১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রবিবার, ০২:১২:৪০ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
আসুন এবার রাষ্ট্রকে আমরা পুনর্গঠন করি - প্রধানমন্ত্রী ‘মাননীয়’ শব্দ ব্যবহার না করার সূচনা নিজেই শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান টেক্সাসে বিতর্কিত নতুন পাঠ্যক্রম অনুমোদনে মুসলিমদের ক্ষোভ ঘুষ নিয়ে নাগরিকত্ব, সাবেক ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা লুকম্যান ও ওলাবি গ্রেফতার জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে তারেক-ট্রাম্পের বৈঠকের সম্ভাবনা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিলেন ড. খলিলুর রহমান সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও স্ত্রীর সম্পদের বিষয়ে এফবিআইয়ের প্রতিবেদন দুদকে তারেকের কূটনৈতিক চালে ধরাশায়ী হাসিনা মুসলিম বিদ্বেষে কিশোর আলী হত্যায় মায়ার্সকে ২৫ বছরের কারাদণ্ড অক্টোবরে বাড়ছে স্ন্যাপ সুবিধা ও আয়সীমা


এক ফোটা রক্তেই মিলবে ৫০ ধরনের ক্যানসারের ইঙ্গিত
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৪-০৬-২০২৬
এক ফোটা রক্তেই মিলবে ৫০ ধরনের ক্যানসারের ইঙ্গিত মাল্টি-ক্যানসার শনাক্তকরণ রক্ত পরীক্ষা


ক্যানসার শনাক্তকরণে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে রয়েছে চিকিৎসাবিজ্ঞান। গবেষক ও চিকিৎসকদের মতে, শিগগিরই এমন একটি রক্ত পরীক্ষা ব্যাপকভাবে চালু হতে পারে যা একবারেই প্রায় ৫০ ধরনের ক্যানসারের সম্ভাব্য উপস্থিতি শনাক্ত করতে সক্ষম হবে। প্রযুক্তিটি সফলভাবে অনুমোদন পেলে ক্যানসার স্ক্রিনিং ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি ঘটতে পারে।বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে স্তন, কোলন, সার্ভিক্যাল, প্রোস্টেট এবং ফুসফুস-এই পাঁচ ধরনের ক্যানসারের জন্য আলাদা আলাদা স্ক্রিনিং পরীক্ষা প্রচলিত রয়েছে। কারও ম্যামোগ্রাম, কারও কোলনোস্কোপি, আবার কারও সিটি স্ক্যানের প্রয়োজন হয়। কিন্তু নতুন প্রজন্মের মাল্টি-ক্যানসার আর্লি ডিটেকশন (এমসিইডি) প্রযুক্তি একটি মাত্র রক্তের নমুনা থেকে একসঙ্গে বহু ধরনের ক্যানসারের সংকেত শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি করেছে।

এই প্রযুক্তির সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হলো ”গ্যালেরি” নামের একটি রক্ত পরীক্ষা, যা উদ্ভাবন করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বায়োটেক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্রেইল, ইনকরপোরেটেড। কোম্পানিটি বহু বছর ধরে ক্যানসারের ডিএনএ ও অন্যান্য জৈবিক সংকেত শনাক্ত করার প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করছে। বর্তমানে মার্কিন ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) গ্যালেরিকে “ব্রেকথ্রু ডিভাইস” হিসেবে মূল্যায়ন করছে। চলতি বছরের মধ্যেই পরীক্ষাটির পূর্ণ অনুমোদন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

বর্তমানে গ্যালেরি পরীক্ষাটি এফডিএর ব্রেকথ্রু ডিভাইস কর্মসূচির আওতায় পর্যালোচনাধীন রয়েছে। এফডিএ এখনও পরীক্ষাটিকে পূর্ণ অনুমোদন দেয়নি, তবে সংস্থাটি এর নিরাপত্তা, নির্ভুলতা ও কার্যকারিতা মূল্যায়ন করছে। অনুমোদন পেলে এটি হবে প্রথম দিকের মাল্টি-ক্যানসার শনাক্তকরণ রক্ত পরীক্ষাগুলোর একটি, যা বৃহৎ পরিসরে ব্যবহারের পথ খুলে দিতে পারে।

গ্যালেরি পরীক্ষাটি রক্তে ভাসমান ক্যানসার-সংশ্লিষ্ট ডিএনএ খণ্ড এবং অন্যান্য জৈবিক চিহ্ন শনাক্ত করতে সক্ষম। তবে এটি সরাসরি ক্যানসার নির্ণয় করে না। বরং পরীক্ষাটি চিকিৎসকদের জানায় শরীরের কোন অংশে ক্যানসারের সম্ভাব্য উৎস থাকতে পারে। এরপর স্ক্যান, বায়োপসি বা অন্যান্য পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় নিশ্চিত করা হয়।

গ্যালেরির পাশাপাশি এক্স্যাক্ট সায়েন্সেস কোম্পানি ,ক্যানসারগার্ড নামে আরেকটি মাল্টি-ক্যানসার শনাক্তকরণ রক্ত পরীক্ষা উন্নয়ন করছে। উভয় প্রযুক্তিই ভবিষ্যতের ক্যানসার স্ক্রিনিং ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে। বর্তমানে গ্যালেরি পরীক্ষার খুচরা মূল্য প্রায় ৯৫০ ডলার, আর ক্যানসারগার্ডের মূল্য ৬৫৯ ডলার। তবে এই পরীক্ষাগুলোকে স্বাস্থ্যবিমার আওতায় আনতে এফডিএর পূর্ণ অনুমোদন প্রয়োজন। এদিকে মার্কিন কংগ্রেস ইতোমধ্যে আইন পাস করেছে, যার ফলে অনুমোদন পাওয়ার পর ২০২৮ সাল থেকে মেডিকেয়ার এই ধরনের মাল্টি-ক্যানসার শনাক্তকরণ পরীক্ষার খরচ বহন করতে পারবে।

গ্যালেরির কার্যকারিতা মূল্যায়নের জন্য গ্রেইল বৃহৎ পরিসরে গবেষণা পরিচালনা করছে। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস)-এর সহযোগিতায় ১ লাখ ৪২ হাজারেরও বেশি মানুষের ওপর একটি গবেষণা চলছে। পাশাপাশি উত্তর আমেরিকায় ৩৫ হাজার মানুষের অংশগ্রহণে পাথফাইন্ডার-২ নামে আরেকটি গবেষণাও পরিচালিত হচ্ছে। যদিও যুক্তরাজ্যের গবেষণাটি একটি প্রধান লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি, তবুও সাম্প্রতিক ফলাফলে আশাব্যঞ্জক তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণার তৃতীয় বছরে স্টেজ-৪ ক্যানসারের হার প্রায় ২৬ শতাংশ কমে এসেছে। বিশেষ করে অগ্ন্যাশয়, লিভার, ফুসফুস ও পাকস্থলীর মতো মারাত্মক ক্যানসারের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।

তবে গ্যালেরি বা এ ধরনের অন্য কোনো রক্ত পরীক্ষা বর্তমানে প্রচলিত ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের বিকল্প নয়। ম্যামোগ্রাম, কোলনোস্কোপি, প্যাপ স্মিয়ার বা ফুসফুসের স্ক্যানের মতো পরীক্ষাগুলো চালু থাকবে। নতুন প্রযুক্তি এসব পরীক্ষার পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে এবং এমন অনেক ক্যানসার শনাক্ত করতে সহায়তা করতে পারে, যেগুলোর জন্য বর্তমানে কোনো নিয়মিত স্ক্রিনিং ব্যবস্থা নেই।

আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটির প্রধান রোগী কর্মকর্তা ডা. আরিফ কামালের ভাষায়, একটি সাধারণ রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে যদি বহু ক্যানসারের প্রাথমিক সংকেত শনাক্ত করা যায়, তাহলে ক্যানসার স্ক্রিনিং আরও সহজ, সাশ্রয়ী এবং অধিক মানুষের নাগালের মধ্যে চলে আসবে।

ইতোমধ্যে ‘লিকুইড বায়োপসি’ নামে পরিচিত অনুরূপ রক্ত পরীক্ষাগুলো ক্যানসার চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। চিকিৎসকেরা এসব পরীক্ষার মাধ্যমে রোগীর চিকিৎসা কতটা কার্যকর হচ্ছে, ক্যানসার পুনরায় ফিরে আসছে কি না এবং ক্যানসারের জিনগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাচ্ছেন।

ক্যানসারকে স্টেজ-৪ এ পৌঁছানোর আগেই শনাক্ত করা গেলে রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। গত এক দশকে ইমিউনোথেরাপি, লক্ষ্যভিত্তিক ওষুধ এবং অন্যান্য আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির অগ্রগতির ফলে স্টেজ-৩ ক্যানসারও অনেক ক্ষেত্রে সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ বা নিরাময় করা সম্ভব হচ্ছে।

ফলে এক ফোঁটা রক্তের মাধ্যমে একসঙ্গে বহু ধরনের ক্যানসার শনাক্ত করার এই প্রযুক্তি আগামী কয়েক বছরে ক্যানসার প্রতিরোধ, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। গ্যালেরি পরীক্ষার বিষয়ে এফডিএর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

শেয়ার করুন