০৩ জুন ২০২৬, বুধবার, ১১:৫৬:৪৪ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
মাত্র এক ডোজেই কমতে পারে ৬২ শতাংশ পর্যন্ত খারাপ কোলেস্টেরল নিউ ইয়র্কের ফোনমুক্ত স্কুলে কমেছে বুলিং আরবি ভাষা ও শিক্ষা যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রিয় হচ্ছে গ্রিনকার্ডের আবেদন নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অপব্যাখ্যার পর পুনঃব্যাখ্যা, মামলার প্রস্তুতি বিশ্ব কূটনীতির সর্বোচ্চ মঞ্চে আবারো বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন ভিসা : দুইবারের বেশি দূতাবাসে যেতে হবে না অনলাইন জুয়ার বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে বড়রা এ প্রজন্মকে হাটে নিয়ে বিক্রি করে দিয়েছে খালেদা জিয়ার নামে নামকরণ : তারেক রহমানের ‘না’ সাক্ষাৎকার ছাড়াই দ্রুত আশ্রয় আবেদন বাতিলের পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসনের


বট বাহিনীতে ঠেকানো যায়নি বিএনপির ভূমিধস বিজয়
সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৮-০২-২০২৬
বট বাহিনীতে ঠেকানো যায়নি বিএনপির ভূমিধস বিজয় বিএনপির নির্বাচনী প্রচারণা


জামায়াতে ইসলামীর ভাড়াটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আনাড়ী কর্মীরা শেষমেষ বিএনপি’র ভূমিধস বিজয়কে ঠেকাতেই পারলো না। অস্বাভাবিক ধারণার পাশাপাশি দলটি এমন প্রচারণায় তুঙ্গে উঠায় যে পুরো জাতি জামায়াতকে ক্ষমতায় বসাতে উদগ্রীব। কিন্তু এসব আনাড়ী ইউটিউবারদের পাল্লায় পড়ে কিন্তু শত প্রচারণা চালিয়েও শেষমেষ এরা জামায়াতের ইমেজকেই সর্বস্তরের জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলেছে। এসব আলোচনা এখন দেশ জুড়ে, এমনকি জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়েও। বেশ কয়েকজন বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের সাথে আলাপ করে এসব জানা গেছে। 

জানা গেছে, ইসলামী দল বলে দাবিদার জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনের আগে কয়েক হাজার আনাড়ী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কর্মীদের পাল্লায় পড়ে। যাদের জামায়াত মনে করে সাইবার যোদ্ধা। এরা দেশে বিদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করেই বিএনপিকে ঘায়েল করা যাবে বলে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বোঝাতে সক্ষম হয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব আনাড়ী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করে কৌশলে নিজেদের ব্যক্তিগত একাউন্টে বিপুল পরিমাণে অর্থ কামিয়ে ফেলেছে, আর জামায়াতকে দিয়ে নেতিবাচক ইমেজ। 

ভোটের মাঠে তৎপর ‘বট বাহিনী’

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মূলত যারা জামায়াতে ইসলামীর হয়ে কাজ করেছে সাইবার জগতের এই বট বাহিনী। জামায়াতের পক্ষ থেকে বিশাল বাজেট বরাদ্দ করা হয় এই বট বাহিনীতে এগিয়ে নিতে। জামায়াতের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতায় বিএনপির বিরুদ্ধে সাইবার যুদ্ধে নামতে একটি বিশাল বট বাহিনী তৈরি করা হয়। জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের ধারণা দেওয়া হয় বট বাহিনীর নেতৃত্বে সাইবার যুদ্ধেই বিএনপি ভোটের মাঠে চরম বেকায়দায় পড়বে। 

কি এই বটবাহিনী

আধুনিক বিশ্বে ভার্চুয়াল জগতে এই বট বাহিনী হচ্ছে “ইংরেজি রোবট (Robot) শব্দের শেষাংশ থেকে নেওয়া। সেখান থেকেই এই বট শব্দটি এসেছে। রোবট যেমন সয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে। তেমনি এই ‘বট’ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে। এতে প্রোগ্রাম সেট করা থাকে। এই প্রোগামে কারো সম্পর্কে ইতিবাচক বা নেতিবাচক যা-ই সেট করা হবে, সেই বট আইডি তাই করবে। অর্থাৎ মানুষের শেখানো বুলি, গালি বা উপদেশ সে মেনে চলে। এসব কমান্ড দেওয়া হয় বিভিন্ন সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে বিশেষ করে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে। কেননা বাংলাদেশে ফেইসবুক ব্যবহারবারীও বেশি সক্রিয়। বটকে নির্দেশ শেখানো হয় বা প্রোগাম সেট করা হয় যে, ‘ওমুককে গালি দিতে (বা নির্দিষ্ট করে অন্য কিছু বলতে), সে তাই করবে। যদি বলা হয় অমুক অমুক ফেসবুক পোস্টের মন্তব্যে গিয়ে ‘লাইক’ দিতে, সে তাই করবে। লাখ লাখ ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে এ ধরনের পোস্ট, লাইক, ডিসলাইক (হাসির ইমো) বা মন্তব্য দিয়ে কারো কারো রাজনৈতিক সামাজিক জীবন করে তোলা যায় দুর্বিসহ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচেনে এই কাজটি করেছে জামায়াত সমর্থিত বা ভাড়াটে ও রাজনীতিতে আনাড়ী ও শিষ্টাচার বর্জিত বট বাহিনী। 

কি কি করেছে এই বট বাহিনী

জামায়াত সমর্থিত বা ভাড়াটে ও রাজনীতিতে আনাড়ি ও শিষ্টাচার বর্জিত ‘বট বাহিনী’ বিএনপির মার্জিত শিক্ষিত প্রার্থীদের ব্যক্তিগত আক্রমণের ক্ষেত্র বানায়। এর পাশাপাশি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচেন যাতে জয় লাভ করতে না পারে তা-র জন্য নানান কায়দা নেয়। তারা সাইবার জগতে ব্যক্তিগত আক্রমণ, ভুয়া পোস্ট তৈরি করে বিএনপি’র বারোটা বাজাতে যতটা নিচে নামা যায় তা-র চেয়েও মারাত্মকভাবে নেমে পড়ে। তারা বিএনপি শীর্ষ থেকে মাঝারি গোছের যে-কোনো নেতাদের সাদামাটা বক্তব্য নিয়ে এমনভাবে প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছিল, যেনো ভোটের মাঠে কোনো কুলকিনারা না পায় দলটি। এই বট বাহিনীকে ব্যবহার করে নানান ধরনের ইসলামী ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে নামী বেনামী অলেমদের বক্তব্যকে এমনভাবে উপস্থাপিত করতে থাকে যেনো নির্বাচনে বিএনপির চরম ভড়াডুবি ঘটে। তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় ধর্মীয় আবেগভিত্তিক ন্যারেটিভ-আমাদের ভোট দিলে জান্নাত’ মিলবে বলে প্রচারণা চালায়। অন্যদিকে বট বাহিনী বিএনপি’র বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্রদেরও টার্গেট করে ব্যপক প্রচারণা চালায়। স্বতন্ত্র যারা বিএনপি’র বিরুদ্ধে বলেছে বট বাহিনী তাদের বক্তব্য সাইবার দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছে। এদিকে এই বট বাহিনী হিন্দু ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। বিশেষ করে বিএনপির প্রার্থীদের যেনো হিন্দ্র সম্প্রদায় যেনো ভোট না দেওয়া সেজন্য সাইবার দুনিয়াকে বট বাহিনী চরমভাবে ব্যবহার করে। তারা প্রচার চালায় বিএনপি একটি হিন্দু বিদ্বেষী দল। জামায়াত ক্ষমতায় আসছে এবং বাংলাদেশে তারাই হিন্দুদের শান্তিতে রাখবে। 

‘চাদাবাজ-দখলবাজ-দুর্নীতি’ কে ইস্যু 

বট বাহিনী বিএনপির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালি প্রচারণা চালায় যে দলটি ক্ষমতায় এলেই সারাদেশে চাদাবাজ মরিয়া হয়ে উঠবে। বিশেষ করে রাজধানী প্রতিটি হকারকে তারা এই বার্তা দিয়ে দেয় যে বিএনপি ক্ষমতায় এলেই চাদাবাজ মারাত্মকভাবে তাদের তৎপরতা বাড়িয়ে দেবে। পরিবহণ সেক্টরের মালিক শ্রমিকদের বট বাহিনী নানান পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানায় যে বিএনপি ক্ষমতায় আসা মানে এই সেক্টর চাঁদাবাজ জেকে বসা। একথা ঠিক যে অতীতে বিভিন্ন সময়ে যখনই বিএনপি ক্ষমতায় এসেছিল তখন দলটির বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি চাদাবাজির অভিযোগ হজম করতে হয়েছে। তাই বট বাহিনী দেশের জনগণের মধ্যে আতঙ্ক বা মিথ তৈরি করে যে বিএনপি ক্ষমতায় এলে সর্বক্ষেত্রে চাদাবাজ, দুর্নীতি ছেয়ে যাবে। তাই বিএনপি ক্ষমতায় এলে চাদাবাজ-দখলবাজ-দুর্নীতি বাড়বে বলে বট বাহিনী সাইবার জনগত প্রচারণা চালায়। 

তারেক রহমান যেভাবে ঠেকিয়ে দিল বট বাহিনীকে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সর্বস্তরের জনগণ যেনো ভোট দিতে কেন্দ্রে পা না বাড়ায় সেজন্য তৎপর ছিল জামায়াতের নেতৃত্বধীন এই বট বাহিনী। তারা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবি উঠার পর থেকেই বিএনপির বিরুদ্ধে নানান ধরনের অপপ্রচার চালিয়ে একে আরও পরে টেনে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তৎপর ছিল। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর থেকে এই নির্বাচন হচ্ছে না, হলেও তা নিরপেক্ষ হবে না কিংবা ভোট কেন্দ্রে মারাত্মক সহিংসতা হবে...ইত্যাদি নেতিবাচক প্রচারণা চালায়। রাজনীতির মাঠে ক্রমেই দাপট বাড়ানো এই বট বাহিনী ঠিক জাতীয় নির্বাচনে ভোট গ্রহণের দিনেও হুমড়ি খেয়ে পড়ে যেনো ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে না উপস্থিত হয়। কারণ তারা বুঝতে পেরেছিল যে ভোট কেন্দ্রে উপস্থিতি কম করতে পারলেই জামায়াতের লাভ। 

তারেকের আহবানে লন্ডভন্ড বটবাহিনী

কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন অথ্যাৎ ১২ ফেব্রুয়ারিতে ভোটের দিন যখন বেলা বারোটা-ও যখন দেশের প্রায় অনেক ভোট কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কম হচ্ছিল তখন বিষয়টির নজরে পড়ে বিএনপি’র হাইকমান্ডের। আর একারণেই যারা এখনো ভোট দেননি, তাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিএনপির চেয়ারপারসনের কন্ঠ গর্জে উঠে। এই সময় (গত বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টের মাধ্যমে তিনি আহবান জানান ভোট কেন্দ্রে ভোট দিতে সকলকে উপস্থিত হতে। তারেক রহমান লেখেন, গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আজকের এই নির্বাচন। যারা এরই মধ্যে ভোট প্রদান করে নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেছেন, তাদের সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। তিনি আরও লেখেন, যারা এখনো ভোট দেননি অনুরোধ রইলো-সময়ের মধ্যে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে আপনার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিন। আপনার একটি সচেতন ও দায়িত্বশীল ভোটই দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। খোঁজ নিয়ে জানা গেলো তারেক রহমানের ওই আহবানের পরপরই দলমত নির্বিশেষে কারো কারো মতে, মুক্তিযুদ্ধে স্বপক্ষের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ায় বিশ্বাসীরা ভোট কেন্দ্রে নিজের ভোট ছুটে যায়। কারো কারো ধারণা এই সময়েই মুক্তিযুদ্ধে স্বপক্ষের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ায় বিশ্বাসীদের ভোট বিএনপির পক্ষে চলে যায়। 

ফলাফলের দিনও থেমে ছিল না বট বাহিনী

এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণ শেষ হয়ে গেলো এই বট বাহিনীর তৎপরতা চলতে থাকে। তারা পুরো সাইবার জগতের প্রায় প্রতিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখাতে শুরু করে যে জামায়াত প্রতিটি কেন্দ্রেই ভোটে বিএনপির চেয়ে এগিয়ে আছে। তারা আসলে ওই সময়ে ঘোষিত ফলাফলে যে সব কেন্দ্রে জামায়াত প্রার্থী এগিয়ে ছিল সেগুলোকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রাধান্য দিয়ে তুলে ধরে। প্রচারণা চালাতে থাকে যে বিএনপি নয় প্রতিটি আসনেই জামায়াত প্রার্থী এগিয়ে আছে। প্রচারণা এমন পর্যায়ে যায় নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার রাত ১২টা ২৪ মিনিট পর্যন্ত জামায়াতের ফেসবুক পেজে দেখা যায়, ১১ দলীয় জোট পেয়েছে ৮০ আসন এবং বিএনপি পেয়েছে ৭৭টি আসন।

শেষ কথা

অবশেষে নানান ধরনের নেতিবাচক প্রচারণাকে পুঁজি করে বট বাহিনী বিএনপি বিজয় ঠেকাতে পারেনি। বিএনপির ভূমিধবস বিজয় ঠেকাতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে জামায়াত সমর্থিত লাখ লাখ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীকে পুঁজি করে বট বাহিনী দলটির ব্যাপারে নেতিবাচক অবস্থান দাঁড় করিয়েছে। আর নিজেরা মাঝখান থেকে বিপুর পরিমাণ অর্থ বাগিয়ে সরে পড়েছে। যা এখন দলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। অথচ নেতিবাচক প্রচারণা চালানোর সময় বট বাহিনী নিয়ে মূল দলের নেতারা বেশ উচ্ছ্বসিত ছিল। তারা সরাসরি এই বাহিনীকে নিয়ে গর্ববোধ করা শুরু করে। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন, বিএনপি যদি তার দলের লোকদেরকে অতীতের মতো চাদাবাজ, দুর্নীতি, দখলবাজ, স্বজনপ্রীতিকে প্রশয় দেয় কিংবা সব জায়গায় ‘আমার লোক’ বসাতে মরিয়া হয়ে উঠে-সেক্ষেত্রে সামনের দিনে এই বট বাহিনীর প্রচারণাকে বুকে টেনে নেবে বাংলাদেশের জনগণ।

শেয়ার করুন