নিউ জার্সির আইস আটক কেন্দ্র ডেলানি হল
যুক্তরাষ্ট্রের বহু অভিবাসন আটক কেন্দ্র এক বছরেরও বেশি সময় ধরে সরকারি পরিদর্শনের বাইরে রয়েছে বলে মানবাধিকার সংস্থার নতুন এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অভিবাসন আটক ব্যবস্থার ওপর নজরদারি কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে মানবাধিকার কর্মী, চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫০০ বা তার বেশি অভিবাসী আটক রাখা হয় এমন ৪৫টি বড় আটক কেন্দ্রের মধ্যে ১৫টিতে গত ১২ মাসের বেশি সময় ধরে কোনো পরিদর্শন হয়নি। এর মধ্যে পাঁচটি কেন্দ্রে এখন পর্যন্ত কোনো পরিদর্শনের রেকর্ড পাওয়া যায়নি।
এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস)-এর পরিবর্তিত পরিদর্শন নীতির কারণে। আগে আইসিইর বেশিরভাগ আটক কেন্দ্র বছরে দুইবার পরিদর্শনের আওতায় থাকলেও নতুন নীতিতে অনেক কেন্দ্রে বছরে একবার এবং কিছু কেন্দ্রে দুই বছরে একবার পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অভিবাসন আটক ব্যবস্থার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিদর্শনের সময় কমিয়ে দেওয়া হলে আটক কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসা, খাবার, নিরাপত্তা ও মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি হলে তা দ্রুত শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়বে।
ইউসিএলএ মেডিকেল স্কুলের সহকারী অধ্যাপক ড. অ্যানেট ডেকার, যিনি অভিবাসন আটক ব্যক্তিদের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে গবেষণা করেছেন, বলেন, অনেক আটক কেন্দ্রেই বিভিন্ন ধরনের সমস্যা পাওয়া যায় এবং সেগুলো সমাধান হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন। তার মতে, পরিদর্শনের ব্যবধান বাড়ানো হলে বন্দিদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের সুযোগ কমে যায়।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন অভিযান শুরু হওয়ার পর দেশটির আটক ব্যবস্থার ওপর চাপ আরো বেড়েছে। অভিবাসীদের গ্রেফতার ও আটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আটক কেন্দ্রগুলোর পরিবেশ নিয়ে অভিযোগও বাড়ছে। গত বছর আইস হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা ২০২০ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। নিউ জার্সির ডেলানি হল আটক কেন্দ্রে নিম্নমানের খাবার, চিকিৎসার অভাব এবং অন্যান্য সমস্যার অভিযোগে বন্দিরা অনশন শুরু করেন। এছাড়া টেক্সাসের এল পাসোর ক্যাম্প ইস্ট মন্টানা আটক কেন্দ্রে সরকারি পর্যালোচনায় নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত গুরুতর সমস্যা পাওয়া যায়।
আইসিইর নিজস্ব পরিদর্শন তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৯ সাল থেকে পরিচালিত প্রায় ৯০ শতাংশ পরিদর্শনেই কোনো না কোনো ত্রুটি বা ডিফিসিয়েন্সি ধরা পড়েছে। এসব সমস্যার মধ্যে ছিল আত্মহত্যা প্রতিরোধে যথেষ্ট নজরদারির অভাব, খাবার সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ না করা, দুর্ঘটনার রিপোর্ট সঠিকভাবে না রাখা এবং চিকিৎসা ব্যবস্থায় ঘাটতি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত পরিদর্শন না হলে এসব সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলতে পারে।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের একজন মুখপাত্র আইসের নতুন নীতির পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, পরিদর্শনের সময়সূচি আটক কেন্দ্রের ধরন, ধারণক্ষমতা ও কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, আইসিইর একটি বহুস্তরীয় নজরদারি ব্যবস্থা রয়েছে এবং চুক্তিবদ্ধ কেন্দ্রগুলোকে নির্ধারিত মান বজায় রাখতে বাধ্য করা হয়।
তবে সমালোচকরা বলছেন, এ পরিবর্তন আগের সংস্কারমূলক পদক্ষেপ থেকে পিছিয়ে যাওয়ার সমান। ২০১৮ সালে হোমল্যান্ড সিকিউরিটির এক পর্যালোচনায় বলা হয়েছিল, আইসিইর পরিদর্শন ব্যবস্থা যথেষ্ট কার্যকর নয় এবং কেন্দ্রগুলোতে পাওয়া সমস্যাগুলো সমাধান হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করা কঠিন। এরপর কংগ্রেসের অর্থায়নের মাধ্যমে ২০২১ সালের মধ্যে বছরে দুবার পরিদর্শনের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল।
বর্তমান নীতিতে আইসিই পরিচালিত বিশেষ আটক কেন্দ্রগুলো বছরে একবার পরিদর্শনের আওতায় থাকবে, আর স্থানীয় জেল বা কাউন্টি পরিচালিত অনেক কেন্দ্র দুই বছরে একবার পরিদর্শন পাবে। সমালোচকদের মতে, বড় আকারের কিছু নন-ডেডিকেটেড কেন্দ্রেও শত শত অভিবাসী আটক থাকলেও তারা কম ঘন ঘন পরিদর্শনের মুখোমুখি হবে।
জর্জিয়ার স্টুয়ার্ট ডিটেনশন সেন্টারের উদাহরণ দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ২ হাজার অভিবাসী ধারণক্ষমতার এই কেন্দ্রে ২০২৫ সালের পরিদর্শনে ১২টি ত্রুটি পাওয়া যায়। এর মধ্যে আত্মহত্যা প্রতিরোধ সংক্রান্ত দুটি গুরুতর সমস্যা ছিল। এরপর ওই কেন্দ্রে দুজন আটক ব্যক্তি আত্মহত্যা করেন।