বৈঠকে প্রতিনিধিরা
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও এর পাশাপাশি নিদিষ্ট সময়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার ব্যাপারে শঙ্কার শেষ নেই। এরই মধ্যে চলছে নানান হিসাব নিকাশ। তবে সারাদেশে একের পর এক ঘটনা ঘটেই চলেছে। ইতোমধ্যে বড়ো ধরনের ঘটনা এরই মধ্যে ঘটে-ও গেছে। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হয়ে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর মারা গেছেন। তবে তার মারা যাওয়ার পর পর ঘটে গেছে আরও বেশ কয়েকটি হত্যাকান্ডের ঘটনা, এর জের এখনো থামছে না। তবে শরিফ ওসমান হাদি মৃত্যুর পর আরও অনেক ঘটনা ঘটে গেলেও হত্যার সাথে সরাসরি জড়িত মূল আসামীদের কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি। বরং খবরে দেখা গেছে হত্যার সাথে জড়িত অন্যতম পরিকল্পনাকারী ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর, ঢাকা উত্তর যুবলীগ নেতা তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি এখনও কলকাতায় পলাতক বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভারতে পালিয়ে যাওয়া বাপ্পি সম্প্রতি দেশে অনিয়মিতভাবে ঢুকে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। এরপর স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে পুনরায় ভারতে চলে গিয়ে হাদির হত্যার পুরো পরিকল্পনা পরিচালনা করেছেন। তবে হাদির হত্যাকারীদের দেশে ফিরিয়ে আইনের মুখোমুখি করা উচিত বলে বিভিন্ন মহল থেকে দাবি জানানো অব্যহত রয়েছে। কিন্তু এব্যাপারে সরকারের থেকে তেমন সাড়া শব্দ শোনা যায়নি।
এদিকে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদিকে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় ডিবি পুলিশের দেওয়া চার্জশিট পর্যালোচনার জন্য আরও দুই দিনের সময় নিয়েছেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের। এরই মধ্যে রাজধানীর তেজগাঁও থানার পশ্চিম তেজতুরী বাজার এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান ওরফে মোছাব্বিরকে দুর্বৃত্তরা গুলি করে হত্যা করে সারাদেশে অরেকদফা আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। এছাড়া আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের বিএনপির প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরীকে নিয়ে। অভিযোগ উঠেছে,এই শাহজাহান চৌধুরীকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে সাদা কাপড়সহ উড়ো চিঠি পাঠানো হয়েছে।
রোববার (৪ জানুয়ারি) দুপুরে ডাকযোগে প্রাপ্ত ওই চিঠির খামের সঙ্গে একটি সাদা কাপড়ের টুকরো সংযুক্ত ছিল, যা কাফনের কাপড় হিসেবে ইঙ্গিত করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। অন্যদিকে চলন্ত মোটরসাইকেলে পেছন থেকে এসে মাথায় গুলি করে যশোরের বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেনকে হত্যার ঘটনাও ভাবিয়ে তুলেছে। এঘটনাকে ঢাকায় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করার ঘটনার সাথে মিল খুঁজে পান অনেকে।
আর একের পর এসব ঘটনা মাঝে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের ব্যাপারে শঙ্কা সৃষ্টি হয় যখন দেশের প্রশাসন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের দিকে হেলে পড়েছে বলে অভিযোগ করেন খোদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রধান দলগুলি থেকে। জুলাই বিপ্লবের ইমেজকে ধারণ করে গড়ে উঠা রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক ও ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী নাসীররুদ্দীন পাটওয়ারীর মুখে শোনা গেলো, যখন দেশের প্রশাসন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের দিকে হেলে পড়েছে। অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম-ও বলেছেন, বর্তমান প্রশাসন বিএনপির পক্ষে কাজ করছে। মাঠ প্রশাসন নিরপেক্ষ আচরণ করছে না। এ ধরনের প্রশাসনের অধীনে নির্বাচন করা সম্ভব নয়।
অভিযোগে সায় দিলো জামায়াতে ইসলামী
এরই মধ্যে আসন্ন নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠু হবে কি না তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতারা। খোদ ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) এক্সটারনাল অ্যাকশ সার্ভিসের প্রতিনিধি দলের বৈঠকে বিএনপির প্রতি ইঙ্গিত করে দলটি বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসন একটি বিশেষ দলের প্রতি আনুগত্য দেখাচ্ছে। ৭ জানুয়ারি বুধবার রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় দলীয় আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) এক্সটারনাল অ্যাকশ সার্ভিসের প্রতিনিধি দলের বৈঠকে এসব বক্তব্য তুলে ধরেছে জামায়াত।
মার্কিন প্রতিনিধি দলের সাক্ষাৎ
এরই মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক স্টেট সেক্রেটারি অ্যালবার্ট টি. গম্বিসের নেতৃত্বে উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দলের সৌজন্য সাক্ষাৎ নানা আলোচনার ঝড় তুলেছে। ১১ জানুয়ারি রোববার দুপুর ২টায় রাজধানীর মগবাজারের জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এই মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকের ব্যাপারে কেউই মুখ না খুললেও জল্পনা কল্পনার শেষ নেই। কারো কারো মতামত হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মাঠে এখন ফ্যাসবাদের অপমান কাধে নিয়ে দেশের দু’টি বড়ো দলের কোনো কার্যক্রম নেই। তা-ই এখন বিএনপি’র পর দেশের সার্বিক পরিস্থিতি মাঠে এখন সক্রিয় দল হিসাবে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জামায়াত আমিরের সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধি দলের সাক্ষাৎ বৈঠকটি হয়েছে। তা-ই এই বৈঠকে নতুনত্ব কিছু নেই।
এই বৈঠকের আগে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান পাঁচ দিনের সফরে ওয়াশিংটন গিয়েছিলেন যা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ আলোচনা আছে। আগামী বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনের আগে একদিকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার ওই সফরের সময়ে ঢাকায় জামায়াত আমিরের সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধি দলের সাক্ষাৎ বেশ ইঙ্গিতপূর্ণ। যদিও বলা হচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রেমিট্যান্স, ভিসা ও ভ্রমণের ক্ষেত্রে কড়াকড়ির সংক্রান্ত বিষয়ই নিয়ে সেখানে দেনদরারে ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু তারপরে নানান বক্তব্য খবরে বাতাস ভারী হচ্ছে। কেননা সাম্প্রতিক পরিবেশ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে বিশ্বের শক্তিধর আমেরিকা আসলে কোন দিকে কি মর্জি নিয়ে বাংলাদেশে আর্বিভাব হয় তার উপরেই অনেক কিছু নির্ভর করছে।
সে-দিক থেকে জামায়াত আমিরের সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধি দলের সাক্ষাৎ বেশ কিছুর ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু একটি সূত্র জানায় জামায়াতের নেতাদের সাথে মার্কিন প্রতিনিধি দলের বৈঠকের আরেকটি পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। কেননা ইতোমধ্যে খবর বেরিয়েছে এতো উতাল পাতালের মধ্যে জামায়াতের নেতাদের সাথে ভারতের বৈঠকের খবর। এতে দেখা যায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান ২০২৫ সালে তাঁর বাইপাস সার্জারির পর ভারতের একজন কূটনীতিকের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এতথ্য জানিয়েছে। আর নিজের বাসভবনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জামায়াত আমির ওই বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। জামায়াতের আমির রয়টার্সকে বলেন, অন্যান্য দেশের কূটনীতিকেরা যেমন প্রকাশ্যে তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন, ভারতীয় কূটনীতিক তেমনটি করেননি। ভারতীয় ওই কর্মকর্তা বৈঠকটি গোপন রাখতে বলেছিলেন। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সারাদেশে যখন ভারত বিরোধী ঝান্ডা উড়িয়ে প্রতিবাদ (দিল্লী না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা শ্লোগান) সমাবেশ হচ্ছিল, ঠিক সেসময়ে দেশটির সাথে খোদ জামায়াতের একেবারে শীর্ষ নেতাদের বৈঠক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে অন্যরকম প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। এর পাশাপাশি পুরো দেশের জনগণের মধ্যে রহস্যের সৃষ্টি করেছে। এবিষয়টিও আমেরিকার কাছে-ও প্রশ্নবোধক ঠেকেছে কি-না তা সরাসরি জানতে জামায়াতের নেতাদের সাথে মার্কিন প্রতিনিধি দলের বৈঠকে হয়েছে কি-না সে ব্যাপারেও গুঞ্জন রয়েছে। কেননা বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশকে নিয়ে আমেরিকার সব ধরণের সামরিক ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের অংশিদার হিসাবে জটিল বিবেচনায় রয়েছে। এ-ই কৌশলে বিপত্তি বা জটিলতা বাধাতে কেউ গোপনে অন্য খেলা খেলতে চাচ্ছে কি-না তা ঝালাই করে দেখা হলো না-কি তা-ও বিবেচনায় নিচ্ছেন অনেকে। একারণে জামায়াতের নেতাদের সাথে মার্কিন প্রতিনিধি দলের বৈঠকটি সেদিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।