১৪ জুন ২০১২, শুক্রবার, ০৬:৪৬:২৭ অপরাহ্ন


সংলাপে দলীয় সরকারের অধীনে ’না’ বেকায়দায় ইসি
সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ
  • আপডেট করা হয়েছে : ৩১-০৩-২০২২
সংলাপে দলীয় সরকারের অধীনে ’না’ বেকায়দায় ইসি সংলাপে ইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল : ফাইল ছবি


একের পর পর এক সংলাপে তীর্ষক বক্তব্য আর নিরপেক্ষতার প্রশ্নে কতটা শক্ত অবস্থানে থাকা যাবে এমন প্রশ্নবানে বেকায়দায় পড়েছে নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বর্তমানে ইসির যে ক্ষমতা আছে তাতে তারা আসলেই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে পারবে কি-না সে বক্তব্য বেশি বেশি উচ্চারিত হওয়ায় বেকায়দায় পড়েছে তারা। এর পাশাপাশি নতুন ইসির দ্বারা হুট করে এমন সংলাপ শুরু করা নিয়ে খোদ সরকারের দেখা দিয়ে নানান ক্ষোভ আর প্রশ্ন। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের ব্যাপারে ইসি’র নানান ধরনের মন্তব্যও সরকার ভালো ভাবে নিচ্ছে না। 

কি বলা হচ্ছে সংলাপে?

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ গত মাসের ২৬ তারিখে সাবেক সিনিয়র সচিব কাজী হাবিবুল আউয়ালকে নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন । তার সাথে সাথে নির্বাচন কমিশনার (ইসি) হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন সাবেক জেলা ও দায়রা জজ বেগম রাশিদা সুলতানা, অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহসান হাবীব খান, সাবেক সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর ও সাবেক সিনিয়র সচিব আনিছুর রহমান। নতুন নিয়োগ পাওয়া সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল হিসেবে দায়িত্ব পেয়েই দুই সপ্তাহের মাথায় তারা শুরু করেন নির্বাচনী সংলাপ। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ১৩ মার্চ প্রথম ধাপে শিক্ষাবিদদের মতামত নেয় কমিশন। এরপর ২২ মার্চ দ্বিতীয় দফায় বসেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের সঙ্গে। প্রথম সংলাপে ৩০ জনকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও ১৭ জনই ইসির ডাকে সাড়া দেননি। দ্বিতীয় ধাপে সংলাপে আমন্ত্রিত অতিথির সংখ্যা বাড়ানো হয়। তাতেও ফল হয়নি। উপস্থিতির আশাব্যাঞ্জক হয়নি। ২২ মার্চের সংলাপে ৩৯ জনকে আমন্ত্রণপত্র দেওয়া হলেও ২০ জনই আসেননি।  কিন্তু সবচেয়ে বড়ো বিষয় হচেছ এমন আমন্ত্রণে এসেই আমন্ত্রিদের পক্ষ থেকে যে সব বক্তব্য দেয়া হয়েছে তাতে ইসি’র পাশাপাশি সরকারও বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে। এমনিতেই নতুন নির্বাচন কমিশন শুরু থেকেই অংশগ্রহণমূলক ভোট আয়োজনে রাজনৈতিক সমঝোতার তাগাদা দিয়ে আসছেন যা সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। কেননা একে একে সবাই বলছেন যে দলীয় সরকারের অধীনে দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না। এর পাশাপাশি বলছেন সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিলেই তা সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে, নচেৎ নয়। ২২ মার্চ দ্বিতীয় দফায় দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের সঙ্গে সংলাপে বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। সংলাপে বিশিষ্টজনেরা জাতীয় নির্বাচনে সবার ঐকমত্য ছাড়া ইভিএম ব্যবহার না করা, ভোটারদের বাধাহীনভাবে ভোটদানের অধিকার নিশ্চিত করা, ভোটের আগে-পরে ভোটারদের বিশেষ করে নারী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নির্বাচনকালীন প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে আনার পরামর্শ দিয়েছেন। বিশিষ্টজনদের কেউ কেউ বলেন, অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। সংবিধান ও আইনে ইসিকে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তা তারা কতখানি প্রয়োগ করতে পারবে, সেটি অনেকাংশে নির্ভর করে নির্বাচনকালীন সরকারের ওপর। নির্বাচনকালীন সরকার এমন হতে হবে, যাদের ভোটের ফলাফল নিয়ে কোনো আগ্রহ থাকবে না। বিশিষ্টজনদের কেউ কেউ বলেন, নির্বাচন কমিশনকে সাহসিকতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। কমিশন যদি মনে করে, নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে আইন ও সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন, তাহলে তারা সরকারকে প্রস্তাব দেবে। আর যদি মনে করে, সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব নয়, তাহলে নির্বাচন কমিশনকে পদত্যাগের মানসিকতা রাখতে হবে। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সিপিডির বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফরাসউদ্দিন আহমেদ, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম প্রমুখ সংলাপে বক্তব্য দেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান তার বক্তব্যে মারাত্মকভাবে ইসিকে আঘাত করে বলে সূত্র জানায়। তিনি ইসির উদ্দেশে তিনি বলেছেন, আপনারা যদি মনে করেন, কনভিন্সড হন যে এই পরিবর্তনগুলো না হলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়, তাহলে ইস্তফা দিন। দৃষ্টান্ত স্থাপন করুন। অংশীজনদের ওপর চাপ সৃষ্টি করুন। জনগণ আপনাদের পাশে দাঁড়াবে। এব্যাপারে তিনি আরো বলেন, নির্বাচনকালীন সরকারের আচরণের ওপর নির্ভর করে ভোট কতটা সুষ্ঠু হবে। নির্বাচনকালীন সরকারের আচরণ এমন হতে হবে, যা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। এটি করতে আইন, সংবিধানের পরিবর্তন আনার প্রয়োজন আছে কি না, সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন করা বর্তমান বাস্তবতায় কতটা যৌক্তিত তা দেখতে হবে। 

শুরু থেকেই বির্তক

জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের সঙ্গে সংলাপের আগেই দায়িত্ব নিয়েই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির উদাহরণ টেনে রাজনৈতিক দলগুলোকে ভোটের মাঠ ছেড়ে না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে দেশে বিদেশে বির্তকের সূচনা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল। এরপর তিনি নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ক্ষমতা অসীম নয় বলেও মন্তব্য করেন। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা দরকার বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে যদি ন্যূনতম সমঝোতা না থাকে, তাহলে সিইসি হিসেবে তিনি মুরব্বির ভূমিকা নিতে পারবেন না বলেও সাফ জানিয়েছেন। সিইসি বলেছেন, ওনারা আমাদের থেকে অনেক বেশি জ্ঞানী, অনেক বেশি অভিজ্ঞ। আমরা তাঁদের কাছে অনুনয়-বিনয় করব, আপনারা নিজেদের মধ্যে সমঝোতা সৃষ্টি করুন, চুক্তিবদ্ধ হোন যে আপনারা সুন্দরভাবে নির্বাচনটা করবেন। ওখানে সহিংসতা করবেন না, কেউ কাউকে বাধা দেবেন না। এর পাশাপাশি তিনি নির্বাচন কমিশনের শক্তি অসীম নয়। এটা সব সময় আপেক্ষিক।

সরকারের ক্ষোভ যে কারণে

দায়িত্ব নেয়ার পর ইসির বক্তব্য আর এর পাশাপশি হুট করে সংলাপ শুরু করা নিয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে এখন ক্ষোভ এমনকি সন্দেহ দেখা দিয়েছে। তাদের মতে, নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ায় হুট করে এমন ধরণের সংলাপ ও এমন বিশিষ্টজনের সাথে সংলাপের হেতু কি? তিনি এমন সংলাপের আগের দায়িত্ব নিয়ে নিজ কার্যালয়ে চেনা ও বুঝার আগে কেনো এমন আয়োজন করতে গেলেন? তিনি কি এনিয়ে হোমওয়ার্ক করেছেন? তাদের মতে, বিশিষ্টজনের সাথে সংলাপে বসার আগে ইসি’র বিগত কমিশনের সংলাপের সুপারিশগুলি পড়ে দেখলেই এমন বিব্রতকর অবস্থায় পড়তেন না। কেননা এসব বিশিষ্ট জনেরা আগেও দেখেছেন এবং বুঝেছেন তাদের দেয়া সুুপারিশি কেউ গ্রাহ্য করেনি। আর একারণে নতুন ইসি দায়িত্ব নেওয়ার পর সংলাপে এমন সব বক্তব্য উঠে আসে। তাছাড়া বর্তমান ইসি’র কিছু প্রশাসনিক কার্যকলারও প্রশ্নের মুখে পড়েন।  

শেষ কথা

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে বা ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে। এর আগে সদ্য বিদায়ী নূরুল হুদার নির্বাচন কার্যক্রম নিয়ে সারা দেশে তোলপাড়ও হয়। এরই মধ্যে দায়িত্ব পান সাবেক সিনিয়র সচিব কাজী হাবিবুল আউয়ালকে নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) হিসেবে। সদ্য বিদায়ী নূরুল হুদার নির্বাচন কার্যক্রম দেশে বিদেশে হাস্যকরও ঠেকেছে। এসব নিয়ে সরকারের মুখ যখন পোড়া তখন নতুন দায়িত্ব পাওয়া সাবেক সিনিয়র সচিব কাজী হাবিবুল আউয়ালের কার্যক্রম একটু সর্তকতামুলক হওয়া উচিত ছিল বলেও সংশ্লিস্টরা মনে করেন। সরকারের কেউ কেউ মনে মনে হুট করে সংলাপের আয়োজন আর সিইসি’র বক্তব্য সাবোটাজ না-তো? এমন সব বক্তব্য বিশিষ্টজনদেও মুখে সিইসি’র ডাকা সংলাপে উঠে আসা সরকারের ইমেজেও যে আঘাত করা হচ্ছে তা তারা বুঝতে পেরেছেন। সেদিক থেকে বলা যায় ভবিষ্যতে সরকার কি করবে করবে তা সময় বলে দেবে।


শেয়ার করুন