গাড়ির ইন্স্যুরেন্স
নিউইয়র্ক স্টেটে ক্রমবর্ধমান যানবাহন বীমা খরচ সাধারণ মানুষের জন্য একটি বড় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে গভর্নর ক্যাথি হোচুল সম্প্রতি একগুচ্ছ নতুন প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। তার লক্ষ্য হলো গাড়ির বীমা প্রিমিয়াম কমানো, বীমা জালিয়াতি দমন করা এবং নিশ্চিত করা যে এই খাতে হওয়া যেকোনো সাশ্রয়ের সুফল শুধু মাত্র বীমা কোম্পানির মুনাফার চেয়ে শেষ পর্যন্ত ভোক্তার পকেটেই পৌঁছায়। মানি ইন ইয়োর পকেটস শীর্ষক এই উদ্যোগ গভর্নরের বৃহত্তর নিউইয়র্ককে আরো সাশ্রয়ী করে তোলা পরিকল্পনারই অংশ।
গভর্নর হোচুল বলেন, নিউইয়র্কবাসী খুব ভালোভাবেই জানেন যে গাড়ির বীমার খরচ এখন অস্বাভাবিক রকম বেশি। অনেক মানুষের জন্য গাড়ি কোনো বিলাসিতা নয়, বরং কর্মস্থলে যাওয়া, সন্তানদের স্কুলে পৌঁছে দেওয়া কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করার জন্য এটি একান্ত প্রয়োজন। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত এই সাধারণ বোধসম্পন্ন সংস্কারগুলো একদিকে যেমন জালিয়াতি ও অপব্যবহার রোধ করবে, অন্যদিকে তেমনি পরিশ্রমী নিউইয়র্কবাসীর পকেটে সরাসরি অর্থ সাশ্রয় এনে দেবে এবং কিছুটা হলেও আর্থিক স্বস্তি দেবে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য স্টেটের তুলনায় নিউইয়র্কে গাড়ির বীমা খরচ অন্যতম সর্বোচ্চ। গড় হিসেবে একজন নিউইয়র্কবাসীকে বছরে প্রায় ৪ হাজার ডলারেরও বেশি গাড়ির বীমা প্রিমিয়াম দিতে হয়। এটি জাতীয় গড়ের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ৫০০ ডলার বেশি। এই উচ্চ হারের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ যেমন বীমা জালিয়াতি, অতিরিক্ত মামলা-মোকদ্দমা, আইনি ফাঁকফোকর এবং আইন প্রয়োগে দুর্বলতা। অনুমান করা হয়, শুধুমাত্র সাজানো দুর্ঘটনা ও সংশ্লিষ্ট জালিয়াতির কারণেই প্রতি বছর একজন গ্রাহকের প্রিমিয়াম গড়ে প্রায় ৩০০ ডলার পর্যন্ত বেড়ে যায়।
নিউইয়র্ক স্টেটে বীমা জালিয়াতি দিন দিন আরো সংগঠিত ও জটিল রূপ নিচ্ছে। অপরাধচক্রগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্ঘটনা সাজিয়ে বড় অঙ্কের বীমা দাবি আদায়ের চেষ্টা করছে। ২০২৩ সালে নিউইয়র্কে মোট ১ হাজার ৭২৯টি সাজানো দুর্ঘটনার ঘটনা নথিভুক্ত হয়, যা এক্ষেত্রে স্টেটটিকে সারা দেশে দ্বিতীয় স্থানে নিয়ে যায়। এছাড়া নিউইয়র্ক স্টেট ডিপার্টমেন্ট অব ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বীমা কোম্পানিগুলো মোট ৪৩ হাজার ৮১১টি সন্দেহজনক মোটর ভেহিকল বীমা জালিয়াতির ঘটনা রিপোর্ট করেছে, যা ২০২০ সালের তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ বেশি।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় গভর্নর হোচুল ‘হোল-অব-গভর্নমেন্ট’ বা সমন্বিত সরকারি পদ্ধতি গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন। এর অংশ হিসেবে স্টেটের মোটর ভেহিকল চুরি ও বীমা জালিয়াতি প্রতিরোধ বোর্ডকে নতুন করে সক্রিয় করা হবে, যাতে তারা তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো কার্যকরভাবে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে এমন আইন প্রণয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে সাজানো দুর্ঘটনা সংগঠনে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা যায়, কেবল গাড়ি চালকের বিরুদ্ধেই নয়।
গভর্নর ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নিদের সঙ্গে অংশীদারিত্ব জোরদার করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন, যাতে সংগঠিত অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে শক্ত মামলা গড়ে তোলা যায়। বিশেষ করে যেসব চিকিৎসা প্রদানকারী ভুয়া মেডিকেল রিপোর্ট বা মিথ্যা আঘাতের সার্টিফিকেট দিয়ে জালিয়াতিতে সহায়তা করে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, যারা অবৈধভাবে অন্য স্টেটে তাদের গাড়ি নিবন্ধন করে কম প্রিমিয়ামের সুবিধা নিচ্ছে এবং এর ফলে আইন মেনে চলা নিউইয়র্কবাসীর খরচ বাড়াচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বর্তমান আইনে বীমা কোম্পানিগুলোকে জালিয়াতি শনাক্ত ও রিপোর্ট করার জন্য মাত্র ৩০ দিনের সময় দেওয়া হয়, যা অনেক ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত নয়। গভর্নর হোচুল এই সময়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন, যাতে বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথভাবে তদন্ত করে প্রতারণামূলক দাবি বাতিল করতে পারে। একই সঙ্গে আদালতে জালিয়াতির অভিযোগ উত্থাপনের ক্ষেত্রে যে আইনি প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, সেগুলোও শিথিল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে এই সংস্কারের সঙ্গে সঙ্গে ভোক্তা সুরক্ষাও বজায় রাখা হবে বলে আশ্বস্ত করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, যারা দুর্ঘটনার সময় অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকে, তাদের জন্য ক্ষতিপূরণ সীমিত করা। বর্তমানে নিউইয়র্কের আইনে এমন ব্যক্তিরাও বড় অঙ্কের নন-ইকোনমিক ড্যামেজেস বা ব্যথা-বেদনা ও মানসিক কষ্টের ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে, এমনকি যদি তারা মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালায় বা অন্য কোনো অপরাধে জড়িত থাকে। গভর্নর হোচুল চান, এই ধরনের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের ওপর একটি সীমা আরোপ করা হোক, যাতে আইন মেনে চলা চালকদের প্রিমিয়াম দিয়ে অপরাধীদের বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিতে না হয়।
এছাড়া নিউইয়র্ক এমন কয়েকটি স্টেটের মধ্যে একটি, যেখানে দুর্ঘটনায় অধিকাংশ দোষী হয়েও একজন চালক উল্লেখযোগ্য ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন। গভর্নরের প্রস্তাব অনুযায়ী, যদি কোনো চালক দুর্ঘটনার জন্য প্রধানত দায়ী হন, তবে তার ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ সীমিত করা হবে। এতে করে দায়বদ্ধতা ও ন্যায্যতার একটি ভারসাম্য তৈরি হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
নো-ফল্ট বীমা ব্যবস্থার অধীনে গুরুতর আঘাত-এর সংজ্ঞা স্পষ্ট নয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সাময়িক বা তুলনামূলকভাবে কম গুরুতর আঘাতকেও গুরুতর হিসেবে দেখিয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াই ও অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয়। গভর্নর হোচুল এই সংজ্ঞা সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছেন, যাতে বস্তুনিষ্ঠ ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভিত্তিতে নির্ধারিত মানদণ্ড প্রয়োগ করা হয়।
যৌথ ও পৃথক দায়বদ্ধতা আইন সংস্কারের প্রস্তাবও এই উদ্যোগের অংশ। বর্তমানে একাধিক অভিযুক্ত থাকলে, দোষের পরিমাণ কম হলেও কোনো একজনকে পুরো নন-ইকোনমিক ক্ষতিপূরণের দায় বহন করতে হয়। প্রস্তাবিত পরিবর্তনে, যারা ৫০ শতাংশের কম দোষী, তাদের শুধু নিজেদের দোষের অংশ অনুযায়ীই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এতে বীমা কোম্পানির ঝুঁকি কমবে এবং প্রিমিয়াম কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সংস্কারের ফলে যদি বীমা কোম্পানির ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে, তবে সেই সাশ্রয় যেন গ্রাহকদের কাছেই ফিরে যায়। নিউইয়র্কের ‘এক্সেস প্রফিট ল’ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সীমার বেশি লাভ হলে বীমা কোম্পানিকে তা পলিসিধারীদের ফেরত দিতে হয়। গভর্নর হোচুল উঋঝ-কে এই আইনের সীমা পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
সবশেষে, বীমা বাজারে স্বচ্ছতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রিমিয়াম বাড়লে কেন বাড়ছে, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা গ্রাহকদের জানাতে বীমা কোম্পানিগুলোকে বাধ্য করা হবে। পাশাপাশি, যারা নিরাপদভাবে গাড়ি চালায় এবং স্বেচ্ছায় প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপদ ড্রাইভিং প্রোগ্রামে অংশ নেয়, তাদের জন্য বিশেষ ছাড় দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
গভর্নর হোচুলের এই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে নিউইয়র্কের গাড়ির বীমা ব্যবস্থায় একটি বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আসতে পারে। জালিয়াতি কমলে, মামলা-মোকদ্দমা হ্রাস পেলে এবং দায়বদ্ধতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হলে শেষ পর্যন্ত লাভবান হবেন সাধারণ নিউইয়র্কবাসী যাদের জন্য এই পুরো উদ্যোগের মূল লক্ষ্যই হলো মানি ইন ইয়োর পকেটস।