ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকার নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাত্র কয়েকদিন আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশের স্বার্থবিরোধী একপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তি সম্পাদন করেছে।
শুরুতেই বলবো একটি অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকার কোনোভাবেই দেশের স্বার্থ বিরোধী অর্থনীতি বিনাশী সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সংঘর্ষিক বাণিজ্যচুক্তি সম্পাদনের অধিকার রাখে না। নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারে আসা বিএনপি জোট সরকারের উচিত এখন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চুক্তি সংসদে আলোচনা করে বাতিল করা। চুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক ডক্টর আনু মোহাম্মদ ঢাকা কেন্দ্রীয় জাদুঘরের সামনে একটি প্রতিবাদ সভায় চুক্তি বাতিল এবং চুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত সবার বিচার দাবি করেছেন। দেশের অন্যতম বুদ্ধিজীবী সিপিডি ফেলো ডক্টর দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত বাণিজ্যচুক্তি বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর হরমুজ প্রণালি বন্ধের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করবে।
চুক্তি স্বাক্ষর করে ড. ইউনূস ঘোষণা করেছিলেন, “বাণিজ্যচুক্তিটি বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক বিজয়”। জানা গেছে চুক্তি স্বাক্ষর করার আগে ইউনূস সরকার বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর মৌখিক সম্মতি নিয়েছিল। বিএনপি জোট সরকার চুক্তি সম্পাদনের অন্যতম প্রধান চরিত্র বিতর্কিত ড. খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে রেখেছে। ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একতরফা বাণিজ্যচুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশকে মার্কিন পণ্যের অবাধ বাজারে পরিণত করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, বিকিয়ে দেওয়া হয়েছে দেশের সার্বভৌমত্ব। দেশের সবাইকে অন্ধকারে রেখে করা এই চুক্তি এখন বাংলাদেশের জন্য গলার ফাঁস। অনেকের মতে চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক উপনিবেশ বানানো হয়েছে। স্বাক্ষরিত বাণিজ্যচুক্তি বাংলাদেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং লাখ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারাবে।’
চুক্তির পটভূমি
বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনের কয়েক দিন আগে গত ৯ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকার ও ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে বাণিজ্যচুক্তি সই হয়। সে সময় ‘নন-ডিসক্লোজার’ অ্যাগ্রিমেন্টের দোহাই দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার দাবি করে, চুক্তির কোনো শর্তই প্রকাশ করা যাবে না। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কহার ১ শতাংশ কমিয়ে ১৯ শতাংশ করার আড়ালে রয়েছে ভয়ংকর শুভংকরের ফাঁকি। বিশেষ করে বাণিজ্য, জ্বালানি ও নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল খাতে বাংলাদেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ যদি অন্য কোনো দেশের সঙ্গে ডিজিটাল বাণিজ্যচুক্তি করে এবং তাতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হলে ওয়াশিংটন বাণিজ্যচুক্তি বাতিল করতে পারবে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশি পণ্যে আবারও ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র যেসব দেশকে ‘নন-মার্কেট কান্ট্রি’ বা বাজার অর্থনীতির দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না তাদের সঙ্গেও বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য বা অগ্রাধিকারমূলক চুক্তি করতে পারবে না। বাণিজ্যচুক্তিতে এমন একটি ধারা রয়েছে, যার ফলে বাংলাদেশ ‘যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্নকারী’ কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি, জ্বালানি রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনতে পারবে না।
চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ৬ হাজার ৭১০টি পণ্যে শুল্কছাড় দিয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ পেয়েছে ১ হাজার ৬৩৮ পণ্যে পাল্টা শুল্কছাড়। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি কার্যকর হওয়ার দিন থেকেই ৪ হাজার ৫০০টি পণ্য বাংলাদেশে রফতানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে গবাদি পশু, মাংস, মাছ, রাসায়নিক দ্রব্য, বস্ত্র, যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন ধরনের শিল্পপণ্য।
১ হাজার ৫৩৯টি পণ্যের শুল্ক চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্ধেক কমে যাবে। বাকি অর্ধেক পরবর্তী চার বছর ধরে সমানভাবে কমবে। পঞ্চম বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এসব পণ্য পুরোপুরি শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এর বাইরে ৬৭২টি মার্কিন পণ্যের ক্ষেত্রে শুরুতে শুল্ক অর্ধেক কমবে। বাকি অর্ধেক পরের ৯ বছরে সমান ধাপে কমিয়ে দশম বছরের ১ জানুয়ারি থেকে সম্পূর্ণ শূণ্য শুল্ক সুবিধা পাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিপুল শুল্কছাড় বাংলাদেশের কৃষি ও শিল্পপণ্যের জন্য ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনতে পারে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বাণিজ্য পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, শুল্কছাড় সুবিধার বেশির ভাগই গেছে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে। ২০২৫ সালের আমদানি তথ্য অনুযায়ী, যে ৬ হাজার ৭১০টি মার্কিন পণ্যে বাংলাদেশ শুল্কছাড় দিতে রাজি হয়েছে, তার মধ্যে অন্তত ২ হাজার ১৬টি ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ আমদানি করছে। এসব পণ্যের মোট আমদানিমূল্য প্রায় ৬৫ কোটি ডলার। চুক্তি অনুযায়ী এসব পণ্যে ধাপে ধাপে শুল্ক কমানো বা প্রত্যাহার করা হলে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হতে পারে প্রায় ৪১৯ কোটি টাকা।
অসম বাণিজ্যচুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সরাসরি বিনিয়োগের সুযোগও খোলা রাখা হয়েছে। এ বিনিয়োগের মাধ্যমে তারা খনিজসম্পদ অনুসন্ধান, খনন, উত্তোলন, পরিশোধন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, বিতরণ ও রফতানি করতে পারবে।
পাশাপাশি বাংলাদেশকে প্রাথমিকভাবে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনতে হবে। এছাড়া আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু দেশের কাছ থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার ওপরেও সীমা আরোপ করা হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশের শিল্পখাত, ওষুধ শিল্প, গবাদি পশু, মৎস্য খাত। বাংলাদেশ চীন, রাশিয়া বা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য করতে পারবে না। বহুমূল্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিনতে হবে কৃষি পণ্য, জ্বালানি, যন্ত্রপাতি।
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। ৩০ লাখ শহিদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এ দেশের বৈদেশিক নীতি, বাণিজ্য নীতি কোনো বিদেশী শক্তির নিয়ন্ত্রণে নেয়ার কোন চুক্তি করার অধিকার এমনকি কোনো নির্বাচিত সরকারও নিতে পারে না। নিঃসন্দেহে ইউনূস সরকার দেশের মানুষের সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করছে। যে কোনো আত্মমর্যাদাশীল নাগরিকের জন্য চুক্তিটি মেনে নেয়া অপমানজনক।
আশা করি, জনতার সরকার বলে দাবিদার বিএনপি অবিলম্বে চুক্তিটি সংসদের মাধ্যমে জাতির সামনে তুলে ধরবে। বিস্তারিত বিচার বিশ্লেষণের মাধ্যমে স্বার্থবিরোধী চুক্তিটি বাতিল করবে।