লেক বৈকাল
শেরেমেতিয়েভো বিমানবন্দরে যখন ঢুকলাম, মস্কোর আকাশে তখনও ভোরের নীলচে আলো লেগে আছে। তার আগে ভোর ৫টায় রেড স্কয়ার ঘুরে এসেছি— জনশূন্য, ভেজা পাথরের চত্বর, সেন্ট বাসিলের পেঁয়াজ-গম্বুজগুলোর গায়ে সদ্য ওঠা রোদ। শহরটা তখনও ঘুম ভাঙায়নি, আর আমি ইতিমধ্যেই বিদায় নিচ্ছি।
বিমানে উঠে বুঝলাম, রাশিয়া দেশটা মানচিত্রে যতটা বড়, বাস্তবে তার চেয়েও অনেক বড়। মস্কো থেকে ইরকুতস্ক সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার উড়াল, অথচ ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে দিতে হবে পুরো পাঁচ ঘণ্টা। একই দেশ, অথচ যেন আরেকটা মহাদেশ। জানালার নিচে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুধু তাইগা-সবুজ-কালো পাইনের অন্তহীন সমুদ্র, মাঝে মাঝে রুপালি সুতোর মতো একেকটা নদী।
ইরকুতস্কে নামলাম যখন, স্থানীয় সময় রাত ১১টা। শরীর বলছে বিকেল, ঘড়ি বলছে রাত। ট্যাক্সিতে শহরে ঢোকার পথে ড্রাইভার আন্দ্রেই জিজ্ঞেস করলো বৈকাল দেখতে এসেছো? আমি হ্যাঁ, বলতেই সে হেসে বললো, সবাই বৈকাল দেখতে আসে। কিন্তু বৈকাল মানুষকে দেখে নেয় আগে। কথাটার মানে তখন বুঝিনি। সকালে হোটেলের জানালা খুলে দেখি আঙ্গারা নদী। চওড়া, শান্ত, আর অস্বাভাবিক রকমের স্বচ্ছ। কারণ এ জল বৈকাল থেকে আসছে। ইরকুতস্ককে বলা হয়, সাইবেরিয়ার প্যারিস। তবে আমার মনে হলো, নামটা একটু অন্যায্য। প্যারিসের সঙ্গে তুলনা করে শহরটার নিজের চরিত্রটাই ছোট করা হয়। এ শহরের আসল সৌন্দর্য কাঠে—ঊনবিংশ শতকের সাইবেরিয়ান কাঠের বাড়ি, জানালার চারপাশে লেসের মতো খোদাই করা নকশা, রঙচটে যাওয়া নীল আর সবুজ কাঠামো, বহু বাড়ি বছরের পর বছর মাটিতে বসে গিয়ে একটু কাত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সকালটা কাটালাম ১৩০ কোয়ার্তাল-এ পুরোনো কাঠের বাড়িগুলো সংস্কার করে বানানো একটা গোটা পাড়া, এখন ক্যাফে আর দোকানে ভরা। কফির দাম মস্কোর অর্ধেক, আর বারিস্তা মেয়েটি ইংরেজি না জেনেও ১০ মিনিট ধরে আমাকে বোঝালো কোনদিক দিয়ে গেলে গির্জাটা তাড়াতাড়ি পড়বে। দুপুরে গেলাম ভলকোনস্কি হাউস মিউজিয়ামে। এ বাড়িটার গল্প না জানলে ইরকুতস্ক অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ১৮২৫ সালের ডিসেম্বরে জারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ব্যর্থ হয়েছিলেন একদল অভিজাত তরুণ অফিসার-ইতিহাস তাদের চেনে ‘ডিসেমব্রিস্ট’ নামে। শাস্তি হিসেবে তাদের পাঠানো হয়েছিল সাইবেরিয়ায়, আজীবন নির্বাসনে। আর তাদের স্ত্রীরা রাজকীয় জীবন, উপাধি, সম্পত্তি সব ছেড়ে স্বেচ্ছায় স্বামীদের পিছু নিয়ে এসেছিলেন এ বরফের দেশে।
মারিয়া ভলকোনস্কায়ার পিয়ানোটা এখনো ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে আছে। গাইড মেয়েটি বললো, এ বাড়িতেই একসময় ইরকুতস্কের সবচেয়ে বড় সংগীতসন্ধ্যা বসতো। নির্বাসিতেরা শহরটাকে শাস্তি হিসেবে পেয়েছিলেন, আর শহরটাকে দিয়ে গিয়েছিলেন গান, স্কুল, বইয়ের দোকান, থিয়েটার। শাস্তি থেকে সভ্যতা-ইতিহাসের এমন উল্টো অঙ্ক খুব বেশি দেখা যায় না। সন্ধ্যায় আঙ্গারার পাড় ধরে হাঁটলাম অনেকক্ষণ। জুলাইয়ের সাইবেরিয়ায় রাত নামে দেরিতে; সাড়ে ১০টাতেও আকাশে কমলা আভা লেগে ছিল। ইরকুতস্ক থেকে লিস্তভিয়াঙ্কা মাত্র ৭০ কিলোমিটার। মার্শ্রুৎকা (ছোট মিনিবাস) এক ঘণ্টায় পৌঁছে দিলো। রাস্তার শেষ বাঁকটা ঘোরার পর গাছের ফাঁক দিয়ে প্রথম যে জিনিসটা চোখে পড়লো, সেটা প্রথমে বুঝতেই পারিনি জল না আকাশ। আন্দ্রেইর কথাটা তখন বুঝলাম।
বৈকালকে ‘হ্রদ’ বলাটা একরকম ভাষার দৈন্য। ওপারের পাহাড় দেখা যায় ঠিকই, কিন্তু জলটা যেভাবে দিগন্তের দুদিকে মিলিয়ে গেছে, তাতে মন মানতে চায় না যে এর চারপাশে ডাঙা আছে। আর রঙটা গভীর, ঠান্ডা, প্রায় কালচে নীল। স্থানীয়রা একে বলে ‘সাইবেরিয়ার নীল চোখ’। বুরিয়াতরা বলে ‘পবিত্র সমুদ্র’। সংখ্যাগুলো শুনলে মাথা ঘুরে যায়। বয়স প্রায় আড়াই কোটি বছর- পৃথিবীর প্রাচীনতম হ্রদ। গভীরতম বিন্দু ১ হাজার ৬৪২ মিটার। পৃথিবীর যত বরফমুক্ত মিষ্টিজল আছে, তার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এ একটি হ্রদে ধরা। ৩০০-এর বেশি নদী এসে মিশেছে এখানে, অথচ বেরিয়ে গেছে মাত্র একটি—সে আঙ্গারা, যাকে কাল সকালে হোটেলের জানালা দিয়ে দেখেছিলাম।
আর এখানেই একটা তারিখ মনে রাখার মতো: ১৯৯৬ সালের ৫ ডিসেম্বর মেক্সিকোর মেরিদা শহরে বসা ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির ২০তম অধিবেশনে বৈকাল হ্রদকে বিশ্ব প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ঘোষণা করা হয়। চারটি প্রাকৃতিক মানদণ্ডেরই—সৌন্দর্য, ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস, বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্র্য—সবটাতে উত্তীর্ণ হয়েছিল এ হ্রদ, যা খুব কম জায়গার ভাগ্যে জোটে। লিস্তভিয়াঙ্কায় প্রথমে গেলাম বৈকাল মিউজিয়ামে। এখানে অ্যাকোয়ারিয়ামে জ্যান্ত নেরপা- পৃথিবীর একমাত্র সম্পূর্ণ মিষ্টি জলের সিল, যারা সমুদ্র থেকে হাজার কিলোমিটার দূরে এ হ্রদে কীভাবে পৌঁছলো তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা আজও তর্ক করেন। গোলগাল, কালো চোখ, আর মানুষ দেখলে অদ্ভুত রকম কৌতূহলী।
তারপর চেয়ারলিফটে উঠলাম চেরস্কি স্টোন ভিউপয়েন্টে। ওপর থেকে দেখা যায় সে বিখ্যাত জায়গাটা, যেখানে আঙ্গারা বৈকাল ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, আর জলের মাঝখানে মাথা তুলে আছে শামান রক। বুরিয়াত কিংবদন্তি বলে, বৃদ্ধ বৈকালের এক অবাধ্য মেয়ে ছিল, আঙ্গারা। বাবার অমতে সে পালিয়ে যায় ইয়েনিসেই নদীর কাছে, আর ক্রুদ্ধ বাবা পিছন থেকে ছুড়ে মারেন এক বিশাল পাথর। সেই পাথরই আজও জেগে আছে নদীর মুখে।
দুপুরের খাওয়াটা ছিল বাজারের ধারে, খোলা আকাশের নিচে ধোঁয়ায় সেঁকা ওমুল। বৈকালের নিজস্ব মাছ, খবরের কাগজে মুড়ে হাতে ধরিয়ে দিল বিক্রেতা, সঙ্গে কালো রুটি। গরম, নোনতা, ধোঁয়ার গন্ধমাখা। এতো সাধারণ, অথচ ভ্রমণের সবচেয়ে স্পষ্ট স্মৃতিগুলোর একটা।
বিকেলে জলে পা ডোবালাম। জুলাই মাস, তবু ঠান্ডায় গোড়ালি পর্যন্ত অসাড় হয়ে গেল দশ সেকেন্ডে। পাশে দাঁড়ানো এক রুশ ভদ্রলোক হেসে বললেন, বৈকালের জলে হাত ধুলে নাকি এক বছর আয়ু বাড়ে; আর যে সাহস করে ডুব দেয়, তার পঁচিশ বছর। আমি এক বছরেই সন্তুষ্ট থাকলাম।
সন্ধ্যায় ফিরতি মার্শ্রুৎকায় জানালার ধারে বসে ভাবছিলাম, তিন দিন আসলে কিছুই নয়। বৈকালের গা ঘেঁষে চলা সেই পুরনো সার্কাম-বৈকাল রেলপথ ধরে যাওয়া হলো না, ওলখন দ্বীপে রাত কাটানো হলো না, শীতের বৈকাল—যখন গোটা হ্রদ কাচের মতো স্বচ্ছ বরফে জমে যায় আর তার নীচের ফাটল দেখা যায়, সে তো দেখাই হলো না। কিন্তু কিছু জায়গা এমন, যা আপনাকে অসম্পূর্ণতা নিয়ে ফিরিয়ে দেয় ইচ্ছে করেই। যাতে আপনি আবার ফিরে আসেন।
আবার ইরকুতস্ক বিমানবন্দর। ফিরে যাচ্ছি মস্কো। বিমানের জানালা দিয়ে নিচে তাকিয়ে দেখলাম, সাইবেরিয়ার বরফে ঢাকা পৃথিবী ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু লেক বৈকাল যেন ছোট হলো না। তার নীল গভীরতা রয়ে গেল মনের ভেতর। একসময় মস্কোর আকাশে বিমান ঢুকে গেল। কিন্তু আমার মন তখনও পড়ে রইলো বহু দূরে-সাইবেরিয়ার নীল বরফের দেশে, লেক বৈকালের তীরে।