১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বুধবার, ০৪:৪৩:২০ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
বৈদ্যুতিক ট্রেনের যুগে যাচ্ছে বাংলাদেশ জিয়া পরিবারের তিন প্রজন্মের জাতিসংঘ অধ্যায় আসুন এবার রাষ্ট্রকে আমরা পুনর্গঠন করি - প্রধানমন্ত্রী ‘মাননীয়’ শব্দ ব্যবহার না করার সূচনা নিজেই শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান টেক্সাসে বিতর্কিত নতুন পাঠ্যক্রম অনুমোদনে মুসলিমদের ক্ষোভ ঘুষ নিয়ে নাগরিকত্ব, সাবেক ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা লুকম্যান ও ওলাবি গ্রেফতার জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে তারেক-ট্রাম্পের বৈঠকের সম্ভাবনা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিলেন ড. খলিলুর রহমান সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও স্ত্রীর সম্পদের বিষয়ে এফবিআইয়ের প্রতিবেদন দুদকে তারেকের কূটনৈতিক চালে ধরাশায়ী হাসিনা


ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ-২২
সাগ্রাদা ফামিলিয়া ব‍্যাসিলিকা
হাবিব রহমান
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৬-০৮-২০২৬
সাগ্রাদা ফামিলিয়া ব‍্যাসিলিকা বামের ছবি- সাগ্রাদা ফ‍্যামিলিয়া ব‍্যাসিলিকার অভ‍্যন্তরের দৃশ‍্য, ডানের ছবি- সাগ্রাদা ফ‍্যামিলিয়া ব‍্যাসিলিকা


স্পেনের রাজধানী বার্সেলোনার এল একজাম্পল এলাকায় যখন ট্যাক্সি থেকে নামলাম, দুপুরের তপ্ত রোদ তখন কাতালুনিয়ার আকাশকে আরো নীল করে তুলেছে। সামনে তাকাতেই থমকে যেতে হলো। কোনো স্থাপত্য নয়, যেন মাটি থেকে আকাশের দিকে ডানা মেলতে চাইছে এক অতিকায় পাথরের বন। আন্তোনি গাউদির অমর সৃষ্টি- সাগ্রাদা ফামিলিয়া।

বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত স্থাপত্যকর্ম হিসেবে বার্সেলোনার সাগ্রাদা ফামিলিয়া ব্যাসিলিকাকে সর্বদাই শিল্প, ধর্ম এবং সৃজনশীলতার এক অনন্য প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রতিভাবান স্থপতি আন্তোনি গাউদির নকশা করা এই ভবনটি কেবল একটি সাধারণ গির্জা নয় বরং এটি এক প্রাণবন্ত শিল্পকর্ম, যা ধর্মীয় চেতনা এবং চিরন্তন সৃজনশীলতার সুসমন্বয় করে। প্রতি বছর, সারা বিশ্ব থেকে লক্ষ লক্ষ দর্শনার্থী এই অনন্য স্থাপত্যকর্মটি স্বচক্ষে দেখতে এবং গাউদির পবিত্র স্থান ও সীমাহীন সৃজনশীলতার অভিজ্ঞতা লাভ করতে বার্সেলোনায় ভিড় জমান।

যেমন আমিও এসেছি নিউইয়র্ক থেকে। প্রবেশপথের বিশাল তোরণের নিচে দাঁড়িয়ে যখন আমি ঘাড় উঁচু করে চার্চের গথিক আর মডার্নিস্ট কারুকার্য দেখছি, ঠিক তখনই এক নরম কণ্ঠের ডাক-তুমি কি আমার আজকের মুসাফির? পেছনে ফিরে তাকালাম। নীল চোখের এক তরুণী, পরনে হালকা রেশমের স্কার্ফ। সে মৃদু হেসে হাত বাড়িয়ে দিলো-আমি এলেনা। আজ এই পাথরের মহাকাব্যের প্রতিটি পাতা আমি তোমাকে পড়ে শোনাবো।

আমি হেসে ফেললাম।

এলেনা আমাকে নিয়ে গেল ‘ন্যাটিভিটি ফ্যাসাড’-এর দিকে। যিশুর জন্মের আনন্দ যেন পাথর খোদাই করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এলেনা প্রতিটি মূর্তির কারুকার্য বুঝিয়ে বলছিল। মাঝপথে সে একবার থামলো, আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো-জানো, গাউদি বিশ্বাস করতেন কোনো কিছুই সোজা লাইনে হয় না। প্রকৃতিতে বক্ররেখাই সব। আমাদের জীবনটাও বোধহয় তেমনই।

আমি হেসে বললাম, তার মানে আমাদের এই দেখা হওয়াটাও কি কোনো বক্ররেখার টানে? এলেনা একটু লাজুক হাসলো। ওর গালে রোদের একটা আভা এসে পড়েছে। বললেন, হয়তো। এ গির্জা দেড়শ বছর ধরে তৈরি হচ্ছে, অথচ আজও অসম্পূর্ণ। ঠিক যেন কোনো অসমাপ্ত প্রেমের গল্পের মতো, যার শেষটা জানার চেয়ে অপেক্ষাই বেশি সুন্দর।

বাইরের প্রখর রোদ পেরিয়ে যখন আমরা ভেতরে ঢ়ুকলাম, মনে হলো এক জাদুকরী অরণ্যে পা রেখেছি। চারদিকের বিশাল স্তম্ভগুলো যেন একেকটি প্রাচীন গাছ, যার ডালপালা ছাদের কার্নিশে গিয়ে মিশেছে। দুপাশের স্টেইনড গ্লাস দিয়ে যে আলো আসছিল তার রঙে এলেনার মুখটা মুহূর্তের জন্য লাল, আবার পরক্ষণেই গাঢ় নীল হয়ে যাচ্ছিলো।

এলেনা বললো, সূর্যাস্তের সময় এই দিকটা কমলা হয়ে যায়। মনে হয় গির্জাটা দাউদাউ করে জ্বলছে। সেই আগুনটা কিন্তু পোড়ায় না, কেবল মুগ্ধ করে। আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম-সেই আগুনের তাপ কি সব পর্যটক অনুভব করতে পারে? নাকি বিশেষ কেউ?

এলেনা একটু থমকালো। ওর চোখের মণি দুটো যেন সাগ্রাদা ফামিলিয়ার কাচের মতোই রহস্যময়। বললো, বিশেষ কেউ তো অবশ্যই। যারা পাথরকে শুধু পাথর মনে করে না, যারা এর ভেতরটাও দেখতে পায়।

এরপর আমরা এলাম ’প্যাশন ফ্যাসাড’-এর দিকে। ন্যাটিভিটির তুলনায় এটি অনেক বেশি রুক্ষ, যিশুর যন্ত্রণার প্রতীক। এলেনার কণ্ঠস্বর এবার একটু ভারী। বললো-এখানে কোনো সাজসজ্জা নেই। শুধু খাঁ খাঁ করা শূন্যতা আর ত্যাগ।

আমার বিদায়ের সময় হয়ে এলো, বার্সেলোনার পড়ন্ত বিকেলের হাওয়া তখন এলেনার চুলে বিলি কাটছে। আমি পকেট থেকে নোটবুকটা বের করে কিছু লিখছিলাম। ও কৌতূহলী হয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ইতিহাস লিখছো, নাকি নিজের কোনো গল্প? ‘ইতিহাস তো বইয়েই আছে এলেনা-আমি বললাম, আমি তো লিখছি সেই গাইডের কথা, যার বর্ণনায় আজ এই পাথরগুলো প্রাণ পেলো।”

এলেনা এবার হেসে ফেললো। সেই হাসিতে বার্সেলোনার বিকেলের চেয়েও বেশি মাধুর্য ছিল। বিদায় নেওয়ার আগে সে হাত বাড়িয়ে দিলো। করমর্দনের মুহূর্তটা একটু বেশিক্ষণ থাকলো। সে নিচু স্বরে বললো-আবার এসো। সাগ্রাদা ফামিলিয়ার কাজ শেষ হতে হয়তো আরো অনেক বছর লাগবে, কিন্তু এই নীল আকাশ আর আমার গল্প বলা কিন্তু ফুরোবে না। ফিরে আসার সময় একবার পেছনে ফিরে তাকালাম। গোধূলির আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা সেই বিশালাকার গির্জার চূড়াগুলো তখন সত্যি মনে হচ্ছিলো যেন মহাকাশছোঁয়া এক স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নের মাঝে মিশে থাকলো এলেনার ওই রহস্যময় চোখের এক চিলতে রোদ।

শেয়ার করুন