২৯ এপ্রিল ২০২৬, বুধবার, ০৪:০৮:৩০ অপরাহ্ন


জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় কী পুরোনো পথেই সরকার
সালেক সুফী
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৯-০৪-২০২৬
জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় কী পুরোনো পথেই সরকার


জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় আগের সরকারগুলোর মতো বর্তমান সরকারও কী আমলা নির্ভরতার ভুল পথে হাঁটছে-এ প্রশ্ন এখন বিশ্লেষকদের। বিএনপি জোট সরকার ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এবার সরকার পরিচালনার দায়িত্বে এসেই ভঙ্গুর অর্থনীতি আর সংকট পথে থাকা জ্বালানি বিদ্যুৎ পরিস্থিতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিল। এর সঙ্গে কয়দিন পরেই ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল আক্রমণ করলে যুদ্ধ বেঁধে গেল। যুদ্ধ প্রতিক্রিয়ায় আরব বিশ্ব এবং পারস্য উপসাগরের দেশজুলোর জ্বালানি স্থাপনাসমূহ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সমগ্র বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও সংক্রমিত হলো ভয়াবহ জ্বালানি সংকট। 

পূর্ববর্তী সরকারগুলোর ভুল পরিকল্পনায় বাংলাদেশ নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদ মাটির নিচে রেখে ক্রমাগত আমদানিকৃত জ্বালানি আর বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে জ্বালানি নিরাপত্তাকে নাজুক করে ফেলেছিল। এ জ্বালানির সিংহভাগ আস্ত আরব এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে। সরকার আমলাদের পরামর্শে তড়িগড়ি করে সংকটের শুরুতেই জ্বালানি রেশনিং করে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছিল। এই সঙ্গে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল অশুভ সিন্ডিকেটগুলোর জ্বালানি মজুত আর কালোবাজারি। 

পরিণতি যুদ্ধের প্রায় দুই মাস পেরিয়ে যাওয়া এবং বিকল্প সূত্র থেকে পর্যাপ্ত জ্বালানি জোগাড় করার পরও আনাড়ি জ্বালানি সরবরাহ চেইন ব্যবস্থপনার কারণে সংকট এখন মহামারি রূপ নিয়েছে। এদিকে গ্রীষ্ম মৌসুম শুরু হওয়ায় বিদ্যুৎ চাহিদা বেড়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। সবাই জানে গ্রিড সংযুক্ত উৎপাদন ক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি থাকলেও বাংলাদেশ জ্বালানি সংকট আর বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কের কারিগরি সীমাবদ্ধতায় এমনিতেই ১৫৫০০-১৬০০০ মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করতে পারেনি। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ জ্বালানি সংকট তীব্রতর এখন সে সক্ষমতা ১৪০০০-১৪৫০০ মেগাওয়াটে সীমিত করেছে। ২৫০০০-৩০০০০ মেগাওয়াট ঘাটতি দেশজুড়ে বিদ্যুৎ লোডশেডিং শুরু করেছে। এলোমেলো হয়ে যাওয়ার উপক্রম জ্বালানি ব্যবস্থাপনা। সরকারি সংস্থাগুলোর কাছে জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থাগুলোর বিপুল বকেয়া থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার একটি বিরাট অংশ এবারের গ্রীষ্মের সর্বোচ্চ চাহিদার সময় অব্যবহৃত থাকার শংকা দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যেই দেশজুড়ে ৭-৮ ঘণ্টা বিদ্যুতের লোডশেডিং জনজীবন বিপন্ন করে তুলেছে। 

সরকার হয়তো আমলাদের পরামর্শে সংকটের শুরুতে সংসদে এবং বাইরে সংকট স্বীকার করেনি। বারবার বলেছে, দেশে জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুত আছে। কিন্তু সরকারি সংস্থাগুলো জ্বালানি সরবরাহ চেইন ব্যবস্থাপনায় নিদারুণভাবে ব্যর্থ হওয়ায় জ্বালানি ডিপোসমূহ থেকে পাম্পসমূহে চাহিদা মতো জ্বালানি সরবরাহ হয়নি। ঢাকাসহ সারা দেশে অনেক পেট্রোল পাম্প বন্ধ রয়েছে। বাকি পাম্পগুলোতে জ্বালানি ব্যাবহারকারীদের দীর্ঘ লাইন গ্রাহকদের হতাশা সৃষ্টি করেই চলেছে। শুধু যানবাহন না, কৃষকরা সেচের জন্য ডিজেল, বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না, জেলেরা ট্রলার নিয়ে মাছ শিকারে সাগরে যেতে পারেননি। সারা দেশে পণ্য পরিবহনে খরচ বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে। গ্যাসের অভাবে একটি বাদে বাকি সব সারকারখানা বন্ধ থাকায় সার সংকট সৃষ্টির আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। 

এমনি যখন অবস্থা তখন সরকার এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে পাশ কাটিয়ে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি করেছে। প্রতিক্রিয়ায় চক্রাকারে সংযুক্ত সব কিছুর মূল্যবৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতি হবে সন্দেহ নেই। 

দেশজুড়ে যখন হাহাকার, পার্লামেন্ট তখন কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বাহাসে ব্যস্ত থাকার পর অবশেষে সরকারি দল এবং বিরোধী দলের সাংসদদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করেছে জ্বালানি বিদ্যুৎ সংকটের বিষয় আলোচনা, বিশ্লেষণ করে জরুরি ভিত্তিতে করণীয় নির্ধারণের জন্য। বর্তমান পরিস্থিতিতে সব পর্যায়ে কৃচ্ছ্রতা, জ্বালানি বিদ্যুতের দক্ষ ব্যবহার আর সরবরাহ চেইন নিবিড় তদারকি ছাড়া বিকল্প নেই। একই সঙ্গে নিজেদের জ্বালানি অনুসন্ধান উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সাজানো জ্বালানি প্রশাসন বহাল রেখে পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানো যাবে না. সরকারকে বিষয় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ শুনে পেশাদারি নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে। 

সরকার কিন্তু আগের সরকারগুলোর ব্যর্থতা এবং বৈষয়িক সংকটকে দীর্ঘদিন অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না, জনগণ চায় স্বস্তি। 

শেয়ার করুন