২৫ মে ২০১২, শনিবার, ০৭:৩২:২৯ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক শাস্তি তাকে পেতেই হবে- ওবায়দুল কাদের মানুষের ক্ষতি যারা করবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত থাকবে- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাবেক আইজিপি বেনজির আহমেদের সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ মেয়াদোত্তীর্ণ নৌযান ও নদী দখল-দূষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ুন - পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের শান্তিরক্ষা মিশন থেকে বাদ দেয়া হবে- ডোজারিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে গণতান্ত্রিক বাম ঐক্যের সমাবেশ হেলিকপ্টার দূর্ঘটনায় ইরানের প্রেসিডেন্ট সহ অন্যান্যদের মৃত্যুতে বিএনপির শোক ভারতে ঘুরতে যেয়ে বাংলাদেশের সংসদ সদস্য খুন তামাকমুক্ত লক্ষ্য অর্জনে শক্তিশালী তামাককরের বিকল্প নেই


ব্রিটিশ রাজ স্টাইলে নির্মিত আরেকটি ঐতিহ্য গুড়িয়ে দেয়া হলো
সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৪-০৫-২০২৩
ব্রিটিশ রাজ স্টাইলে নির্মিত আরেকটি  ঐতিহ্য গুড়িয়ে দেয়া হলো বঙ্গবাজার এলাকায় অবস্থিত ব্রিটিশ আমলে নির্মিত ভবন/নিজস্ব ছবি


 রাজধানী ফুলবাড়িয়ায় প্রথম রেলস্টেশনের অন্যতম একটি নিদর্শন বুলডোজার দিয়ে চুরমার করে দেয়া হলো। মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হলো বঙ্গবাজার এলাকায় অবস্থিত ব্রিটিশ আমলে  নির্মিত রেলওয়ে হাসপাতাল এর শতবর্ষ পুরাতন দ্বিতল ভবনটি।নির্মমভাবে গুড়িয়ে দেয়া হলো শতবর্ষের এই ভবনকে। হাইকোর্টের রায় লংঘন করেই ধ্বংস করে নগরীর এই পুরান ঐতিহ্যকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। 


এক নজরে ভবনটির গুরুত্ব

বঙ্গবাজার এলাকায় অবস্থিত ব্রিটিশ আমলে নির্মিত ভবনটি বর্তমানে সরকারি কর্মচারি হাসপাতাল নামে পরিচিত ছিল সবার কাছে।  ঊনবিংশ  শতাব্দীর শেষ নাগাদ পূর্ববঙ্গে রেল সার্ভিস চালু করার পর ফুলবাড়িয়া এলাকায় ঢাকার প্রথম রেলস্টেশন স্থাপনের এর সাথে পুরো এলাকায় নতুন নির্মাণের যে কর্মযজ্ঞ আরম্ভ হয় তার মধ্যে বেশিভাগ ভবনই  ইতিমধ্যে ধ্বংস করা হয়েছে । সে সময়ের এক মাত্র নিদর্শন হিসেবে এই ভবনটির গুরুত্ব অপরিসীম। 


রেলওয়ে হাসপাতাল ভবনটি প্রায় ১২৫ বছর আগে নির্মাণকরা হয় । ১৮৮৫ সালে ঢাকা  বেঙ্গল আসাম রেলওয়ের সাথে সংযুক্ত হয়। সে সময় প্রায় ৫০ একর এলাকাজুড়ে ফুলবাড়িয়া এলাকায় রেলওয়ে পল্লী স্থাপন করা হয়। বিশাল কর্মযজ্ঞে ওয়ার্কশপ,  অফিস, রেসিডেন্সিয়াল কোয়াটার হাসপাতাল একে একে পুরো এলাকাটা চেহারা বদলে দিয়েছিল। এর পাশাপাশি অন্যান্য স্থাপনাগুলো গড়ে উঠেছিল । সেই স্টেশন অবশ্য চলে গেছে বহুদিন আগে। একে একে সেগুলোও এক করে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। ছিল মাত্র এটি। উল্লেখযোগ্য  নিদর্শন বলতে গেলে রেলওয়ে হাসপাতাল ভবনটিই  ছিল,যা আজ ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে।

ভবনটির নান্দনিক বৈশিষ্টও ছিল..

এই ভবনটি নান্দনিক কারণেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ব্রিটিশ রাজ স্টাইলের নির্মিত ভবনটির স্থাপত্যশৈলীতেও এক ধরনের অনন্যতা রয়েছে। প্রায় ২০০ ফুট দীর্ঘ এই ভবনটির ঠিক মাঝ বরাবর অবস্থিত কারপোর্ট এর দুপাশে দীর্ঘ টানা বারান্দা বরাবর ৯টি  করে খিলানের সারি রয়েছে। এই খিলানগুলো তিনটি খিলানের একটি করে সেট আবার  তিনটি সেটএ বিন্যাস করে এক ধরনের ছন্দ তৈরি করা হয়েছে । দু’পাশে দুটি সলিড ব্লক খিলানের সারি দুটিকে ব্র্যাকেট এর মত আবদ্ধ করে রেখেছে।  ব্রিটিশ রাজ স্থাপত্য রীতি অনুসরণ করে এক ধরনের নিরাভরণ অথচ মার্জিত  অবয়ব নির্মাণ করা হয়েছে। তবে ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও নগর পরিকল্পনার  দিক থেকে এই ভবনটি আরেকটি বিশেষ কারণে অত্যন্ত  গুরুত্বপূর্ণ।এই ভবনটি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান রমনা পার্ক ঘিরে গড়ে ওঠা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রুপের অংশ। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ এর মাধ্যমে ঢাকাকে পূর্ববঙ্গের রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ফুলবাড়িয়া থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত যে নতুন সিভিল স্টেশন গড়ে তোলা হয় তারই অংশ হিসেবে এই ভবনটি নির্মাণ করা হয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান  ও রমনা পার্ক  মিলে যা কিনা এক সময় রমনা গ্রীনস নামে পরিচিত ছিল তা ঘিরে যে ব্যাপক নগর উন্নয়ন  কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। ঢাকা ইউনিভার্সিটির কার্জন হলসহ  পুরাতন হাইকোর্ট ভবন এবং  ঢাকা মেডিকেল কলেজ ভবন, মিন্টু রোড, বেইলী রোড ইত্যাদি এলাকা জূড়ে এই বিশাল এলাকাটি তার ঐতিহাসিক চরিত্রটি এখনো ধরে রয়েছে। সে হিসাবে পুরাতন রেলওয়ে হাসপাতাল কোনটি ঐতিহাসিক বলয়েরই অংশ হিসেবে বিশেষ হিসেবে সংরক্ষণের দাবি রাখে। কিন্তু তা আর কেউ দেখবে না। 


এলাকার বর্তমান চিত্র /নিজস্ব ছবি 


প্রতিবাদে ফেটে পড়লো ঐতিহ্য রক্ষায় নিবেদিতরা

বঙ্গবাজার এলাকায় অবস্থিত ব্রিটিশ আমলে  নির্মিত রেলওয়ে হাসপাতাল এর শতবর্ষ পুরাতন দ্বিতল ভবনটি হাইকোর্টের রায় লংঘন করে ধ্বংস করার যে অবৈধ কার্যক্রম চলছে তার প্রতিবাদে আরবান স্টাডি  গ্রুপের পক্ষ থেকে এই মানববন্ধন কর্মসূচি করে এপ্রিলে। তখনো ভবনটির কিছু অংশ ছিল।  এ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন আরবান স্টাডি গ্রুপের প্রধান নির্বাহী স্থপতি তাইমুর ইসলাম,নির্বাহী পরিচালক স্থপতি সামিরা ইসলামসহ আরও সদস্যবৃন্দ এবং ভলান্টিয়ার্সবৃন্দ। এই কর্মসূচিতে আরও অংশগ্রহণ করেন সেভ দা হেরিটেজ বাংলাদেশ এর পক্ষে গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা স্থপতি  সাজ্জাদূর রশিদ এবং অন্যতম সদস্য  অ্যাডভোকেট মোঃ ওয়ালিউল হক রাজীব। আরবান স্টাডি গ্রুপের  প্রধান নির্বাহী স্থপতি তাইমুর ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, হাইকোর্টের রায় একটা নিষেধাজ্ঞা রয়েছে তা  উপেক্ষা করে যে ভাবে ভবনটি ভেঙে ফেলা হচ্ছে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। হাইকোর্টের রায় এর উপর আপিল হয়েছে এবং সেই আপিলের শুনানীর আগে তালিকাভুক্ত এই ভবনগুলোকে ভাঙা অবশ্যই অবৈধ। তিনি আরো বলেন, ইতিমধ্যে ভাঙ্গা হয়েছে তার অন্তত সম্মুখ ভাগটা পুননির্মাণ করে ভবনটির এখন পর্যন্ত যে অংশটুকু  বাকি রয়েছে সেই  অংশটুকু  সংরক্ষণের মাধমে  কর্মচারি হাসপাতাল এর জন্য ব্যবহার করা উচিত। 

শেষ কথা

মাত্র কয়েক মাস আগে পুরান ঢাকার সোয়া শ’ বছরের নিলাম ঘর নামে ঐতিহ্যবাহী ভবনটিকেও শাবল আর হাতুড়ির একের পর এক আঘাতে গুড়িয়ে দেয়া হয়। সেসময় এটি রক্ষায় মানববন্ধন করতে গিয়েছিলেন আর্বান স্টাডি গ্রুপের  প্রধান নির্বাহী আর্কিটেক্ট তাইমুর ইসলামের নেতৃত্বে ঐহিত্য রক্ষাপ্রেমীরা। সেসময় একর্মসূচিতে তাদের হতে হয়েছে মারাত্মকভাবে নাজেহাল। এমনকি নিগৃহিত হয়েছিলো গণমাধ্যমের কর্মীরা। অভিযোগ উঠেছে, আইনজীবীদের একটি সংগঠনের কয়েকজন কর্মী এ ঘটনা ঘটিয়েছিল। একিইভাবে রাজধানীর একেবারে কেন্দ্রে রেলওয়ে হাসপাতাল নামে ঐতিহাসিক ভবন রক্ষায় সরকারের কেউ এগিয়ে না এলেও এটি রক্ষায় এগিয়ে আসেন আর্বান স্টাডি গ্রুপের  প্রধান নির্বাহী আর্কিটেক্ট তাইমুর ইসলামের নেতৃত্বে ঐতিহ্য রক্ষাপ্রেমীরা। নিজের পকেটের টাকায় যারা রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে তাদের করা হয় তিরষ্কার। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন. পুরান ঢাকার ঐতিহ্য রক্ষা করেই উন্নয়নের চিন্তা করতে হবে। ঐতিহাসিক ভবন রক্ষায় আগে সরকারকেই আইন মানতে হবে। এবং যারা মানবে না তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এর পাশাপাশি এগুলো রক্ষায় রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা দরকার।


শেয়ার করুন