অংশগ্রহণ কমার সঙ্গে বেকারত্বের হারের কোনো সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া যাচ্ছে না। যদি অর্থনীতির উন্নতি এই পতনের প্রধান কারণ হতো, তবে বেকারত্বের হারেও একই ধরনের উল্লেখযোগ্য হ্রাস দেখা যেত। কিন্তু বাস্তবে তেমনটি ঘটেনি। বরং কিছু ক্ষেত্রে নিয়োগের গতি কমেছে এবং বেকারত্ব সামান্য বেড়েছে।
স্ন্যাপ কর্মসূচিতে পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় দিক হলো নতুন কাজের শর্ত আরোপ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট অনুযায়ী, এখন অনেক সুবিধাভোগীকে মাসে অন্তত ৮০ ঘণ্টা কাজ করতে হবে অথবা কোনো প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নিতে হবে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই কাজের জন্য পারিশ্রমিক পাওয়া বাধ্যতামূলক নয়। আগে যেসব মানুষ এই শর্ত থেকে অব্যাহতি পেতেন, তাদের অনেকেই এখন এই নিয়মের আওতায় পড়েছেন।
বিশেষ করে, আগে ৫৪ বছরের বেশি বয়সী যেসব কর্মক্ষম ব্যক্তি সন্তানের দায়িত্বে ছিলেন না, তারা এই কঠোর নিয়ম থেকে মুক্ত ছিলেন। এখন সেই বয়সসীমা বাড়িয়ে ৬৪ বছর করা হয়েছে। একই সঙ্গে, যেসব অভিভাবকের সন্তানের বয়স ১৮ বছরের নিচে ছিল, তারা আগে ছাড় পেতেন নতুন আইনে এখন সেই সীমা কমিয়ে ১৪ বছর করা হয়েছে। ফলে অনেক পরিবার নতুন করে এই কঠোর শর্তের মুখোমুখি হয়েছে।এছাড়া গৃহহীন মানুষ, সাবেক সেনাসদস্য (ভেটেরান) এবং ২৪ বছরের নিচের সাবেক ফস্টার কেয়ার তরুণদের মতো গোষ্ঠীগুলিও এখন আর আগের মতো ছাড় পাচ্ছেন না। এই পরিবর্তনগুলো সমাজের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর বড় প্রভাব ফেলছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো অভিবাসন নীতিতে। স্ন্যাপ সুবিধা মূলত মার্কিন নাগরিক ও কিছু বৈধ অভিবাসীর জন্য প্রযোজ্য হলেও নতুন আইনের ফলে শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের মতো কিছু গোষ্ঠী এখন আর এই সুবিধা পাচ্ছেন না।পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, স্ন্যাপ অংশগ্রহণের বড় পতনটি মূলত ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে ঘটেছে যখন থেকে নতুন আইন কার্যকর হয়। জানুয়ারি থেকে জুন ২০২৫ পর্যন্ত মাত্র প্রায় ৭.৪ লাখ মানুষ কমেছে, কিন্তু জুলাই ২০২৫ থেকে জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত প্রায় ৩ দশমিক ৪৭ মিলিয়ন মানুষ কর্মসূচি থেকে বাদ পড়েছে। এই প্রবণতা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে আইনগত পরিবর্তনই প্রধান ভূমিকা রেখেছে।
কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস আগেই পূর্বাভাস দিয়েছিল যে এই আইন স্ন্যাপ অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে। তাদের মতে, ২০২৫ থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২ দশমিক ৪ মিলিয়ন মানুষ এ কর্মসূচি থেকে বাদ পড়তে পারে।
সবশেষে বলা যায়, স্ন্যাপ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কমার বিষয়টি একটি জটিল বাস্তবতা। প্রশাসন যেখানে জালিয়াতি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরছে, সেখানে বিশেষজ্ঞরা বলছেন বর্তমানে কঠোর নীতি, নতুন আইন এবং যোগ্যতার শর্তই এই পরিবর্তনের মূল চালিকা শক্তি। অর্থনীতি উন্নত হলেও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা এখনো যুক্তরাষ্ট্রে একটি বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে, এবং এই প্রেক্ষাপটে স্ন্যাপ-এর মতো কর্মসূচির গুরুত্ব নিয়ে বিতর্ক আরো বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।