১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ০৫:০৩:১৪ অপরাহ্ন
শিরোনাম :


অপরাধী নয়, সাধারণ অভিবাসীরাও টার্গেটে
ট্রাম্প প্রশাসনের গণগ্রেফতারে নতুন চিত্র
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ১০-০৯-২০২৬
ট্রাম্প প্রশাসনের গণগ্রেফতারে নতুন চিত্র ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি


প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের গণঅভিবাসন বহিষ্কার কর্মসূচি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে শুধু অপরাধমূলক রেকর্ডধারী অভিবাসীরাই নয়, কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া হাজার হাজার মানুষও ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা আইসিইয়ের ধরপাকড়ের আওতায় পড়ছেন। সরকারি তথ্য এবং অভিবাসন এনফোর্সমেন্টের তথ্য বিশ্লেষণকারী ডিপোর্টেশন ডেটা প্রজেক্টের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে আইসিই ৪৯ হাজার ৫৭১ জনকে গ্রেফতার করে। আগস্টে সেই সংখ্যা আরো বেড়ে ৫০ হাজার ৯২৫ জনে পৌঁছে। অর্থাৎ মাত্র দুই মাসে প্রায় এক লাখ মানুষ আইসিইয়ের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই গ্রেফতার বৃদ্ধির সঙ্গে প্রশাসনের সবচেয়ে বিপজ্জনক অপরাধীদের টার্গেট করার বক্তব্যের মধ্যে ক্রমেই বড় ব্যবধান দেখা যাচ্ছে। ডিপোর্টেশন ডেটা প্রজেক্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জুলাইয়ে আইসিইয়ের গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের একটি বড় অংশের কোনো পূর্ববর্তী অপরাধমূলক রেকর্ড ছিল না। ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, জুলাইয়ে গ্রেফতার হওয়া অর্ধেকের বেশি মানুষের কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড ছিল না।

এখানেই তদন্তের মূল প্রশ্নটি সামনে আসে প্রশাসন যখন প্রকাশ্যে অপরাধীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলছে, তখন কেন অপরাধমূলক রেকর্ড না থাকা মানুষের গ্রেফতার এতো দ্রুত বাড়ছে? অভিবাসন বিশ্লেষকদের মতে, আইসের কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। আগে বড় শহরে প্রকাশ্য ও ব্যাপক অভিযান বেশি নজরে এলেও এখন গ্রেফতার হচ্ছে অনেক বেশি নীরব ও ছড়ানো পদ্ধতিতে আইস অফিসে বাধ্যতামূলক চেকইনের সময়, আদালতে হাজিরার পর, ট্রাফিক স্টপে, বাড়ির বাইরে এবং বিমানবন্দরে।

এ কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সরকার যাদের পরিচয়, ঠিকানা ও অভিবাসন-সংক্রান্ত তথ্য আগে থেকেই জানে, তাদের শনাক্ত করা তুলনামূলকভাবে সহজ। ফলে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী, নিয়মিত আইসিইতে রিপোর্ট করা অথবা আশ্রয় ও স্ট্যাটাস পরিবর্তনের আবেদন নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তিরাও হঠাৎ করে গ্রেফতারের ঝুঁকিতে পড়ছেন বলে অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন। ডিপোর্টেশন ডেটা প্রজেক্ট সরকারি নথি ও তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে এ প্রবণতা তুলে ধরেছে।

অভিবাসন আটককেন্দ্রের সামগ্রিক চিত্রও একই ধরনের প্রশ্ন তৈরি করছে। ট্রানজেকশনাল রেকর্ডস অ্যাকসেস ক্লিয়ারিং হাউস বা ট্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে আইসিই হেফাজতে থাকা প্রায় ৬৫ হাজার ৭৬৫ জনের মধ্যে ৪৬ হাজারের বেশি ব্যক্তির কোনো ক্রিমিনাল কনভিকশন বা অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রেকর্ড ছিল না। তবে কোনো ক্রিমিনাল কনভিকশন না থাকা এবং কখনো কোনো অভিযোগ বা আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত যোগাযোগ না থাকা একই বিষয় নয় এ দুটি পরিসংখ্যানকে তাই আলাদাভাবে দেখা জরুরি।

প্রশাসনের বক্তব্য অবশ্য ভিন্ন। ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বা ডিএইচএস এবং আইস বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইন ভঙ্গকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া তাদের আইনগত দায়িত্ব। ডিএইচএসের সর্বশেষ হিসাবে আগস্টে আইসিই ৫০ হাজার ৯২৫ জনকে গ্রেফতার করেছে। প্রশাসনের দাবি, অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকারীদের বিরুদ্ধে এনফোর্সমেন্ট জোরদার করার লক্ষ্যেই আইসিইয়ের কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে।

কিন্তু প্রশাসনের বক্তব্যের সঙ্গে প্রকাশিত তথ্যের ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আইস গ্রেফতারকারীদের বড় অংশকে ক্রিমিনাল রেকর্ডধারী হিসেবে তুলে ধরা হলেও সাম্প্রতিক ডেটা বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, নন-ক্রিমিনাল বা কোনো ক্রিমিনাল কনভিকশন না থাকা ব্যক্তিদের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্ডার জার টম হোম্যানও এর আগে স্বীকার করেছেন যে আইসের গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের প্রায় অর্ধেকের কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড নেই।

অভিবাসন নীতির এই পরিবর্তন নিয়ে রিপাবলিকান দলের মধ্যেও কিছু আইনপ্রণেতা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ফ্লোরিডার কংগ্রেসম্যান মারিয়া এলভিরা সালাজার অপরাধী এবং দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করে আসা সাধারণ অভিবাসীদের একইভাবে বিবেচনা না করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি নির্মাণ, কৃষি, আতিথেয়তা, স্বাস্থ্যসেবা ও উৎপাদন খাতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা অভিবাসীদের অর্থনৈতিক অবদানের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। ফ্লোরিডার আরেক রিপাবলিকান প্রতিনিধি মারিও দিয়াজ-বালার্ট সীমান্ত নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও কিছু এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রমকে অতিরিক্ত কঠোর বলে মন্তব্য করেছেন।

নিউইয়র্কেও এ পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত ২৭ জুলাই থেকে ২৯ আগস্ট পর্যন্ত অপারেশন রটেন অ্যাপল নামে পরিচালিত এক মাসব্যাপী অভিযানে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে প্রায় ২ হাজার ২০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের একটি বড় অংশের কোনো পূর্ববর্তী ক্রিমিনাল রেকর্ড ছিল না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গ্রেফতার এবং চূড়ান্ত বহিষ্কার একই বিষয় নয়। একজন অভিবাসীকে আইসিই গ্রেফতার করলেই তিনি সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কৃত হন না। অনেকের ক্ষেত্রে ইমিগ্রেশন কোর্টে মামলা চলতে থাকে, কেউ রিমুভাল অর্ডারের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই করেন, আবার কেউ আশ্রয় বা অন্য কোনো আইনি সুরক্ষার আবেদন করেন। ফলে গ্রেফতারের সংখ্যা বাড়া এবং বাস্তবে কতজনকে শেষ পর্যন্ত বহিষ্কার করা হচ্ছে, এ দুই সূচক আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি।

তবে সামগ্রিক প্রবণতাটি স্পষ্ট। ট্রাম্প প্রশাসন ২০২৬ সালে আইস এনফোর্সমেন্টের পরিধি দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে এবং অপরাধমূলক রেকর্ড না থাকা অভিবাসীরাও এ অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছেন। জুলাই ও আগস্টে বিপুলসংখ্যক গ্রেফতার, আটককেন্দ্রে কোনো ক্রিমিনাল কনভিকশন না থাকা ব্যক্তিদের বড় উপস্থিতি এবং বিমানবন্দর, আদালত ও নিয়মিত আইস চেকইনের মতো স্থানে গ্রেফতারের ঘটনা দেখাচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্রের গণঅভিবাসন এনফোর্সমেন্ট এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত ও বহুমুখী।

এই বাস্তবতাই নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করার পাশাপাশি অপরাধমূলক রেকর্ড না থাকা, দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা এবং সরকারের কাছে নিজেদের পরিচয় ও অবস্থান প্রকাশ করে নিয়ম মেনে চলা অভিবাসীদের কীভাবে আলাদাভাবে বিবেচনা করা হবে—এ প্রশ্ন এখন শুধু অভিবাসন অধিকারকর্মীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রয়োগ, অর্থনীতি এবং অভিবাসন ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে জাতীয় আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

শেয়ার করুন