০৮ এপ্রিল ২০২৬, বুধবার, ১১:১৯:১৮ অপরাহ্ন


রোহিঙ্গা শরণার্থী নূরুল আমিনের মৃত্যু ‘হত্যা’ হিসেবে চিহ্নিত
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৮-০৪-২০২৬
রোহিঙ্গা শরণার্থী নূরুল আমিনের মৃত্যু ‘হত্যা’ হিসেবে চিহ্নিত রোহিঙ্গা শরণার্থী নূরুল আমিন শাহ


যুক্তরাষ্ট্রে বাফেলো সিটিতে এক রোহিঙ্গা শরণার্থীর মৃত্যুকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা ৫৬ বছর বয়সী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি নূরুল আমিন শাহর মৃত্যুকে গত ৩১ মার্চ মেডিকেল এক্সামিনারের অফিস ‘হোমিসাইড’ বা অন্যের কর্মকা-জনিত মৃত্যু হিসেবে ঘোষণা করেছে। এর আগে তাকে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত টহল কর্মকর্তারা নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের বাফেলো শহরের একটি টিম হর্টন্স রেস্তোরাঁর পার্কিং লটে শীতের রাতে ফেলে রেখে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এরি কাউন্টি মেডিকেল এক্সামিনারের অফিস জানিয়েছে, ২৪ ফেব্রুয়ারি শাহের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে-হাইপোথার্মিয়া বা অত্যধিক ঠান্ডা, পানিশূন্যতা এবং ডুওডেনাল আলসার ছিদ্রজনিত জটিলতা। ৩১ মার্চ চূড়ান্তভাবে এই মৃত্যুকে হোমিসাইড হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করেছে, এখানে হোমিসাইড বলতে অন্য কারও কাজ বা অবহেলার কারণে মৃত্যু বোঝানো হয়েছে, এটি অপরাধমূলক উদ্দেশ্য প্রমাণ করে না।

শাহের ছেলে মোহাম্মদ ফয়সল নূরুল আমিন বলেছেন, মেডিকেল পরীক্ষকের ফোন পাওয়ার পর আমি শকে চলে যাই। মনে হচ্ছিল বমি করব, নড়তেও পারছিলাম না। আমার মা ভেঙে পড়েছেন, আমিও এখনো মানসিকভাবে ভেঙে আছি। শাহের পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন যে, তিনি প্রায় অন্ধ ছিলেন এবং ইংরেজি বলতে পারতেন না, তাই হঠাৎ ভীতিকর পরিস্থিতিতে তিনি দিশাহারা হয়ে পড়েছিলেন।

নিউ ইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস ইতোমধ্যে এ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছেন। তিনি বলেছেন, শাহ আলম গণহত্যা থেকে বাঁচতে এ দেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ সময়ে তাকে একা কষ্ট পেতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কোনো নিউ ইয়র্কবাসীর সঙ্গে এমন আচরণ হওয়া উচিত নয়। এরি কাউন্টি ডিস্ট্র্রিক্ট অ্যাটর্নিস অফিসও জানিয়েছে, তারা ময়নাতদন্ত রিপোর্ট সংগ্রহ করে অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে বিষয়টি পর্যালোচনা করছে। নিউ ইয়র্কের কংগ্রেসম্যান টিম কেনেডি বলেছেন, যদি যথাযথ চিকিৎসা পেতেন, শাহ আজ তার পরিবারের সঙ্গে বেঁচে থাকতেন। বরং তাকে নির্মমভাবে শীতের রাতে ফেলে রাখা হয়েছে। তিনি ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটিকে তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন।

শাহ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে বাফেলোতে পুনর্বাসিত হন। তবে ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি পথ হারিয়ে ফেলেন এবং এক বাড়ির আঙিনায় ঢুকে পড়লে তাকে পুলিশ আটক করে। পরে ১৯ ফেব্রুয়ারি তাকে বর্ডার প্যাট্রোলের কাছে হস্তান্তর করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, কয়েক ঘণ্টা হেফাজতে রাখার পর তাকে রাত প্রায় ৮টার দিকে একটি পার্কিং লটে নামিয়ে দেওয়া হয়। তার পরিবার বা আইনজীবীকে কিছু না জানিয়েই। পাঁচ দিন পর যেখানে তাকে নামানো হয়েছিল সেখান থেকে প্রায় চার মাইল দূরে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, শাহের মৃত্যুর সঙ্গে বর্ডার প্যাট্রোল-এর কোনো সম্পর্ক নেই এবং এ ধরনের অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছে। শাহের তিনটি ছেলে এবং তাদের পরিবার মালয়েশিয়ায় অপেক্ষা করছেন পুনর্বাসনের জন্য। ঘটনার সময় তিনি স্থানীয় একটি বার্মিজ গ্রোসারি থেকে কয়েকটি জিনিস কিনে আসছিলেন, যার মধ্যে একটি কার্টেন রড ছিল যা তিনি হাঁটার জন্য ব্যবহার করতেন। ঘটনার আগে বাফেলো পুলিশের বডি ক্যামেরায় দেখা যায়, তিনি পুলিশের সঙ্গে সংযোগে ছিলেন এবং ভুল বোঝাবুঝির কারণে আটক হন। এরি কাউন্টি শেরিফের অফিস এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা সংস্থাগুলোও তদন্তে যুক্ত হয়েছে।

এ ঘটনা অভিবাসী ও শরণার্থীদের প্রতি আচরণ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রে শরণার্থী সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শরণার্থী এবং প্রতিবন্ধী সম্প্রদায়ের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো সতর্ক করা অত্যন্ত জরুরি।

শেয়ার করুন