ইগুয়াসু ন্যাশনাল পার্কের ছবি
আর্জেন্টিনার ইগুয়াসু ন্যাশনাল পার্ক (Iguazu National Park) প্রকৃতির এক অবারিত বিস্ময়। বিশাল জলপ্রপাত, গহীন অরণ্য আর বিচিত্র বন্যপ্রাণীর মিশেলে এই ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটটি পর্যটকদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়। আমি আজ যাচ্ছি সেই পার্কটি পরিদর্শনে।
ভোরবেলায় যখন ইগুয়াসু ন্যাশনাল পার্কে পা রাখলাম, চারপাশটা তখন কুয়াশায় মোড়া। বাতাসের আর্দ্রতায় এক ধরণের সতেজ ঘ্রাণ। আমার সঙ্গে গাইড হিসেবে আছেন ‘রিকার্ডো’, যিনি এই রেইনফরেস্টের প্রতিটি বাঁক আর গাছের ভাষা চেনেন। তার হাসিমুখ আর অভিজ্ঞ কণ্ঠ ভ্রমণের শুরুতেই এক ধরনের স্বস্তি এনে দিলো।
রিকার্ডো প্রথমে ঢুকলেন ‘আপার সার্কিট’-এ। হাঁটার পথটি সুনিপুণভাবে তৈরি করা হয়েছে বনের মাঝখান দিয়ে। তিনি হঠাৎই হাত তুলে থামতে বললেন। গাছের মগডালে দেখা মিললো অদ্ভুত ঠোঁটের ‘টুকান’ পাখির। তিনি নিচু স্বরে বুঝিয়ে বললেন, ‘এ অরণ্যে প্রায় ২ হাজার প্রজাতির গাছ আর শত শত প্রজাতির পাখি আছে। একটু এগোতেই দেখা হলো ‘কোয়াটিদের’ (Coati) সঙ্গে। এরা অনেকটা বড়সড় কাঠবিড়ালীর মতো দেখতে, পর্যটকদের পায়ের কাছে নির্ভয়ে ঘুরছে।
হঠাৎ রিকার্ডো বললো, ‘শুনছেন? ওই যে শব্দ-ওটাই ইগুয়াজুর ডাক।’ প্রথমে মনে হচ্ছিলো দূরের বজ্রধ্বনি। কিন্তু যত এগোচ্ছি, শব্দটা ততই গভীর, ততই শক্তিশালী মনে হচ্ছিল। রিকার্ডো আমাদের নিয়ে গেলেন সেই বিখ্যাত পয়েন্টে, যেখান থেকে দেখা যায় সারিবদ্ধ জলপ্রপাত। ২৭৫টি ছোট-বড় ঝরনা একসঙ্গে পাহাড় থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে নিচের উপত্যকায়। প্রতিটি জলপ্রপাতের নিজস্ব ছন্দ আছে। রিকার্ডো আমাদের মনে করিয়ে দিলেন, ‘ইগুয়াসু’ শব্দটির অর্থ স্থানীয় ভাষায় ‘বিশাল জল’। আজ আপনি সেই নামের সার্থকতা নিজের চোখেই দেখতে পাবেন।
সাদা ফেনার মেঘ উঠে আসছে নিচ থেকে, সূর্যের আলোয় তৈরি হচ্ছে রঙধনু। প্রকৃতি যেন নিজের সবচেয়ে নাটকীয় রূপটা এখানে তুলে ধরেছে। ভ্রমণের মূল আকর্ষণ ছিল ‘ডেভিলস থ্রোট’ বা শয়তানের কণ্ঠনালি। একটি ছোট ট্রেনে করে আমরা সে পয়েন্টে পৌঁছলাম। এরপর কয়েকশ মিটার দীর্ঘ স্টিলের ব্রিজের ওপর দিয়ে হাঁটা। নিচে উত্তাল জলরাশি, আর সামনে এক অসীম ধোঁয়াশা। জলপ্রপাতের ঠিক মাথার ওপর আহ্বায়কয়ে যখন নিচে তাকালাম, মনে হলো পৃথিবীটা এখানেই শেষ হয়ে গেছে। বিশাল এক ইউ-শেপ (U-shape) খাঁজ দিয়ে লাখ লাখ গ্যালন জল তীব্র বেগে নিচে আছড়ে পড়ছে। বাতাসের ঝাপটায় জলকণাগুলো আমাদের ভিজিয়ে দিচ্ছিল, কিন্তু সেই রোমাঞ্চের কাছে বৃষ্টিও হার মানে। রিকার্ডো পাশ থেকে চিৎকার করে বললেন, এখানে কথা বলা বৃথা, শুধু প্রকৃতির এই প্রলয়ংকরী রূপ দেখুন আর অনুভব করুন। সত্যিই, সেই শব্দ আর দৃশ্যের সামনে আমরা সবাই তখন বাক্যহারা।
রিকার্ডো একটু থেমে বললো, এটাই ইগুয়াজুর হৃদয়। এখানে নদী হঠাৎ করে ৮০ মিটার নিচে পড়ে যায়। আমি সামনে তাকালাম, মনে হলো পৃথিবীটা যেনো হঠাৎ শেষ হয়ে গেছে! পানি এত শক্তিতে নিচে পড়ছে যে নিচে কিছুই দেখা যায় না-শুধু সাদা কুয়াশা আর গর্জন। শব্দ এতো জোরে যে কথা বলাও কঠিন। আমি চুপ করে অবাক হয়ে রইলাম। এ শক্তির সামনে মানুষ কত ছোট-তা খুব স্পষ্ট হয়ে উঠলো।
একটু দূরে বসে বিশ্রাম নিতে নিতে রিকার্ডো একটা গল্প শোনাল- “গুয়ারানি আদিবাসীদের একটি কিংবদন্তি আছে”। “এক দেবতা একটি মেয়েকে ভালোবাসতেন। কিন্তু সে পালিয়ে যায় তার প্রেমিকের সঙ্গে। রাগে দেবতা নদীকে ফাটিয়ে দেন-আর সৃষ্টি হয় এই জলপ্রপাত।” আমি হেসে বললাম, “তাহলে এটা এক রাগী প্রেমের গল্প? রিকার্ডো চোখ টিপে বলল-হয়তো.. অথবা প্রকৃতির নিজের নাটক।”
দুপুরের দিকে আমরা নৌকায় চড়লাম। রিকার্ডো আগে থেকেই সাবধান করে দিলো, ভিজতে প্রস্তুত থাকবেন! নৌকা এগোতেই বিশাল জলপ্রপাত আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর হঠাৎ-ঝাঁপ! পুরো শরীর ভিজে গেল ঠান্ডা পানিতে। আমি হেসে উঠলাম, এই অভিজ্ঞতা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। দিনের শেষে আমরা পার্কের ভেতরের এক ছোট ক্যাফেতে বসলাম। হাতে গরম কফি, সামনে সবুজ জঙ্গল। রিকার্ডো বললো, অনেকেই এখানে এসে শুধু ছবি তোলে। কিন্তু যারা একটু সময় নিয়ে থাকে-তারা ইগুয়াজুকে অনুভব করে। আমি মাথা নেড়ে সায় দিলাম।
ফিরতি পথে আমরা নিচের সার্কিট দিয়ে হাঁটলাম। সেখানে জলপ্রপাতের একদম নিচ থেকে ওপরে দেখার সুযোগ হলো। সূর্যের আলো জলকণায় লেগে তখন ডজনখানেক রংধনু তৈরি করেছে। রিকার্ডো গল্প শোনালেন এ বনের ইতিহাস আর সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে। তার মতে, ইগুয়াসু শুধু দেখার জায়গা নয়, এটা জীবনকে নতুন করে উপলব্ধি করার জায়গা।
আমরা পার্কের সীমানা ছাড়িয়ে বের হচ্ছি। পেছনে রয়ে গেল সেই অবিরত গর্জন আর সবুজের রাজত্ব। আমার কাছে মনে হচ্ছিল, প্রকৃতির শক্তির সামনে মানুষ কতটা ক্ষুদ্র, অথচ সেই ক্ষুদ্রতার মাঝেই কী অদ্ভুত শান্তি লুকিয়ে আছে! দূরে তখনো শোনা যাচ্ছিল জলপ্রপাতের গর্জন-মনে হচ্ছিল আমাদের যেন বিদায় জানাচ্ছে। আমি রিকার্ডোকে বললাম, এটা শুধু একটা ভ্রমণ নয়.. একটা বিশাল অভিজ্ঞতা।”
তিনি হেসে উত্তর দিলেন, ইগুয়াজু সবসময় মানুষকে এমনটাই দেয়। ফিরে আসার পথে মনে হচ্ছিল, আমি শুধু একটা জায়গা দেখে আসিনি। আমি প্রকৃতির এক মহাকাব্যের অংশ হয়ে গিয়েছিলাম।
ইগুয়াসু ভ্রমণের প্রয়োজনীয় টিপস : ইগুয়াসু ভ্রমণকে আরামদায়ক এবং নিরাপদ করতে এ বিষয়গুলো মাথায় রাখা জরুরি: সেরা সময়: সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর (বসন্ত) এবং মার্চ থেকে মে (শরৎ) হলো ভ্রমণের আদর্শ সময়। এ সময় আবহাওয়া খুব বেশি গরম থাকে না এবং জলপ্রপাতের পানির প্রবাহও চমৎকার থাকে।
পোশাক-আশাক : হালকা সুতির পোশাক এবং আরামদায়ক হাঁটার জুতো পরবেন। যেহেতু জলপ্রপাতের কাছে গেলে ভেজার সম্ভাবনা ১০০%, তাই সঙ্গে একটি রেইনকোট বা ওয়াটারপ্রুফ জ্যাকেট রাখা মাস্ট। ফোনের জন্য ওয়াটারপ্রুফ পাউচ নিতে ভুলবেন না।
কোয়াটি থেকে সাবধান : পার্কে প্রচুর কিউটি বা কোয়াটি দেখা যায়। এরা দেখতে খুব কিউট হলেও পর্যটকদের খাবার কেড়ে নিতে ওস্তাদ। এদের খাবার দেবেন না এবং ব্যাগ সাবধানে রাখবেন, কারণ এরা কামড়ে দিতে পারে।
আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল পাশ : ইগুয়াসুর পূর্ণ রূপ দেখতে আর্জেন্টিনা এবং ব্রাজিল-উভয় পাশ থেকেই দেখা উচিত। আর্জেন্টিনার পাশে আপনি জলপ্রপাতের খুব কাছে যেতে পারবেন, আর ব্রাজিলের পাশ থেকে পুরো দৃশ্যপটের একটি প্যানোরামিক ভিউ পাওয়া যায়।
সানস্ক্রিন ও পতঙ্গ নিরোধক : রেইনফরেস্ট এলাকা হওয়ায় প্রচুর মশা এবং কড়া রোদ থাকতে পারে। তাই ভালো মানের সানস্ক্রিন এবং ‘ইনসেক্ট রিপেলেন্ট’ সঙ্গে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।