২৭ অগাস্ট ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ৬:৬:৪১ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :


অভিবাসন আদালতে শিশুদের আইনজীবী পাওয়া কঠিন করছে ট্রাম্প প্রশাসন
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৬-০৮-২০২৬
অভিবাসন আদালতে শিশুদের আইনজীবী পাওয়া কঠিন করছে ট্রাম্প প্রশাসন আদালতে অভিভাবকহীন অভিবাসী শিশু


যুক্তরাষ্ট্রে অভিভাবকহীন অভিবাসী শিশুদের অভিবাসন আদালতে আইনগত সহায়তা পাওয়ার সুযোগ আরো সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের একের পর এক পদক্ষেপে এসব শিশুর পক্ষে কাজ করা ফেডারেল অর্থায়ননির্ভর আইনি সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ২০ হাজারের বেশি অভিভাবকহীন অভিবাসী শিশুর মামলা পরিচালনা ও আইনগত প্রতিনিধিত্ব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

গত ৩১ জুলাই অ্যাকাসিয়া সেন্টার ফর জাস্টিসের সঙ্গে অফিস অব রিফিউজি রিসেটেলমেন্ট বা ওআরআরের একটি বড় ফেডারেল চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। ওই চুক্তির আওতায় অ্যাকাসিয়া দেশজুড়ে প্রায় ১০০টি অলাভজনক আইনি সেবা প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক পরিচালনা করত। এসব প্রতিষ্ঠান ২০ হাজারের বেশি অভিভাবকহীন অভিবাসী শিশুকে অভিবাসন আদালতের জটিল প্রক্রিয়ায় আইনগত প্রতিনিধিত্ব ও সহায়তা দিত। চুক্তি শেষ হওয়া মূলত একটি দীর্ঘ আইনি ও প্রশাসনিক বিরোধের পরিণতি। ২০২৫ সালের মার্চে ওআরআর অ্যাকাসিয়ার চুক্তির সেই অংশ বাতিলের উদ্যোগ নেয়, যার মাধ্যমে অভিভাবকহীন শিশুদের সরাসরি আইনগত প্রতিনিধিত্ব দেওয়া হতো। সরকার অ্যাকাসিয়াকে কাজ বন্ধের নির্দেশ দিলে দেশজুড়ে শিশুদের প্রতিনিধিত্বকারী অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়।

এরপর একটি ফেডারেল জেলা আদালত সরকারকে কর্মসূচিটির অর্থায়ন অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেন। আদালতের যুক্তি ছিল, শিশুদের আইনজীবী পাওয়ার কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত না করেই সরকার অর্থায়ন বাতিল করেছিল। পরে প্রশাসন এসব প্রতিষ্ঠান যেসব শিশুর প্রতিনিধিত্ব করছে, তাদের সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য দাবি করে। আইনি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অভিযোগ করে, সরকারের চাওয়া কিছু তথ্য আইনজীবী-মক্কেল গোপনীয়তার আওতায় পড়ে।এই বিরোধের মধ্যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে সম্পন্ন করা আইনি সেবার বিপরীতে প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার অর্থ সরকার আটকে রাখে। গত ৬ আগস্ট একই ফেডারেল জেলা আদালত সরকারকে অলাভজনক আইনি সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর বকেয়া অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দেন। আদালতের এই নির্দেশের পরও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ও ভবিষ্যৎ আইনি প্রতিনিধিত্বের কাঠামো নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

অ্যাকাসিয়ার চুক্তির মেয়াদ ৩১ জুলাই শেষ হওয়ার পর প্রশাসন নতুন আইনি সেবা প্রদানকারী খুঁজতে শুরু করে। প্রথমে হিউস্টনের ছোট আইন প্রতিষ্ঠান বার্ক ল গ্রুপকে একটি নন-কম্পিটিটিভ চুক্তির জন্য বিবেচনা করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির অভিবাসন আইনে অভিজ্ঞতা সীমিত হওয়ায় এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরে বার্ক ল গ্রুপ প্রক্রিয়া থেকে সরে দাঁড়ায়।

এরপর ৭ আগস্ট প্রশাসন আওয়ার রেসকিউকে অভিভাবকহীন শিশুদের আইনি সেবার জন্য সর্বোচ্চ ২৪ কোটি ৪০ লাখ ডলারের একটি নন-কম্পিটিটিভ বা নো-বিড চুক্তি দেয়। তবে এ প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আওয়ার রেসকিউ মূলত মানবপাচারবিরোধী সংগঠন হিসেবে পরিচিত। অভিবাসন আইন ও অভিবাসন আদালতে হাজার হাজার শিশুর প্রতিনিধিত্ব করার মতো পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে কি না, তা নিয়ে আইনজীবী ও অভিবাসন অধিকারকর্মীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

আওয়ার রেসকিউর প্রতিষ্ঠাতা টিম ব্যালার্ডের বিরুদ্ধেও অতীতে যৌন নিপীড়ন ও অন্যান্য গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল। তিনি ২০২৩ সালে সংগঠন থেকে পদত্যাগ করেন। এসব বিতর্কের কারণে অভিবাসন আদালতে শিশুদের প্রতিনিধিত্বের জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত আরো সমালোচনার মুখে পড়েছে।

অন্যদিকে ওআরআর জানিয়েছে, অভিবাসন আইনি সেবা দেওয়ার অভিজ্ঞতা থাকা ইউএস কমিটি ফর রিফিউজিস অ্যান্ড ইমিগ্র‍্যান্টস বা ইউএসসিআরআই আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অভিভাবকহীন শিশুদের আইনগত প্রতিনিধিত্ব দেবে। তবে এরপর দীর্ঘমেয়াদে কোনো প্রতিষ্ঠান বা নেটওয়ার্ক এসব শিশুদের প্রতিনিধিত্ব করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

অভিবাসন আদালতে আইনজীবীর সহায়তা পাওয়া একজন অভিবাসীর মামলা সফল হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণভাবে অভিবাসীদের জন্য সরকারিভাবে বিনামূল্যে আইনজীবী পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার নেই। ফলে ফেডারেল অর্থায়নে পরিচালিত আইনি সহায়তা কর্মসূচিগুলো বিশেষ করে অভিভাবকহীন শিশুদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আমেরিকান ইমিগ্রেশন অ্যাসোসিয়েশনের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৯ থেকে ২০২৪ অর্থবছরের মধ্যে আইনজীবী ছাড়া থাকা ব্যক্তিদের বহিষ্কারের আদেশ পাওয়ার সম্ভাবনা আইনজীবী থাকা ব্যক্তিদের তুলনায় সামগ্রিকভাবে আড়াই গুণেরও বেশি ছিল। আটক অবস্থায় থাকা অভিবাসীদের ক্ষেত্রে এ ব্যবধান বেড়ে ১০.৫ গুণে দাঁড়ায়।

অভিভাবকহীন শিশুদের পরিস্থিতি আরো জটিল। একজন শিশুকে সরকারি আইনজীবীর বিপরীতে নিজেই অভিবাসন আদালতের মামলা পরিচালনা করতে হতে পারে। তাকে অভিবাসন আইন, বিধিমালা, আদালতের প্রক্রিয়া, বিভিন্ন ফরম এবং আশ্রয়সহ অন্যান্য ধরনের অভিবাসন সুবিধার জটিল নিয়ম বুঝতে হয়। অনেক শিশুই ইংরেজি ভাষায় দুর্বল এবং তাদের পারিবারিক, সামাজিক ও আইনি পরিস্থিতিও অত্যন্ত জটিল হতে পারে।

এই কারণেই কংগ্রেস ফেডারেল সরকারকে অভিভাবকহীন শিশুদের জন্য আইনজীবীর কাছে প্রবেশাধিকার যতটা সম্ভব বাস্তবসম্মত সর্বোচ্চ মাত্রায় নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু ফেডারেল অর্থায়ন কমে গেলে বা অভিজ্ঞ আইনি প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবর্তে সীমিত অভিজ্ঞতার প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হলে শিশুদের সেই অধিকার বাস্তবে কতটা কার্যকর থাকবে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

অ্যাকাসিয়ার চুক্তি শেষ হওয়াও ট্রাম্প প্রশাসনের ফেডারেল অর্থায়নে পরিচালিত অভিবাসন আইনি সেবা সংকুচিত করার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ বলে সমালোচকেরা মনে করছেন। প্রশাসনের শুরু থেকেই বিভিন্ন আইনি সহায়তা কর্মসূচি বন্ধ বা পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বিচার বিভাগ চারটি কর্মসূচিতে কাজ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিল। এগুলো হলো কাউন্সেল ফর চিলড্রেন ইনিশিয়েটিভ, লিগ্যাল ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম বা এলওপি, ইমিগ্রেশন কোর্ট হেল্পডেস্ক এবং ফ্যামিলি গ্রুপ লিগ্যাল ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে অভিবাসীদের আদালতের প্রক্রিয়া সম্পর্কে তথ্য, প্রো-বোনো আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ এবং অন্যান্য আইনি সহায়তা দেওয়া হতো।

কংগ্রেস ২০০৩ সাল থেকে লিগ্যাল ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামে অর্থায়ন করে আসছে। ২০২৬ অর্থবছরের জন্যও এ কর্মসূচিতে ২ কোটি ৭৫ লাখ ডলার বরাদ্দ করা হয়েছিল। প্রশাসনের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ১২টি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান মামলা করে। তাদের অভিযোগ, সরকারের পদক্ষেপ ফেডারেল প্রশাসনিক আইন লঙ্ঘন করেছে এবং কংগ্রেসের নির্ধারিত অর্থায়নের উদ্দেশ্যকে উপেক্ষা করেছে।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রশাসন কাজ বন্ধের নির্দেশ প্রত্যাহার করলেও দুই মাস পর এসব কর্মসূচি পরিচালনাকারী আইনি সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল চুক্তি বাতিলের উদ্যোগ নেয়। আদালতের নথিতে বলা হয়, কাউন্সেল ফর চিলড্রেন ইনিশিয়েটিভ, ইমিগ্রেশন কোর্ট হেল্পডেস্ক এবং ফ্যামিলি গ্রুপ লিগ্যাল ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম বন্ধ করার পরিকল্পনা ছিল। একই সঙ্গে এলওপি এবং অভিভাবকহীন শিশুদের তত্ত্বাবধায়কদের জন্য পরিচালিত এলওপি-সি কর্মসূচিকে বেসরকারি নাগরিক সংগঠনগুলোর কাছ থেকে সরিয়ে সরকারের নিজস্ব ব্যবস্থায় নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। আরো দুটি আইনি সহায়তা কর্মসূচি বাতিলের চেষ্টা আদালতের আদেশে বর্তমানে চালু রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অভিবাসন আদালতে মানসিক সক্ষমতা নিয়ে জটিলতার মুখোমুখি ব্যক্তিদের জন্য ন্যাশনাল কোয়ালিফায়েড রিপ্রেজেন্টেটিভ প্রোগ্রাম এবং প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া পরিবারগুলোর সদস্যদের জন্য লিগ্যাল অ্যাকসেস সার্ভিসেস ফর রিইউনিফাইড ফ্যামিলিজ কর্মসূচি।

অভিবাসন অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, ট্রাম্প প্রশাসন যখন ব্যাপক ধরপাকড় ও বহিষ্কার জোরদার করছে, তখন অভিবাসীদের আইনজীবী পাওয়ার সুযোগ কমিয়ে দেওয়া হলে সরকারি পক্ষের সঙ্গে তাদের আইনি লড়াই আরো অসম হয়ে পড়বে। বিশেষ করে অভিভাবকহীন শিশুদের ক্ষেত্রে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী না থাকলে তাদের বহিষ্কারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।

শেয়ার করুন