উল্টোদিক থেকে আসা গাড়ির সংঘর্ষে বাংলাদেশি মা-মেয়ে নিহত হয়েছেন, (ইনসেটে) ঘাতক ড্রাইভার
মেরিল্যান্ডের মন্টগোমেরি কাউন্টিতে ইন্টারস্টেট ২৭০ মহাসড়কে উল্টো পথে আসা একটি গাড়ির সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রবাসী বাংলাদেশি ফারুক হোসেনের সহধর্মিণী মুসাম্মাত শামীমা বেগম (৪৬) ও তাদের ২৩ বছর বয়সী মেয়ে আরিবা জাহিন নিহত হয়েছেন। গত ২৯ আগস্ট সন্ধ্যায় বেথেসডার কাছে মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনায় ৬২ বছর বয়সী ফারুক হোসেন ও তার ৯ বছর বয়সী মেয়ে রুবাইয়া গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। গত ৩১ আগস্ট মরহুমা শামীমা বেগম ও তার মেয়ে আরিবার জানাজা শেষে ভার্জিনিয়া মুসলিম কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। পুলিশ হোসে কাবায়েরো নোলাসকোকে (৩২) গ্রেফতার করেছে।
মেরিল্যান্ড স্টেট পুলিশ (এমএসপি) জানিয়েছে, শামীমা বেগম ও আরিবা ভার্জিনিয়ার বার্ক ও আলেকজান্দ্রিয়া এলাকায় বসবাস করতেন। দুর্ঘটনার সময় তারা একটি টয়োটা ক্যামরিতে ছিলেন। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, উল্টো পথে আসা একটি ফোর্ড মুস্তাং তাদের গাড়ির সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সন্ধ্যা ৬টা ৪৬ মিনিটের দিকে ডেমোক্রেসি বুলেভার্ডের ঠিক দক্ষিণে ইন্টারস্টেট ২৭০-এর দক্ষিণমুখী লেনে দুর্ঘটনাটি ঘটে। খবর পেয়ে রকভিল ব্যারাকের পুলিশ সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার ও তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেন।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, জার্মানটাউনের বাসিন্দা হোসে কাবায়েরো নোলাসকো (৩২) একটি ফোর্ড মুস্তাং নিয়ে মহাসড়কের ভুল পথে চলে যান। তিনি উত্তরমুখী লেনের পরিবর্তে দক্ষিণমুখী লেনে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। একপর্যায়ে তার গাড়ি দক্ষিণমুখী পথে চলা টয়োটা ক্যামরির সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এতে শামীমা বেগম ও আরিবা নিহত হন। দুর্ঘটনায় ফোর্ড মুস্তাংয়ের চালক নোলাসকোও আহত হন। তাকে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসা দেওয়া হয়। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তাকে গ্রেফতার করে মন্টগোমেরি কাউন্টি ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হয়েছে।
মা এবং মেয়ের নামাজে জানাজা গত ৩১ আগস্ট বাদ জোহর মেরিল্যান্ড মুসলিম সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয়। নামাজে জানাজা শেষে মা ও মেয়ের লাশ ভার্জিনিয়া মুসলিম গোরস্তানে দাফন করা হয়। মা এবং মেয়েকে পাশাপাশি কবরে দাফন করা হয়।
উল্লেখ্য, তাদের দেশের বাড়ি বরগুনা। সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, আহত ছোট মেয়ের জ্ঞান ফিরেছে এবং তার বাবাকে দেখতে চেয়েছে।
তদন্তে নতুন তথ্য
দুর্ঘটনার তদন্তে নতুন কিছু তথ্য সামনে এসেছে। আদালতের নথি অনুযায়ী, দুর্ঘটনার কয়েক মিনিট আগেই ইন্টারস্টেট ২৭০ মহাসড়কে একটি গাড়ি উল্টো পথে চলার বিষয়ে ৯১১-এ ফোন করে সতর্ক করা হয়েছিল।
পরে তদন্তকারীরা অভিযুক্ত নোলাসকোর ফোর্ড মুস্তাংয়ে বেশ কয়েকটি বিয়ারের ক্যান পান। কিছু ক্যান খালি এবং কিছু পূর্ণ ছিল বলে আদালতের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। দুর্ঘটনার পর নোলাসকোর মধ্যে অ্যালকোহলের গন্ধ, চোখ লাল এবং কথা জড়িয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা গিয়েছিল বলেও তদন্ত-সংক্রান্ত নথিতে উল্লেখ রয়েছে। পুলিশ অভিযোগ করেছে, অ্যালকোহলের প্রভাবে থাকা নোলাসকোর অবস্থাই দুর্ঘটনায় ভূমিকা রাখতে পারে।
অভিযুক্তের বিরুদ্ধে পাঁচটি গুরুতর অভিযোগ
মেরিল্যান্ড স্টেট পুলিশ অভিযুক্ত হোসে আন্তোনিও কাবায়েরো-নোলাসকোর বিরুদ্ধে মোট পাঁচটি গুরুতর অভিযোগ দায়ের করেছে। এর মধ্যে রয়েছে দুইটি গ্রস নেগলিজেন্ট ম্যানস্লটার, অ্যালকোহলের প্রভাবে মোটরযান চালিয়ে হত্যার দুটি অভিযোগ এবং মোটরযানের মাধ্যমে জীবন-হুমকির মতো আঘাতের একটি অভিযোগ। শামীমা বেগম ও আরিবা জাহিনের মৃত্যুর ঘটনায় নোলাসকোর বিরুদ্ধে দুটি পৃথক গ্রস নেগলিজেন্ট ম্যানসøটার অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব অভিযোগে গুরুতর অবহেলা ও বেপরোয়া গাড়ি চালানোর মাধ্যমে তাদের মৃত্যুর জন্য নোলাসকোকে দায়ী করা হয়েছে।
এছাড়া দুই নিহতের প্রত্যেকের মৃত্যুর জন্য পৃথকভাবে অ্যালকোহলের প্রভাবে মোটরযান চালিয়ে হত্যার দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা, অ্যালকোহলের কারণে নোলাসকোর গাড়ি চালানোর সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে। দুর্ঘটনার পর তার শরীর থেকে অ্যালকোহলের গন্ধ পাওয়া, চোখ লাল থাকা এবং কথা জড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি আদালত-সংক্রান্ত নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তার গাড়িতে খালি ও পূর্ণ বিয়ারের ক্যানও পাওয়া গেছে বলে তদন্ত নথিতে বলা হয়েছে।
পঞ্চম অভিযোগটি হলো মোটরযানের মাধ্যমে জীবন-হুমকির মতো আঘাত। দুর্ঘটনায় টয়োটা ক্যামরিতে থাকা ফারুক হোসেন ও তার ৯ বছর বয়সী মেয়ে রুবাইয়া গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় এই অভিযোগ আনা হয়েছে।
দোয়া চাইলেন আনোয়ারুল ইসলাম আনোয়ার
যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল ইসলাম আনোয়ার তার বন্ধু ফারুক হোসেন ও তার ছোট মেয়ে রুবাইয়ার গুরুতর আহত হওয়ার কথা জানিয়ে সকল প্রবাসী বাংলাদেশির কাছে তাদের জন্য দোয়া চেয়েছেন। তিনি জানান, ফারুক ভাইয়ের বুকের পাঁজরের সাতটি হাড় ভেঙে গেছে। অন্যদিকে তার ছোট মেয়ে রুবাইয়া মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে এখনো নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রয়েছে।
আনোয়ারুল ইসলাম আনোয়ার প্রবাসী বাংলাদেশিসহ সবার কাছে এই পরিবারের জন্য দোয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আল্লাহ যেন চিকিৎসাধীন ফারুক হোসেন ও রুবাইয়াকে দ্রুত সুস্থ করে তাদের স্বজনদের মাঝে ফিরিয়ে দেন। তিনি ফারুক হোসেন ও রুবাইয়ার দ্রুত আরোগ্য কামনা করে সবার কাছে আন্তরিকভাবে দোয়া প্রার্থনা করেন।
এদিকে মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনায় মা-মেয়ের মৃত্যুতে ভার্জিনিয়ার বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাদের জানাজা ও দাফনে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি অংশ নেন।