১০ জুন ২০২৬, বুধবার, ০২:৫৭:০৫ অপরাহ্ন


প্রস্তাবিত জুয়া ও বেটিং আইনের কয়েকটি ধারা পুনর্বিবেচনা চায় এইচআরএফবি
বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট করা হয়েছে : ১০-০৬-২০২৬
প্রস্তাবিত জুয়া ও বেটিং আইনের কয়েকটি ধারা পুনর্বিবেচনা চায় এইচআরএফবি


দেশে অনলাইন ও অফলাইন জুয়া ও বেটিং সংশ্লিষ্ট অপরাধ প্রতিরোধের লক্ষ্যে সরকারের বিশেষ আইন প্রণয়নের উদ্যোগকে হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ (এইচআরএফবি) নীতিগতভাবে স্বাগত জানাচ্ছে। সেইসাথে প্রস্তাবিত আইনের কয়েকটি ধারা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। এইচআরএফবি মনে করে, অপরাধ দমনের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে প্রণীত কোনো আইন এমন হওয়া উচিত নয়, যা ভবিষ্যতে নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার, ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা এবং বিচারিক সুরক্ষাকে সংকীর্ণ করার ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। 

বেটিং এবং জুয়া প্রতিরোধ আইন (অনলাইন ও অফলাইন), ২০২৬ এর খসড়া পর্যালোচনায় এইচআরএফবি লক্ষ্য করছে যে, প্রস্তাবিত ৩৯(১) ও ৩৯(২) ধারায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কেবলমাত্র ‘বিশ্বাস’ বা “সন্দেহের” ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তির ডিজিটাল ডিভাইসে প্রবেশ, তল্লাশি, তথ্য সংগ্রহ, জব্দ এবং গ্রেফতারের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এসব ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিচারিক অনুমোদন, স্বাধীন তদারকি এবং কার্যকর জবাবদিহিতার পর্যাপ্ত সুরক্ষা অনুপস্থিত থাকায়, নজরদারীভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গঠনের আশংকা তৈরি করে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭, ৩১, ৩২, ৩৩, ৩৯ ও ৪৩ অনুচ্ছেদ নাগরিকের সমতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, গ্রেফতার -সংক্রান্ত অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সুরক্ষা নিশ্চিত করে। ফলে কোনো ব্যক্তির ডিজিটাল ডিভাইস বা ব্যক্তিগত তথ্যে প্রবেশের ক্ষমতা অবশ্যই সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া আবশ্যক। এইচআরএফবি আরও লক্ষ্য করছে যে, খসড়া আইনের ৩৪ ধারায় অভিযোগ দায়ের, তদন্ত ও বিচার-সংক্রান্ত বিধানে এবং ৩৯ ধারায় প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেফতার-সংক্রান্ত ধারাগুলোতে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ও সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা হিসেবে পরিচিত ডিজিএফআইকে অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বিশেষত “ফৌজদারি কার্যবিধিতে যাহা কিছুই থাকুক না কেন” ধরনের বিধানের মাধ্যমে বিশেষ ক্ষমতা প্রদানের উদ্যোগ গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে। অতীতে এ সকল সংস্থার কার্যক্রম নিয়ে গুম, নির্যাতন ও অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, জনপরিসরে বিস্তৃত বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে যথাযথ বিচারিক তদারকি ও জবাবদিহিতা ছাড়া অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রদান জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে। 

খসড়া আইনটিতে উদ্বেগের আরেকটি বিষয় হলো, খসড়া আইনের ৩৬ ধারায় মোবাইল কোর্টকে যে ধরনের ক্ষমতা প্রদানের প্রস্তাব দেখা যাচ্ছে, তা যথাযথ পর্যালোচনার দাবি রাখে। মোবাইল কোর্ট দ্রুত প্রতিকার প্রদানের একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা হলেও এটি পূর্ণাঙ্গ বিচারিক প্রক্রিয়ার বিকল্প নয়। ফলে এমন কোনো বিধান রাখা সমীচীন হবে না, যা বিচারিক সুরক্ষা দুর্বল করে বা অভিযুক্ত ব্যক্তির ন্যায্য শুনানির অধিকারকে সীমিত করে। অতীতে মোবাইল কোর্টের ক্ষমতা প্রয়োগ ও সীমা নিয়ে আদালত, আইনজ্ঞ ও নাগরিক সমাজে আলোচনা ও বিচারিক পর্যবেক্ষণ রয়েছে। তাই নতুন কোনো আইনে মোবাইল কোর্টকে এমন ক্ষমতা দেওয়া সমীচীন হবে না, যা বিচারিক পর্যালোচনা ছাড়াই নাগরিকের স্বাধীনতা সীমিত করার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

এইচআরএফবি মনে করে, জুয়া ও বেটিং নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত আইনটি অবশ্যই প্রয়োজন; কিন্তু আইনের লক্ষ্য অর্জনের জন্য এমন কোনোধারা প্রণয়ন করা উচিত নয়, যা ব্যাপক নজরদারি, ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি সৃষ্টি করে। অপরাধ দমন ও মানবাধিকার সুরক্ষা পরস্পরবিরোধী নয়; বরং আইনের শাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং বিচারিক তদারকির মাধ্যমেই উভয় লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করা সম্ভব।

এইচআরএফবি সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে, খসড়া আইনটি জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের আগে উদ্বেগজনক ধারাসমূহ পুনর্বিবেচনার মাধ্যমে সংশোধন বা প্রয়োজনে বাতিল করা হোক। তার পাশাপাশি, আইনবিদ, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, গণমাধ্যম প্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণে উন্মুক্ত পর্যালোচনার মাধ্যমে আইনটিকে সংবিধান, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা এবং মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার দাবি জানাচ্ছে এইচআরএফবি। বিবৃতি স্বাক্ষরকারীরা হলেন হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ এর সদস্যবৃন্দ ড. হামিদা হোসেন, এক্সপার্ট, এইচআরএফবি। অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, এক্সপার্ট, এইচআরএফবি, রাজা দেবাশীষ রায়, এক্সপার্ট, এইচআরএফবি, অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না, চেয়ারপারসন, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), তাহমিনা রহমান, নির্বাহী পরিচালক, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং আহবায়ক, এইচআরএফবি শাহীন আনাম, স্টিয়ারিং কমিটি সদস্য-এইচআরএফবি, এবং নির্বাহী পরিচালক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, জাকির হোসেন, স্টিয়ারিং কমিটি সদস্য-এইচআরএফবি এবং প্রধান নির্বাগরিক উদ্যোগ, সারা হোসেন, স্টিয়ারিং কমিটি সদস্য-এইচআরএফবি এবং অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), রঞ্জন কর্মকার, স্টিয়ারিং কমিটি সদস্য-এইচআরএফবি এবং নির্বাহী পরিচালক, স্টেপস টুয়ার্ডস ডেভেলপমেন্ট (স্টেপস), সালেহ আহমেদ, স্টিয়ারিং কমিটি সদস্য-এইচআরএফবি এবং নির্বাহী পরিচালক, বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি, সঞ্জীব দ্রং, স্টিয়ারিং কমিটি সদস্য-এইচআরএফবি এবং সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, ড. ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি), সদস্য, এইচআরএফবি, ডা. ফওজিয়া মোসলেম, সভানেত্রী, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ (বিএমপি), সদস্য, এইচআরএফবি, শামসুল হুদা, নির্বাহী পরিচালক, অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্মস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি), সদস্য, এইচআরএফবি, খুশী কবির, সমন্বয়ক, নিজরা করি, সদস্য, এইচআরএফবি, সরদার জাহাঙ্গীর হোসেন, নির্বাহী পরিচালক, এসিড সারভাইভার্স ফাউন্ডেশন (এএসএফ), সদস্য, এইচআরএফবি প্রমুখ। 

শেয়ার করুন