১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ০৪:২৬:১৩ অপরাহ্ন
শিরোনাম :


টেক্সাসে বিতর্কিত নতুন পাঠ্যক্রম অনুমোদনে মুসলিমদের ক্ষোভ
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ১০-০৯-২০২৬
টেক্সাসে বিতর্কিত নতুন পাঠ্যক্রম অনুমোদনে মুসলিমদের ক্ষোভ ২০৩০ শিক্ষাবর্ষ থেকে টেক্সাসের উচ্চবিদ্যালয়ে ৯/১১ হামলা ও ইসলামের ইতিহাস নিয়ে বিতর্কিত নতুন পাঠ্যক্রম চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।


টেক্সাসের স্টেট বোর্ড অব এডুকেশন হাইস্কুলের জন্য নতুন সামাজিক বিজ্ঞান পাঠ্যক্রম ৪ সেপ্টেম্বর শুক্রবার অনুমোদন করেছে। তবে নতুন পাঠ্যক্রমে ইসলাম ও মুসলিমদের ইতিহাস যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা নিয়ে মুসলিম সম্প্রদায়, শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন নাগরিক অধিকার সংগঠন আপত্তি জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, নতুন পাঠ্যক্রমে ইসলামকে সহিংসতা ও দাসপ্রথার সঙ্গে অতিরিক্তভাবে যুক্ত করা হয়েছে এবং ইতিহাসে মুসলিমদের বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক অবদান যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। নতুন মানদণ্ড অনুযায়ী, ২০৩০-৩১ শিক্ষাবর্ষ থেকে টেক্সাসের উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শেখানো হবে যে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পেছনে ‘চরমপন্থী ইসলাম’ প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল। একই সঙ্গে ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসের অংশ হিসেবে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ইহুদি ও খ্রিষ্টান গোত্রগুলোর বিরুদ্ধে ‘নৃশংস সামরিক অভিযান’, দাসপ্রথার নিয়ন্ত্রণ এবং নারী বন্দিদের বিষয়ে পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

মহানবী (সা.)-এর সামরিক অভিযান বর্ণনার ক্ষেত্রে নৃশংস শব্দটি বাদ দেওয়ার একটি শেষ মুহূর্তের সংশোধনী প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা অনুমোদিত হয়নি। বোর্ড সদস্য ব্র‍্যান্ডন হল ওই শব্দটি রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেন, ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশকে এমনভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন, যাতে শিক্ষার্থীরা পরবর্তী বিশ্বের ঘটনাগুলোর প্রেক্ষাপট বুঝতে পারে।

তবে বোর্ডের নিযুক্ত কয়েকজন বিশেষজ্ঞ এসব বর্ণনা নিয়ে সতর্ক করেছিলেন। প্রস্পার আইএসডির সামাজিক বিজ্ঞান কারিকুলাম সমন্বয়কারী আন্দ্রেয়া হাচিসন বলেন, সংশ্লিষ্ট কিছু দাবি গভীর ঐতিহাসিক যাচাইয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ইউটি অস্টিনের অধ্যাপক রবার্ট কুনসও ব্যবহৃত কিছু উৎসের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সুপ্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক উৎস ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক করেন। এরপরও বোর্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা প্রস্তাবগুলো অনুমোদন করেন।

বোর্ডের শুনানিতে মুসলিম বক্তারা ইসলামকে শুধু সহিংসতা ও দাসপ্রথার আলোকে না দেখে এর ঐতিহাসিক, বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক অবদানও পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান। মুসলিম বক্তা বাহিয়া আমাউই বোর্ডের কাছে ইসলামের মূলনীতি ও অবদান শেখানোর পাশাপাশি ইসলামকে সহিংসতার সঙ্গে একমাত্রিকভাবে যুক্ত করে এমন বিষয় পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, নতুন পাঠ্যক্রমের উদ্দেশ্য কি শিক্ষার্থীদের তাদের মুসলিম সহপাঠী ও প্রতিবেশীদের সম্পর্কে অবিশ্বাসী করে তোলা।

এর আগে বোর্ড এমন একটি প্রস্তাব বাদ দিয়েছিল, যাতে শিক্ষার্থীদের বীজগণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে মুসলিমদের অবদান সম্পর্কে শেখানোর কথা ছিল। চূড়ান্ত পাঠ্যক্রমেও বিষয়টি পুনরায় যুক্ত করা হয়নি। ১৫ বছর বয়সী মুসলিম শিক্ষার্থী হাবিবা কুরেশ বোর্ডের সামনে বক্তব্য দিয়ে বলেন, এমন পাঠ তার ধর্মকে আক্রমণের মুখে ফেলছে বলে তিনি মনে করেন এবং ইতিহাসের ক্লাসে নিজের ধর্মকে একটি বাক্যের কারণে ডিফেন্ড করতে বাধ্য হওয়া উচিত নয়।

নতুন পাঠ্যক্রমে খ্রিষ্টধর্মের ঐতিহাসিক প্রভাবের ওপরও গুরুত্ব বাড়ানো হয়েছে। এর আগে বোর্ড কে -৮ পর্যায়ের সামাজিক বিজ্ঞান পাঠ্যক্রমে পরিবর্তনের পাশাপাশি সরকারি স্কুলের জন্য একটি বাধ্যতামূলক পাঠতালিকা অনুমোদন করে, যেখানে বাইবেলের বিভিন্ন গল্প ও অংশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব পরিবর্তনও ২০৩০-৩১ শিক্ষাবর্ষ থেকে কার্যকর হওয়ার কথা।

আমেরিকান্স ইউনাইটেড ফর সেপারেশন অব চার্চ অ্যান্ড স্টেট নতুন মানদণ্ডের সমালোচনা করেছে। সংগঠনটির অভিযোগ, পাঠ্যক্রমে খ্রিষ্টধর্মের ঐতিহাসিক প্রভাবকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও ইসলামের ক্ষেত্রে নেতিবাচক উপস্থাপনা করা হয়েছে। সংগঠনটি মনে করে, সরকারি স্কুলের পাঠ্যক্রমে একটি ধর্মকে প্রাধান্য দিয়ে অন্য ধর্মকে অবমূল্যায়ন করা সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।

মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠন কেয়ার এবং এর টেক্সাস শাখাও নতুন পাঠ্যক্রমের বিরুদ্ধে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, ২০৩০ সালে এটি কার্যকর হওয়ার আগে পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের চেষ্টা করা হবে এবং এটি পড়াতে আপত্তি জানানো শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

অন্যদিকে স্টেট বোর্ড অব এডুকেশনের চেয়ারম্যান অ্যারন কিনসে নতুন সামাজিক বিজ্ঞান কাঠামোকে ভারসাম্যপূর্ণ বলে বর্ণনা করেছেন। তার বক্তব্য, বোর্ডের সদস্যরা দীর্ঘ আলোচনা ও ভোটের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ তা নির্ধারণ করেছেন।

ইসলাম নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি নতুন পাঠ্যক্রমে মার্কিন ইতিহাস, বিশ্ব ভূগোল, মার্কিন সরকার এবং আর্থিক সাক্ষরতার বিভিন্ন বিষয়ও পরিবর্তন করা হয়েছে। নতুন কাঠামোতে ষষ্ঠ শ্রেণির বর্তমান ওয়ার্ল্ডকালচারস কোর্স বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও শিক্ষাবিদদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকদের মতে, এতে পশ্চিমা সভ্যতার বাইরের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের শেখার সুযোগ কমতে পারে। বোর্ডের সদস্যদের বক্তব্য, শিক্ষার্থীদের যুক্তরাষ্ট্র, টেক্সাস এবং দেশটির ইতিহাস গঠনে ভূমিকা রাখা বিষয়গুলো সম্পর্কে আরও জ্ঞান দেওয়াই নতুন কাঠামোর লক্ষ্য।

শেয়ার করুন