১১ মার্চ ২০২৬, বুধবার, ০৯:৪৭:১৫ অপরাহ্ন


নামাজরত অবস্থায় বন্দিদের ওপর হামলায় ৬৬৭ হাজার ডলার ক্ষতিপূরণ
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ১১-০৩-২০২৬
নামাজরত অবস্থায় বন্দিদের ওপর হামলায় ৬৬৭ হাজার ডলার ক্ষতিপূরণ মিসৌরির ইস্টার্ন রিসেপশন, ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কারেকশনাল সেন্টার


যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি অঙ্গরাজ্যে নামাজ আদায় করার সময় মুসলিম বন্দিদের ওপর পিপার স্প্রে এবং শারীরিক নির্যাতনের ঘটনায় ফেডারেল জুরির রায় ৯ মার্চ ঘোষণা করা হয়। রায়ে ৬৬৭ হাজার ডলার ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মামলাটি পরিচালিত হয় মিসৌরির সেন্ট লুইসের যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্টার্ন ডিস্ট্রিক্ট ফেডারেল জেলা আদালতে। মামলার বাদী ছিলেন আটজন মুসলিম বন্দি। জুরিবোর্ড তাদের উত্থাপিত সব আইনি দাবির পক্ষে রায় দিয়ে মোট ৬৬৭ হাজার ডলার ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ দেয়। এ রায় যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারে বন্দিদের ধর্মীয় অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

মামলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মিসৌরির ইস্টার্ন রিসেপশন, ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কারেকশনাল সেন্টারের একটি ইউনিটে ৯ জন মুসলিম বন্দি একটি সাধারণ কক্ষে একসঙ্গে নামাজ পড়ছিলেন। তখন একজন কারা কর্মকর্তা তাদের নামাজ বন্ধ করতে নির্দেশ দেন। বন্দিরা জানান, তারা ওইদিন আগেও তিনবার নির্বিঘ্নে একসঙ্গে নামাজ আদায় করেছেন এবং পূর্ববর্তী কয়েক মাসে শতাধিকবার একইভাবে নামাজ পড়েছেন। কিন্তু নামাজ শুরু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই কয়েকজন কারারক্ষী সেখানে এসে বন্দিদের ঘিরে ফেলে এবং তাদের ওপর পিপার স্প্রে নিক্ষেপ করতে শুরু করে। ঘটনার সময় প্রায় ২০ জন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে দুইজন বন্দি নামাজ বন্ধ করে সরাসরি চলে যান, আর অন্য দুজন বন্দিকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে নামাজ বন্ধ করতে বাধ্য করা হয়। বাকি পাঁচজন বন্দি পিপার স্প্রে করা হয়, কেউ কেউ হ্যান্ডকাফ পরা অবস্থাতেও। এক বন্দিকে শারীরিকভাবে মারধর করা হয়।

ঘটনার পর বন্দিদের একক সেলে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তাদের ঠান্ডা কক্ষে রাতভর রাখা হয়। তাদের চোখ ও শরীর থেকে পিপার স্প্রে ধুয়ে ফেলার জন্য সাবান এবং পানির কোনো ব্যবস্থা দেওয়া হয়নি। তীব্র জ্বালাপোড়া কমানোর জন্য কিছু বন্দি টয়লেটের পানি ব্যবহার করে নিজেদের পরিষ্কার করার চেষ্টা করেন। পরে তাদের প্রায় ১০ দিন একক সেলে রাখা হয়। মিসৌরি ডিপার্টমেন্ট অব কারেকশনস দাবি করেছিল যে, চ্যাপেলের বাইরে কোনো ধর্মীয় সমাবেশ নিষিদ্ধ করার একটি বিভাগীয় নীতির ভিত্তিতে তারা এই ব্যবস্থা নিয়েছিল। তবে মামলায় বলা হয়, একই স্থানে অন্য অধর্মীয় উদ্দেশ্যে বন্দিদের জমায়েতের অনুমতি দেওয়া হতো, যা বৈষম্যমূলক আচরণের প্রমাণ হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করা হয়।

২০২৩ সালে কেয়ার এই ঘটনার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। মামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর ধর্মীয় স্বাধীনতা, অষ্টম সংশোধনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও নিষ্ঠুর শাস্তি নিষিদ্ধ এবং চতুর্দশ সংশোধনীর সমান সুরক্ষা লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়। পাঁচদিনের জুরি ট্রায়াল এবং এক দিনেরও বেশি সময় ধরে আলোচনার পর জুরি সর্বসম্মতভাবে বাদীদের পক্ষে রায় দেয় এবং তাদের ৬৬৭ হাজার ডলার ক্ষতিপূরণ প্রদান করে।

কেয়ার লিগ্যাল ডিফেন্স ফান্ডের আইনজীবী ক্যাথরিন কেক বলেন, এই মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং জুরি সেটি স্বীকার করেছে। আমরা আশা করি, এই রায় সব কারাগারের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে ও সংবিধানকে অবশ্যই সম্মান করতে হবে এবং কাউকে তার ধর্মীয় চর্চার জন্য নির্যাতনের শিকার হতে দেওয়া যাবে না।

আরেক আইনজীবী নাদিয়া বায়াদো বলেন, কারাগারে থাকা ব্যক্তিদের প্রতি নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। এ রায় দেখিয়ে দিয়েছে যে এমন আচরণ শাস্তি ছাড়া থাকবে না।

কেয়ারের আইনজীবী আহমাদ কাকি বলেন, এ মানুষগুলো শুধু আল্লাহর ইবাদত করার চেষ্টা করছিলেন। তাদের ওপর যে নিষ্ঠুর আচরণ করা হয়েছে, তার জন্য মিসৌরি ডিপার্টমেন্ট অব কারেকশনসকে এখন জবাবদিহি করতে হচ্ছে। মারগোলিস অ্যান্ড ক্রসের অংশীদার ইয়ান ক্রস বলেন, এ রায় আমাদের মক্কেলদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ বিজয়। আমরা আশা করি, মিসৌরি ডিপার্টমেন্ট অব কারেকশনস তাদের নীতি পরিবর্তন করবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করবে।

সেন্ট লুইস সিটি এনএএসিপি-এর প্রথম সহ-সভাপতি রেভারেন্ড এলস্টন কে ম্যাককাওয়ান বলেন, এটি ছিল নিষ্ঠুর ও অস্বাভাবিক শাস্তির একটি স্পষ্ট উদাহরণ। জুরির এ রায় দেখিয়েছে যে ধর্মীয় বৈষম্য ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইনের মাধ্যমে প্রতিকার পাওয়া সম্ভব। এই মামলায় আইনি সহায়তা দেয় কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস লিগ্যাল ডিফেন্স ফান্ড এবং সহ-আইনজীবী প্রতিষ্ঠান মারগোলিস অ্যান্ড ক্রস।

শেয়ার করুন