২৮ মে ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ০১:২৬:১৫ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
অ্যাডভান্সড প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসার চিকিৎসায় যুগান্তকারী অগ্রগতি ইসলামবিদ্বেষী গ্রাফিতি ঘিরে মুসলিম কম্যুনিটিতে আতঙ্ক যুক্তরাষ্ট্রে মর্টগেজ সুদের হার ৯ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ইসরায়েল ডে প্যারেড বর্জনের ঘোষণা জোহরান মামদানির ওজনপার্ক মসজিদ আল-আমানের নতুন কমিটির অভিষেক অনুষ্ঠিত ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতেই চলবে ভিসা ও অভিবাসন ব্যবস্থা, বললেন রুবিও নিউইয়র্কে ২০২৬-২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য এক্সেলসিয়র স্কলারশিপ আবেদন শুরু ৪ লাখ সাশ্রয়ী আবাসনের পরিকল্পনা ঘোষণা মেয়রের উপকূলের ১৯ জেলার প্রাণ-প্রকৃতি ঝুঁকিতে মাহমুদ খলিলকে ডিপোর্ট ঠেকাতে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার প্রস্তুতি


অ্যাডভান্সড প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসার চিকিৎসায় যুগান্তকারী অগ্রগতি
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৮-০৫-২০২৬
অ্যাডভান্সড প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসার চিকিৎসায় যুগান্তকারী অগ্রগতি ডারাক্সোনরাসিব দীর্ঘদিন ধরে অচিকিৎসাযোগ্য হিসেবে পরিচিত আরএএস প্রোটিনকে লক্ষ্য করে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে


অ্যাডভান্সড বা ছড়িয়ে পড়া প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসারের চিকিৎসায় এক নতুন ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি চিকিৎসা জগতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পরীক্ষামূলক একটি ওষুধ ডারাক্সোনরাসিবের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে রোগীদের বেঁচে থাকার সময় প্রায় দ্বিগুণ করেছে বলে গবেষণায় দেখা গেছে। চিকিৎসক ও গবেষকদের মতে, এ ফলাফল প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসার চিকিৎসার ধারা বদলে দিতে পারে। এ ওষুধটি তৈরি করেছে বায়োফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি রেভল্যুশন মেডিসিনস। ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) ওষুধটিকে দ্রুত অনুমোদনের পথে রেখেছে। সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গুরুতর রোগীদের জন্য ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের বাইরে সীমিতভাবে ওষুধটি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যা এক্সপ্যানডেড অ্যাকসেস প্রোগ্রাম নামে পরিচিত। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলছেন, এ সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে ওষুধটি নিয়ে আশাবাদ দ্রুত বাড়ছে। ৬ মে রেভল্যুশন মেডিসিনস তাদের ফেজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশ করে, যেখানে দেখা যায়, যেসব রোগী কেমোথেরাপির সঙ্গে ডারাক্সোনরাসিব গ্রহণ করেছেন, তাদের বেঁচে থাকার সময় কেবল কেমোথেরাপি নেওয়া রোগীদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। 

এর আগে প্রকাশিত ফেজ-১ ও ফেজ-২ ট্রায়ালের ফলাফল সম্প্রতি বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ চিকিৎসা জার্নাল নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, যেসব রোগীর ক্যানসার শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়েছিল, তাদের ক্ষেত্রে এ ওষুধ টিউমারের অগ্রগতি আট মাসেরও বেশি সময় থামিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে এবং অনেক রোগী প্রায় দেড় বছর পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। এ ফলাফলকে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা অসাধারণ অগ্রগতি হিসেবে বর্ণনা করছেন। 

প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসার সাধারণত অত্যন্ত আগ্রাসী একটি রোগ, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেরিতে ধরা পড়ে। ফলে চিকিৎসার সুযোগ সীমিত থাকে এবং বেঁচে থাকার হারও খুব কম। গবেষকদের মতে, এ ওষুধের লক্ষ্য হলো আরএএস নামের একটি প্রোটিন। এ প্রোটিন মানবদেহে কোষের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসারের ৯০ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে এ জিনে মিউটেশন দেখা যায়, যার ফলে আরএএস প্রোটিন সব সময় চালু অবস্থায় থেকে কোষকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে সাহায্য করে। এটি ক্যানসার চিকিৎসায় দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। আরএএস প্রোটিনকে অনেক বছর ধরে অচিকিৎসাযোগ্য বা ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করা অসম্ভব। ডারাক্সোনরাসিব এ সমস্যার একটি নতুন সমাধান দিয়েছে। এটি কোষের ভেতরে সাইক্লোফিলিন এ নামের আরেকটি প্রোটিনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি মলিকুলার গ্লু তৈরি করে, যা আরএএস প্রোটিনকে আটকে দেয় এবং তার ক্ষতিকর কার্যকলাপ বন্ধ করে দেয়। এ নতুন পদ্ধতিকে গবেষকরা ক্যানসার চিকিৎসায় একটি বৈপ্লবিক পন্থা হিসেবে দেখছেন। 

ফেজ-১/২ ট্রায়ালে মোট ১৬৮ জন রোগী অংশ নেন, যাদের ক্যানসার ইতোমধ্যেই শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়েছিল। তারা আগে থেকেই কেমোথেরাপি গ্রহণ করেছিলেন। উচ্চ ডোজ গ্রহণকারী রোগীদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ক্যানসার অগ্রসর না হওয়ার গড় সময় ছিল প্রায় ৮ দশমিক ১ মাস। আর সামগ্রিকভাবে বেঁচে থাকার সময় দাঁড়ায় প্রায় ১৫ দশমিক ৬ মাস। অন্যদিকে ফেজ-৩ ট্রায়ালের প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যায়, শুধু কেমোথেরাপি নেওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে গড় বেঁচে থাকার সময় ছিল ৬ দশমিক ৭ মাস, যেখানে কেমোথেরাপি ও ডারাক্সোনরাসিব একসঙ্গে নেওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে এটি বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ২ মাস। এ পরিসংখ্যান চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ব্যাপক আশাবাদ তৈরি করেছে। 

যদিও ওষুধটি অত্যন্ত কার্যকর বলে দেখা যাচ্ছে, তবে এর কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে। রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে তীব্র র‍্যাশ, যা অনেকটা গুরুতর সানবার্নের মতো। এছাড়া মুখ ও গলার ঘা, বমি এবং ডায়রিয়াও দেখা গেছে। কিছু ক্ষেত্রে রোগীদের সাময়িকভাবে ওষুধ বন্ধ রাখতে হয়েছে। প্রায় ৩০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা গেছে এবং আটজন রোগী ট্রায়াল থেকে সরে যেতে বাধ্য হন। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, কেমোথেরাপির তুলনায় এ ওষুধ অনেক বেশি সহনীয় এবং অনেক রোগী এটিকে দৈনন্দিন জীবনযাপনের জন্য সহজ মনে করেন, কারণ এটি মুখে খাওয়ার ট্যাবলেট আকারে গ্রহণ করা যায়। 

বিভিন্ন ক্যানসার বিশেষজ্ঞ এ ফলাফলকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখছেন। ডা. ব্রায়ান ওলপিন বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসারের নতুন চিকিৎসা খুঁজে চলেছি। এটি একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। তিনি আরো বলেন, এ ফলাফল চিকিৎসা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করবে। অন্যদিকে ডা. রেজা নাজেমজাদেহ বলেন, নতুন ওষুধটি গত এক দশকে প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তিনি উল্লেখ করেন, অতীতে অনেক নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি অতিরঞ্জিত প্রত্যাশা তৈরি করলেও এ ওষুধ বাস্তবে কার্যকর প্রমাণ দিচ্ছে। আরেক বিশেষজ্ঞ ডা. শেখর পদ্মনাভান বলেন, এ অগ্রগতি ভবিষ্যতে কেমোথেরাপির ভূমিকা পুনর্বিবেচনার সুযোগ তৈরি করতে পারে। 

যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর প্রায় ৬৭ হাজার মানুষ প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসারে আক্রান্ত হন। এর মধ্যে অধিকাংশ রোগীই দেরিতে শনাক্ত হন, কারণ প্রাথমিক লক্ষণগুলো খুব অস্পষ্ট। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাত্র ৩ শতাংশ রোগী পাঁচ বছর বেঁচে থাকেন। প্রতি বছর প্রায় ৫২ হাজার মানুষ এ রোগে মারা যান। এ বাস্তবতায় নতুন ওষুধটি চিকিৎসা জগতে আশার আলো হিসেবে দেখা হচ্ছে। 

গবেষকরা এখন দেখছেন, এ ওষুধটি শুধু প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসার নয়, বরং অন্যান্য আরএএস মিউটেশনযুক্ত ক্যানসার, যেমন কোলোরেক্টাল এবং ফুসফুসের ক্যানসারেও কার্যকর হতে পারে কি না। এছাড়া গবেষণা চলছে এটি প্রথম ধাপের চিকিৎসা হিসেবেও ব্যবহার করা যায় কি না, অর্থাৎ কেমোথেরাপির আগেই বা তার সঙ্গে শুরু থেকেই ব্যবহার করা সম্ভব কি না। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি ভবিষ্যতের গবেষণায় একই ধরনের ফলাফল পাওয়া যায়, তবে এটি ক্যানসার চিকিৎসার একটি নতুন যুগের সূচনা হতে পারে। 

ডারাক্সোনরাসিব নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফল চিকিৎসা বিজ্ঞানে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যদিও এখনো এটি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে এবং সম্পূর্ণ অনুমোদনের অপেক্ষায়, তবুও এর প্রাথমিক ফলাফল রোগী ও চিকিৎসকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে যেই রোগকে সবচেয়ে কঠিন ও সীমিত চিকিৎসাযোগ্য ক্যানসারগুলোর একটি হিসেবে দেখা হতো, সেই প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসারের ক্ষেত্রে এটি একটি সম্ভাব্য গেম চেঞ্জার হতে পারে। 

শেয়ার করুন