১১ মার্চ ২০২৬, বুধবার, ০৯:৪৭:১৩ অপরাহ্ন


মুসলিম সম্প্রদায়কে বহিষ্কার ও নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ১১-০৩-২০২৬
মুসলিম সম্প্রদায়কে বহিষ্কার ও নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব ফোর্ট ওয়ার্থের লাইট অব দ্য ওয়ার্ল্ড চার্চে ‘ইসলামের হুমকি’ নিয়ে আলোচনা যা বক্তব্য রাখছেন কার্লোস তুরসিওস


যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস স্টেটের ফোর্ট ওয়ার্থ শহরের একটি গির্জায় অনুষ্ঠিত এক আলোচনায় ইসলাম নিষিদ্ধ করা, মুসলিমদের দেশ থেকে বহিষ্কার করা কিংবা ধর্মান্তরিত করার মতো বিতর্কিত প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ওই সভায় অংশ নেওয়া কয়েকজন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতা দাবি করেন, ট্যারান্ট কাউন্টি ও টেক্সাসে ইসলামকে তারা একটি হুমকি হিসেবে দেখেন এবং সেই হুমকি দূর করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। গত ৫ মার্চ রাতে লাইট অব দ্য ওয়ার্ল্ড চার্চে এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে ফর লিবার্টি অ্যান্ড জাস্টিস। এটি ফোর্ট ওয়ার্থভিত্তিক মার্সি কালচার চার্চের রাজনৈতিক শাখা হিসেবে পরিচিত। অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয় প্রাইমারি নির্বাচনের মাত্র দুদিন পর, যখন স্থানীয়, স্টেট ও জাতীয় পর্যায়ের অনেক রিপাবলিকান প্রার্থী নির্বাচনী প্রচারণায় ইসলামবিরোধী বক্তব্য ব্যবহার করেছিলেন। একই সময়ে মুসলিমদের পবিত্র মাস রমজান চলছিল।

আলোচনায় অংশ নেওয়া প্যানেলিস্টদের মধ্যে ছিলেন টেক্সাসের রিপাবলিকান অঙ্গরাজ্য প্রতিনিধি অ্যান্ডি হপার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় সাবেক মুসলিম থেকে খ্রিস্টান হওয়া প্রভাবক শাহরিক খান, ডালাসভিত্তিক সংগঠন আমেরিকান জিউস কনজারভেটিভসের প্রতিষ্ঠাতা বেনজি গেরশোন, রিপাবলিকান প্রার্থী হিসেবে প্রাইমারি নির্বাচনে পরাজিত হওয়া আবতিন ভাজিরি এবং সাবেক এফবিআই এজেন্ট ও লেখক জন গুয়ানডোলো।

প্যানেল আলোচনায় অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধি অ্যান্ডি হপার প্রস্তাব করেন, টেক্সাস সরকার চাইলে ইসলামকে ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে রাজনৈতিক মতাদর্শ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে। তার ভাষায়, টেক্সাস অঙ্গরাজ্য চাইলে বলতে পারে যে এখানে আমরা নির্ধারণ করব ধর্ম কী। আর ইসলাম যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনী দ্বারা সুরক্ষিত কোনো ধর্ম নয়। এ মন্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মকে নিষিদ্ধ করার মতো বক্তব্য সাধারণ রাজনৈতিক আলোচনার তুলনায় অনেক বেশি চরমপন্থী।

সাউদার্ন মেথডিস্ট ইউনিভার্সিটি-এর রাজনৈতিক বিজ্ঞান অধ্যাপক ম্যাথিউ উইলসন বলেন, ইসলামি চরমপন্থা নিয়ে উদ্বেগ রিপাবলিকান রাজনীতির কিছু প্রান্তিক গোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই আছে। কিন্তু পুরো একটি ধর্মকে নিষিদ্ধ বা অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করার প্রস্তাব সত্যিই নতুন এবং উদ্বেগজনক।

তথ্য অনুযায়ী, ট্যারান্ট কাউন্টিতে প্রায় ৩১ হাজার মানুষ ইসলাম ধর্ম পালন করেন। অ্যাসোসিয়েশন অফ রিলিজিয়াস ডেটা আর্কাইভসের ২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী এই সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৩-২০২৪ সালের গবেষণায় দেখা যায়, ডালাস-ফোর্ট ওয়ার্থ অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ মুসলিম।

সম্প্রতি টেক্সাসে তথাকথিত ইসলামাইজেশন নিয়ে আলোচনা নতুন করে রাজনৈতিক গুরুত্ব পাচ্ছে। অনেক রিপাবলিকান নেতা ও প্রার্থী নির্বাচনী প্রচারণায় শরিয়া আইনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছেন। অনুষ্ঠানের আয়োজক কার্লোস তুরসিওস, যিনি ফর লিবার্টি অ্যান্ড জাস্টিস সংগঠনের ট্যারান্ট কাউন্টি শাখার পরিচালক, বলেন যে এ আলোচনা আয়োজনের পেছনে একটি বড় কারণ ছিল দ্য মেডো নামে পরিকল্পিত একটি মুসলিম-প্রধান আবাসিক প্রকল্প। এই প্রকল্পটি ফোর্ট ওয়ার্থ থেকে প্রায় ৭০ মাইল দূরের জোসেফিন শহরে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি আগে এপিক সিটি নামে পরিচিত ছিল এবং এটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক ও আইনি চ্যালেঞ্জ চলছে।

টারসিওস দাবি করেন, ট্যারান্ট কাউন্টিতে অনেক মানুষ আশঙ্কা করছেন যে মুসলিমরা নিজেদের আলাদা সম্প্রদায় তৈরি করছে। তার মতে, এ আলোচনা একটি স্বাস্থ্যকর বিতর্ক ছিল। অন্যদিকে নর্থ টেক্সাসের ইসলামিক অ্যাসোসিয়েশন অব নর্থ টেক্সাসের মুখপাত্র খালিদ হামিদে এ আলোচনার বিষয়ে শুনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, তার ৪০ বছরের অভিজ্ঞতায় তিনি কখনো কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে পুরো একটি ধর্ম নিষিদ্ধ করার মতো কথা শোনেননি।তার ভাষায়, এটি অত্যন্ত চরমপন্থী বক্তব্য। তারা বিষয়টিকে চরম সীমায় নিয়ে গেছে।

হামিদেহ আরো বলেন, সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রচারণায় ইসলামবিরোধী বক্তব্য ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি রিপাবলিকান প্রার্থী আবতিন ভাজিরির প্রচারণার কথা উল্লেখ করেন। ভাজিরি, যিনি নিজেকে ইরান থেকে পালিয়ে আসা রাজনৈতিক শরণার্থী হিসেবে পরিচয় দেন, তার প্রচারণায় বলেছেন তিনি কংগ্রেসে যেতে চান যাতে যে ইসলামি মতাদর্শ থেকে তিনি পালিয়ে এসেছেন তা যুক্তরাষ্ট্রে শিকড় গাড়তে না পারে।

এছাড়া ট্যারান্ট কাউন্টি রিপাবলিকান পার্টির সাবেক চেয়ারম্যান বো ফ্রেঞ্চ তার প্রচারণায় ইসলামি আগ্রাসন বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। গত বছর ফ্রেঞ্চ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি জরিপ পোস্ট করেন যেখানে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, ইহুদি না মুসলিম কারা আমেরিকার জন্য বড় হুমকি? ওই পোস্টের কারণে রিপাবলিকান পার্টির ভেতর থেকেই তার পদত্যাগের দাবি উঠেছিল। এর পাশাপাশি কেলার শহরের মেয়র আরমিন মিজানি একটি প্রস্তাব সমর্থন করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল শরিয়া আইন নিষিদ্ধ করা। তবে পরে সম্প্রদায়ের উদ্বেগের কারণে সেই প্রস্তাব থেকে শরিয়ার সরাসরি উল্লেখ বাদ দেওয়া হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ম্যাথিউ উইলসন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী কোনো ধর্ম নিষিদ্ধ করা সম্ভব নয়। তিনি ব্যাখ্যা করেন, যেমন সরকার কাউকে ধর্মীয় কারণে নির্দিষ্ট খাদ্যাভ্যাস মানতে বাধ্য করতে পারে না, তেমনি কোনো ধর্মীয় নৈতিক বিধিও আইনের মাধ্যমে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। খালিদ হামিদেহ বলেন, শরিয়া আইনকে অনেকেই ভুলভাবে বোঝেন। তার মতে, এটি মুসলিমদের নৈতিক নির্দেশিকা, যেমন খ্রিস্টানদের জন্য দশ আদেশ। তিনি বলেন, আমরা সবাই একই ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি। আমরা হয়তো ভিন্ন পথ ধরে এগোচ্ছি, কিন্তু লক্ষ্য একটাই, স্বর্গে পৌঁছানো। উল্লেখযোগ্যভাবে, যখন ফোর্ট ওয়ার্থের ওই গির্জায় ইসলাম নিয়ে কঠোর সমালোচনা চলছিল, তখন একই সময়ে রিচার্ডসন শহরে ইসলামিক অ্যাসোসিয়েশন অব নর্থ টেক্সাসের আয়োজনে বিভিন্ন ধর্মীয় নেতারা একত্রে আন্তঃধর্মীয় ইফতার অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছিলেন। হামিদেহ এই পরিস্থিতিকে বিরূপ বৈপরীত্য হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, একটি পবিত্র উপাসনালয়ে বসে এমন আলোচনা হওয়া তাকে বিস্মিত করেছে।তিনি আরো সতর্ক করে বলেন, রাজনৈতিক নেতাদের ইসলামবিরোধী বক্তব্য বাস্তবে গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। তার মতে, এসব বক্তব্যের কারণে স্থানীয় মসজিদে বোমা হামলার হুমকি, মুসলিম স্কুলে ভয়ভীতি এবং হিজাব পরা মুসলিম মেয়েদের হয়রানির ঘটনা বাড়তে পারে।তার ভাষায়, পরিণতি বাস্তব। তাদের কথার প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর পড়ে।

প্যানেল আলোচনায় অ্যান্ডি হপার আরো কয়েকটি প্রস্তাব তুলে ধরেন। এর মধ্যে ছিল এইচ-১বি ভিসা প্রোগ্রাম ব্যবহারকারী কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সরকারি চুক্তি বাতিল করা, টেক্সাসের স্কুলে হালাল খাবার নিষিদ্ধ করা এবং মুসলিম ব্রাদারহুড বা কেয়ারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বহিষ্কার করা। তবে প্যানেলের আরেক বক্তা শাহরিক খান কিছুটা ভিন্ন মত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংস ভাষা ব্যবহার না করে খ্রিস্টানদের উচিত তাদের ধর্মে দাওয়াত দেওয়া। তিনি বলেন, আমাদের কাজ হলো মুসলিমদের আক্রমণ করা নয়, বরং সম্মানের সঙ্গে তাদের কাছে খ্রিস্টধর্মের বার্তা পৌঁছে দেওয়া।

সাবেক এফবিআই এজেন্ট জন গুয়ান্ডোলো, যিনি আন্ডারস্ট্যান্ডিং দ্য থ্রেট নামের একটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রকে জিহাদি হুমকি মোকাবিলায় আরো কঠোর হতে হবে। তিনি উপস্থিতদের উদ্দেশে বলেন, আমাদের একটি সীমারেখা টানতে হবে এবং স্বাধীনতা ও চিন্তার স্বাধীনতা রক্ষায় সবকিছু ঝুঁকির মধ্যে ফেলতেও প্রস্তুত থাকতে হবে।

এই আলোচনাকে কেন্দ্র করে টেক্সাসে ধর্মীয় স্বাধীনতা, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নির্বাচনী রাজনীতিতে ইসলামকে ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করা হলে তা সমাজে বিভাজন বাড়াতে পারে এবং ধর্মীয় সহাবস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

শেয়ার করুন