বক্তব্য রাখছেন হারিয়ে যাওয়া এক সন্তানের বাবা
বিএনপি করি বলে ওই সময়ে আমার আদরের শিশুটা হারিয়ে গেলেও পুলিশ কর্ণপাত করেনি। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তৎকালীন সাবেক সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তারা নিখোঁজ সন্তানকে খুঁজে বের করার বিষয়ে কোনো প্রকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।
কথাগুলো বললেন নিখোঁজ শিশু তামিমের বাবা, যিনি বাংলাদেশ পুলিশের একজন সাবেক সদস্য, তার বক্তব্যে তিনি আরও জানান, একজন বাবা হিসেবে তিনি তার সন্তানকে খুঁজে পেতে দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। তিনি শিশু নিখোঁজের ঘটনাগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ থাকা শিশুদের উদ্ধারে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান। ঢাকার লালবাগ এলাকার বাসিন্দা নিখোঁজ শিশু সকালের বাবা তার আবেগঘন বক্তব্যে বলেন, তিনি তৎকালীন সময়ে বিএনপির সাংস্কৃতিক সংগঠন জাসাসের লালবাগ থানার সেক্রেটারি পদে দায়িত্ব পালন করছিলেন। নিজের সন্তানের সন্ধান পেতে তিনি তার জীবনের প্রায় সমস্ত সঞ্চয় ব্যয় করেছেন। সন্তানের খোঁজে ছুটতে ছুটতে একপর্যায়ে তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে বর্তমানে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তিনি বলেন, সন্তানের মুখ আরেকবার দেখার আশাতেই তিনি বেঁচে আছেন।
এদিকে ঢাকার পল্লবীর বাসিন্দা নিখোঁজ শিশু রুপার মা রবজেবুর নাহার স্বপ্না বলেন, “সন্তান হারানোর বেদনা কী, তা কেবল সেই মা-বাবারাই বুঝতে পারবেন যারা তাদের সন্তানকে হারিয়েছেন। মৃত্যুর আগে আমি শুধু একবার আমার মেয়েকে দেখতে চাই।” তিনি গণমাধ্যমের প্রতি তার মেয়েকে খুঁজে পেতে সহযোগিতার আহ্বান জানান এবং শিশু নিখোঁজ প্রতিরোধ ও উদ্ধারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ জানান।
নিখোঁজ শিশু যাদব কর্মকারের মা অর্চনা রানী কর্মকার, যিনি পেশায় একজন পোশাক শ্রমিক, বলেন যে তার সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পর তিনি সাভার থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে গিয়ে নানা ধরনের ভোগান্তি ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, প্রথমদিকে পুলিশ জিডি গ্রহণে অনীহা দেখায় এবং পরবর্তীতে জিডি গ্রহণ করলেও কার্যকর কোনো অগ্রগতি দেখতে পাননি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি তার সন্তানকে ফিরে পেতে রাষ্ট্র ও সমাজের সহযোগিতা কামনা করেন।
কাওরান বাজার এলাকা থেকে নিখোঁজ ১০ বছর বয়সী মাদ্রাসা শিক্ষার্থী মাইমুনার দাদী হালিমা বেগম বলেন, মাইমুনার মায়ের মৃত্যুর পর থেকে শিশুটি তার কাছেই বড় হচ্ছিল। প্রায় ৪৫ দিন ধরে মাইমুনা নিখোঁজ রয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন জায়গায় সহযোগিতা চাইলেও কাঙ্ক্ষিত সহায়তা পাননি। তিনি উপস্থিত সকলের কাছে তার নাতনিকে ফিরে পেতে সহযোগিতা কামনা করেন।
ঝিনাইদহের বাসিন্দা নিখোঁজ ১৩ বছর বয়সী মোঃ আলীর পিতা হোসেন আলী বলেন, তার ছেলে একজন কুরআনের হাফেজ। একদিন মসজিদে পড়তে যাওয়ার কথা বলে বের হওয়ার পর আর বাড়ি ফিরে আসেনি। তিনি অভিযোগ করেন, শিশু নিখোঁজ হওয়ার পরও পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে জিডি গ্রহণ করেনি এবং কয়েকদিন পর জিডি নেয়। তিনি আরও বলেন, সন্তানের খোঁজে তিনি দেশের বিভিন্ন জেলায় ছুটে বেড়িয়েছেন এবং মানুষের কথায় বিভ্রান্ত হয়ে বিভিন্ন ফকির-কবিরাজের পেছনেও বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন। তবুও তিনি এখনো তার সন্তানের কোনো সন্ধান পাননি। তিনি সকলের কাছে তার সন্তানকে খুঁজে পেতে সহায়তার আবেদন জানান।
“আমার সস্তান কোথায়?” শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে নিখোঁজ সন্তানদের পিতা-মাতাদের কণ্ঠে এমন আহাজারি শোনা গেলো। বাংলাদেশে নিখোঁজ শিশুদের দ্রুত সন্ধান, নিরাপদ প্রত্যাবর্তন এবং শিশু নিখোঁজ ও পাচার প্রতিরোধে কার্যকর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিতে রোববার রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সাত মাসে শিশু নিখোঁজের সংখ্যা ৩১ হাজার
একের পর পিতা-মাতা তাদের সন্তান হারিয়ে ফেলছে। বাসার সামনে একটু আগেও যা-কে খেলাধুলা করতে গেছে, চোখ ফেরাতে সে নাই হয়ে যাচ্ছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে শিশু নিখোঁজের ঘটনায় থানায় ৩১ হাজারের বেশি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। এর মধ্যে এখনও চার হাজারের বেশি শিশুর সন্ধান মেলেনি। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যানে এটা উঠে এসেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত, সংশ্লিষ্ট থানা ও সদরদপ্তরের পুলিশের দেওয়া তথ্যের বরাতে পরিষদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে শূন্য থেকে ৯ বছরের শিশু নিখোঁজের বিষয়ে ১৫ হাজার ৭১৭টি জিডি হয়েছে। এর মধ্যে দুই হাজার ৩৮ শিশু এখনও নিখোঁজ রয়েছে। একই সময়ে ১০-১৭ বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের ঘটনায় ১৫ হাজার ২৪৩টি জিডি হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৩ হাজার ২৭৩ জনকে উদ্ধার করা গেলেও এখনও এক হাজার ৯৭০ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।’
অন্যদিকে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে শিশু নিখোঁজ-সংক্রান্ত সাধারণ ডায়েরির (জিডি) সংখ্যা ছিল ১৭,৮০৮টি, ২০২৪ সালে ১৬,৪১৪টি এবং ২০২৫ সালে ২২,৫৫০টি। এছাড়া ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্তক ১৫,৭১৭টি শিশু নিখোঁজ-সংক্রান্ত জিডি দায়ের হয়েছে। বর্তমানে ২,০৩৮ জন শিশু এখনো নিখোঁজ রয়েছে।
রাষ্ট্র প্রতিকার করছে না কেনো?
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে শিশুরা হারাচ্ছে, মায়ের কোল শুন্য হচ্ছে..তারপরেও কেনো রাষ্ট্র প্রতিকারও করছে না কেনো? এমনই বাস্তবতায় ‘মুন পরিবার’ গঠনের মাধ্যমে নিখোঁজ শিশুদের পরিবারবর্গের সুসংগঠিত আত্মপ্রকাশ হয়েছে। এর পাশাপাশি “আমার সস্তান কোথায়?” নিখোঁজ শিশুদের সন্ধান, নিরাপদ প্রত্যাবর্তন এবং কার্যকর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের দাবিতে সংবাদ সম্মেলনও আয়োজন করে ৬ সেপ্টেম্বর রোববার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির মিলনায়তনে।
নিখোঁজ শিশুদের পরিবারবর্গের উদ্যোগে এবং জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত প্রায় ৪০টি নিখোঁজ শিশুর পরিবারের সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন। এই প্রেস ব্রিফিংয়ের মধ্য দিয়ে নিখোঁজ শিশুদের পরিবারবর্গ সুসংগঠিত হয়ে ‘মুন পরিবার’ গঠন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার বিজয়ী এবং জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশনের সভাপতি সাদাত রহমান বাংলাদেশে শিশু নিখোঁজের সামগ্রিক পরিস্থিতি, সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান, শিশু নিখোঁজ প্রতিরোধ ও উদ্ধারে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ এবং মিসিং আর্জেন্ট নোটিফিকেশন (মুন অ্যালার্ট)-এর পটভূমি, কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য প্রদান করেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে শিশু নিখোঁজ, অপহরণ ও পাচারের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরেই একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা। তিনি শিশু নিখোঁজ প্রতিরোধ ও উদ্ধারে প্রযুক্তিনির্ভর ও সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ থাকা শিশুদের মামলাগুলো পুনরায় পর্যালোচনা, বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন, এজ-প্রগ্রেশন প্রযুক্তির ব্যবহার, শিশু পাচার প্রতিরোধে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধান ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং মিসিং আর্জেন্ট নোটিফিকেশন (মুন অ্যালার্ট) কার্যক্রমকে আরও সম্প্রসারণ ও শক্তিশালী করার বিষয়ে তিনি বিভিন্ন প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। পরবর্তীতে উপস্থিত নিখোঁজ শিশুদের পরিবারবর্গের পক্ষ থেকে একে একে পরিবারের সদস্যরা তাদের সন্তানদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা, দীর্ঘদিনের অনুসন্ধান, অনিশ্চয়তা এবং অপেক্ষার বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। এছাড়াও উপস্থিত অন্যান্য নিখোঁজ শিশুদের পরিবারের সদস্যরা তাদের দীর্ঘদিনের অসহায়ত্ব, মানসিক যন্ত্রণা এবং প্রশাসনিক নানা চ্যালেঞ্জের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তারা বলেন, নিখোঁজ শিশুদের পরিবারগুলো বছরের পর বছর ধরে অনিশ্চয়তা ও অপেক্ষার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে।