২৮ মে ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ৬:১০:১৭ পূর্বাহ্ন


৪ লাখ সাশ্রয়ী আবাসনের পরিকল্পনা ঘোষণা মেয়রের
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৭-০৫-২০২৬
৪ লাখ সাশ্রয়ী আবাসনের পরিকল্পনা ঘোষণা মেয়রের সাশ্রয়ী আবাসনের মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করছেন মেয়র মামদানি


যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম নগরী নিউ ইয়র্ক সিটি-তে ক্রমবর্ধমান আবাসন সংকট মোকাবিলায় এক বিশাল পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন সিটির মেয়রজোহরান মামদানির। ২৬ মে মঙ্গলবার ব্রুকলিনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি “ব্লক বাই ব্লক” নামে নতুন উদ্যোগের ঘোষণা দেন। এই উদ্যোগের আওতায় আগামী দশ বছরে ৪ লাখ সাশ্রয়ী আবাসন ইউনিট নির্মাণ, সংরক্ষণ ও স্থিতিশীল করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মেয়র মামদানি বলেন, নিউইয়র্কে বাসা ভাড়া ও আবাসন খরচ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সাধারণ কর্মজীবী মানুষের জন্য একটি বাসা খুঁজে পাওয়া এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি আবাসন সংকটকে শহরের সবচেয়ে বড় জীবনযাত্রা সংকট হিসেবে উল্লেখ করেন। মামদানি বলেন, যখন নিউইয়র্কবাসী একটি বাসা বহন করতে পারে, তখন তারা স্বপ্ন দেখতেও পারে। তিনি আরও বলেন, গত কয়েক দশকের সরকারি নীতিগত ব্যর্থতা এবং পর্যাপ্ত আবাসন নির্মাণ না হওয়ায় আজকের এই সংকট তৈরি হয়েছে।

মেয়রের পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় অংশ হচ্ছে আগামী এক দশকে ২ লাখ নতুন ভাড়া-নিয়ন্ত্রিত বা রেন্ট স্ট্যাবিলাইজড আবাসন নির্মাণ। এই ইউনিটগুলো মূলত মধ্যবিত্ত, নিম্ন আয়ের পরিবার এবং গৃহহীন নিউইয়র্কবাসীদের জন্য বরাদ্দ থাকবে। মামদানি আরও বলেন, এই ঐতিহাসিক নির্মাণ কর্মসূচির ফলে গৃহহীন নিউইয়র্কবাসীদের জন্য আবাসনের সুযোগ প্রায় ৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। শুধু নতুন আবাসন নির্মাণই নয়, আরও ২ লাখ বিদ্যমান আবাসন ইউনিট সংরক্ষণ ও স্থিতিশীল করা হবে। অর্থাৎ পুরনো ভবন সংস্কার, ভাড়া নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এবং বাসিন্দাদের উচ্ছেদ ঠেকাতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মোট ৪ লাখ আবাসন ইউনিটের এই পরিকল্পনাকে তিনি নিউইয়র্ক সিটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সাশ্রয়ী আবাসন উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেন। মেয়র মামদানি জানান, এই বিশাল কর্মসূচি বাস্তবায়নে আগামী পাঁচ বছরে ২২ বিলিয়ন ডলার মূলধনী বিনিয়োগ করা হবে। এই অর্থ ব্যয় হবে নতুন ভবন নির্মাণ, পুরনো আবাসন সংস্কার, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সরকারি আবাসন ব্যবস্থার পুনর্গঠনে। তিনি বলেন, সাশ্রয়ী আবাসনের ক্ষেত্রে অতীতে কোনো মেয়র এত বড় পরিকল্পনা কল্পনাও করেননি, প্রস্তাব তো দূরের কথা। মেয়রের ভাষ্য অনুযায়ী, এই নির্মাণ কর্মসূচির মাধ্যমে হাজার হাজার নতুন চাকরির সুযোগও সৃষ্টি হবে। নির্মাণ খাত, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রকৌশল এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সেবাখাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে ভাড়াটিয়াদের সুরক্ষা জোরদার করা। মামদানি বলেন, নিউইয়র্কের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ নিজেদের বাড়ির মালিক নন; তারা ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। ফলে বাড়িওয়ালাদের অনিয়ম, অতিরিক্ত ভাড়া বৃদ্ধি এবং হয়রানির শিকার হন বহু মানুষ। তিনি জানান, সম্প্রতি তার প্রশাসনের আয়োজিত “রেন্টাল রিপঅফ হিয়ারিং” বা ভাড়া জালিয়াতি বিষয়ক শুনানি থেকে পাওয়া অভিযোগ ও মতামতের ভিত্তিতে নতুন নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থার আওতায় খারাপ বাড়িওয়ালাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, বেআইনি উচ্ছেদ রোধ করা হবে এবং ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের প্রয়োগ আরও শক্তিশালী করা হবে।

পরিকল্পনার তৃতীয় বড় অংশ হচ্ছে নিউইয়র্ক সিটি হাউজিং অথরিটিতে বড় বিনিয়োগ। মেয়র জানান, এনওয়াইচার জন্য আগামী পাঁচ বছরে ৫.৬ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেওয়া হবে, যা কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সরকারি বিনিয়োগ। তিনি বলেন, সিটি হল অবহেলার ইতিহাস বদলে দেবে। আমরা এনওয়াইচাকে সরকারি মালিকানা ও সরকারি পরিচালনার মধ্যেই রেখে সংস্কার করব। এই অর্থ দিয়ে সরকারি আবাসন ভবনের পূর্ণাঙ্গ সংস্কার, নিরাপত্তা উন্নয়ন, লিফট ও হিটিং সিস্টেম মেরামত, ছাদ সংস্কার এবং বাসিন্দাদের মতামতের ভিত্তিতে উন্নয়ন কাজ পরিচালনা করা হবে।

আবাসন অধিকার সংগঠন ওপেন নিউ ইয়র্ক এর নির্বাহী কর্মকর্তা অ্যানমেরি গ্রে এই পরিকল্পনাকে প্রগতিশীল ও সর্বাত্মক আবাসন নীতি বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, এই পরিকল্পনায় নতুন আবাসন নির্মাণ, ভাড়াটিয়া সুরক্ষা, সরকারি আবাসন উন্নয়ন এবং বাড়ির মালিকানা সম্প্রসারণ-সবকিছুকে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গ্রের মতে, বিশেষ করে যেসব এলাকায় দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত আবাসন নির্মাণ হয়নি, সেখানে নতুন আবাসন গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেছে রিয়েল এস্টেট খাত। রিয়েল এস্টেট বোর্ড অব নিউইয়র্ক (রেবনি)-এর প্রেসিডেন্ট জেমস হুইলান বলেন, মেয়রের পরিকল্পনা ব্যাপক হলেও এর কিছু দিক নির্মাণ ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে।

বিশেষ করে প্রজেক্ট লেবার এগ্রিমেন্ট যুক্ত করার কারণে নির্মাণ ব্যয় এবং অর্থায়নের খরচ বাড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। হুইলান বলেন, যখন আমাদের যত বেশি সম্ভব আবাসন নির্মাণের প্রয়োজন, তখন প্রকল্পকে আরও ব্যয়বহুল করে তোলা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, নিউইয়র্কে গত কয়েক বছরে আবাসন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। শহরের বহু এলাকায় গড় ভাড়া রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ শহর ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন, আর গৃহহীন মানুষের সংখ্যাও বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন আবাসন নির্মাণ, ভাড়া নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি বিনিয়োগ এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে সংকট কিছুটা কমতে পারে। তবে সমালোচকদের মতে, শুধু পরিকল্পনা ঘোষণা যথেষ্ট নয়; জমি, নির্মাণ ব্যয়, রাজনৈতিক বিরোধিতা এবং ডেমোক্র‍্যাটিক জটিলতা অতিক্রম করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তারপরও মেয়র মামদানির এই ঘোষণা নিউইয়র্কের আবাসন নীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। নগরীর ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ আবাসন কর্মসূচি হিসেবে এটি বাস্তবায়িত হলে লাখো মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

শেয়ার করুন