২৮ মে ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ০১:২৫:৪৩ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
অ্যাডভান্সড প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসার চিকিৎসায় যুগান্তকারী অগ্রগতি ইসলামবিদ্বেষী গ্রাফিতি ঘিরে মুসলিম কম্যুনিটিতে আতঙ্ক যুক্তরাষ্ট্রে মর্টগেজ সুদের হার ৯ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ইসরায়েল ডে প্যারেড বর্জনের ঘোষণা জোহরান মামদানির ওজনপার্ক মসজিদ আল-আমানের নতুন কমিটির অভিষেক অনুষ্ঠিত ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতেই চলবে ভিসা ও অভিবাসন ব্যবস্থা, বললেন রুবিও নিউইয়র্কে ২০২৬-২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য এক্সেলসিয়র স্কলারশিপ আবেদন শুরু ৪ লাখ সাশ্রয়ী আবাসনের পরিকল্পনা ঘোষণা মেয়রের উপকূলের ১৯ জেলার প্রাণ-প্রকৃতি ঝুঁকিতে মাহমুদ খলিলকে ডিপোর্ট ঠেকাতে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার প্রস্তুতি


চার দিনব্যাপী মুক্তধারার বইমেলার সমাপ্ত
প্রবাসে বাঙালিরা রাজনৈতিক ও কালচারাল শক্তিতে রূপলাভ করবে
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৮-০৫-২০২৬
প্রবাসে বাঙালিরা রাজনৈতিক ও কালচারাল শক্তিতে রূপলাভ করবে ফিতা কেটে বইমেলার উদ্বোধন করছেন ইমদাদুল হক মিলন


আজ থেকে ৩৫ বছর আগে মুক্তধারা এ বইমেলা শুরু করেছিল। এখন এ প্রবাসে অনেক বাঙালি। আপনারা এখন মালটিকালচারে বসবাস করছেন, নতুন প্রজন্ম বড় হচ্ছে। এ বইমেলা যদি আরো ৩৫ বছর চলে এবং বাঙালির অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকে, তাহলে বাঙালিরা রাজনৈতিক এবং কালচারাল শক্তিতে রূপলাভ করবে। মুক্তধারা আয়োজিত চার দিনব্যাপী বইমেলায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক রেহমান সোবহান এসব কথা বলেন। 

জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারে গত ২২ মে ফিতা কেটে বইমেলার উদ্বোধন করেন উপন্যাসিক ইমদাদুল হক মিলন এবং ২৫ মে সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বইমেলার সমাপ্তি ঘোষণা করেন মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক জিয়াউদ্দিন আহমেদ, আহ্বায়ক ড. নজরুল ইসলাম ও মুক্তধারার প্রেসিডেন্ট বিশ্বজিত সাহা। সাংবাদিক এহসান জুয়েলের পরিচালনায় বইমেলায় সম্মানিত অতিথি ছিলেন অধ্যাপক ড. রওনক জাহান, চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, দীপেন ভট্টাচার্য্য, কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসেন, আমেরিকান কবি বব হোলম্যান, সুবোধ সরকার ফারুক মাইনউদ্দীন, প্রকাশক মনিরুর হক, সাংবাদিক আশরাফ কায়সার, বিরূপাক্ষ পাল। ফিতা কাটার পূর্বে প্রাক-উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংগীত এবং নৃত্য পরিবেশন করা হয়। সূচনা পর্বে ছিল মোবরাক হোসেন ঢোল। মালবিকা চ্যাটার্জির নির্দেশনায় সংগীত সাধনার শিল্পীদের পরিবেশনা। জন্মশতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করা হয় প্রয়াত শামসুদ্দীন আবুল কালাম, মহাশ্বেতা দেবী ও তপন রায় চৌধুরীকে। শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ইমদাদুল হক মিলন, ডা. জিয়া উদ্দিন আহমেদ ও আব্দুন নূর। কথা সাহিত্যিক মহাশ্বেতা বেদীর রচনাবলী থেকে পাঠ করেন রোকেয়া লফিক বেবি, তপন রায় চৌধুরীর বাঙালনামা থেকে পাঠ করেন শহিদুল আলম সাচ্চু এবং শামসুদ্দীন আবুল কালাম স্মরণ সংগীত পরিবেশন করেন পাপি মনা ও তার দল। চন্দ্র ব্যানার্জির নির্দেশনায় ছিল নৃত্যাঞ্জলির নৃত্য পরিবেশনা। বইমেলা নিয়ে সংগীত পরিশেন করে মহিতোষ তালুকদার তাপসসহ একদল শিল্পী। 

খোলা প্রাঙ্গণে ফিতা কেটে বইমেলার উদ্বোধনের পর মূল অনুষ্ঠান ছিল অডিটোরিয়ামের ভিতরে। সেখানে ৩৫টি মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে বইমেলার আরেকটি উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সবাইকে উত্তরীয় পরিয়ে দেওয়া হয়। 

প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, আজ থেকে ৩৫ বছর আগে মুক্তধারা এই বইমেলা শুরু করেছিল। এখন এই প্রবাসে অনেক বাঙালি। আপনারা এখন মালটিকালচারে বসবাস করছেন, নতুন প্রজন্ম বড় হচ্ছে এ কালচারের মধ্যে। তাদের এখন দুটো কালচার। একটি হচ্ছে বাঙালি কালচার, আরেকটি হচ্ছে আমেরিকান কালচার। বাঙালিরা এখন আমেরিকায় অনেক ভালো রোল প্লে করছে। এবার নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনে আপনারা জোহরান মামদানিকে নির্বাচিত করেছেন। এখানে বাঙালিদের বিরাট ভূমিকা ছিল। সেই দিক থেকে বলা যায় প্রবাসে এখন বাঙালিরা সোশ্যালি এবং পলিটিক্যালি একটি ফোর্স। তিনি বলেন, এসব অনুষ্ঠানে আপনারা বিদেশিদেরও আমন্ত্রণ করবেন, তাদের নিয়ে আসবেন। নিজেদের কালচার, শিল্পী সাহিত্য এবং সংস্কৃতি তুলে ধরবেন। মুক্তধারা ফাউন্ডেশন সে কাজটি করছে। তাদের আনলে তারা আমাদেদর কালচার, সাহিত্য এবং সংস্কৃতি জানবে। আরো ৩৫ বছর এভাবে চলতে থাকলে প্রবাসে বাঙালিরা রাজনৈতিক ও কালচারাল শক্তিতে রূপলাভ করবে। 

ইমদাদুল হক মিলন বলেন, আজ থেকে ২৫ বছর আগের কথা। মুক্তধারার বইমেলায় চারজন একসঙ্গে এসেছিলাম। তার মধ্যে ছিলেন প্রায়ত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, হুমায়ুন আহমেদ, সমরেশ মজুমদার এবং আমি ইমদাদুল হক মিলন। সেটা ছিল আমার কাছে স্মরণীয় এবং একটি ঐতিহাসিক ব্যাপার। বিশ্বজিতের পক্ষেই এটা সম্ভব। তিনি বলেন, এ বইমেলায় এলে বাংলাদেশকে গভীরভাবে দেখা যায়। বিশ্বজিতের সঙ্গে আমার দেশ থেকেই সম্পর্ক। তার পুরো জীবনটাই বই নিয়ে কেটেছে। বাংলাদেশের ন্যায় এখানে এসেও বইমেলা শুরু করেছে। আজকে নিউ ইয়র্ক বইমেলা বিশাল আকার লাভ করেছে, এখানে এসে অনেক প্রিয়জনকে দেখতে পেলাম, বাংলাদেশকে দেখতে পেলাম। তিনি বলেন, আমি মনে করি আমরা বাঙালিরা আমাদের মতই বাঁচবো- যেদেশেই থাকি না কেন। আমরা আমাদের বইকে লালন করবো, সংস্কৃতিকে লালন করবো- এটাই বিস্ময়কর। নতুন প্রজন্মের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, আমাদের চিন্তিত হবারও কথা রয়েছে। বাংলা একাডেমি হয়েছিল ভাল ভাল বইগুলোকে ট্রান্সলেট করার জন্য, কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যে সেটা হয়। আমি মুক্তধারার কাছে প্রস্তাব রাখবো বাংলা সাহিত্যের ভালো বইগুলোকে যেন ট্রান্সেলেট করা হয়। তাতে করে আমাদের নতুন প্রজন্ম হারিয়ে যাবে না, শিকড়ের সঙ্গেই থাকবে। বাংলা একাডেমি পারেনি, আশা করি মুক্তধারা ফাউন্ডেশন পারবে। 

ড. রওনক জাহান বলেন, বাংলাভাষায় যারা লিখছেন তাদের জন্য মুক্তধারা এই সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। বইমেলা ঢাকা, কলকাতা ছাড়া মনে হয় নিউ ইয়র্কেই হয়, লন্ডনসহ অন্যান্য শহরে হয় কি না আমি জানি না। ৩৫ বছর ধরে বইমেলা চালিয়ে যাবার জন্য মুক্তধারাকে ধন্যবাদ। অনুষ্ঠানে এসে আমি দেখলাম আমাদের নতুন প্রজন্ম নৃত্য পরিবেশন করছে, প্রচন্ড ভাল লেগেছে। কিন্তু তারা বই বাংলা বই পড়ছে কি না, আমি জানি না। তিনি বলেন, এ বিশ্বে সাড়ে তিন মিলিয়ে লোক বাংলা ভাষায় কথা বলে। এটা বিশ্বের ৬ষ্ঠ বৃহৎ ভাষা। তিনি বলেন, আরো বই প্রকাশ করা উচিত, তবে সমাজ বিজ্ঞানের বই কম। তাছাড়া আমাদের ট্রান্সলেশন খুই দুর্বল, বাংলাভাষা ভালো বইগুলোর ট্রান্সলেশন প্রয়োজন। 

বব হোলম্যান বলেন, এখানে এসে আমার কাছে মনে হয়েছে, আপনাদের মধ্যে বইপ্রেমিক বেশি, যার অন্য কম্যুনিটিতে দেখা যায় না। 

সাদাত হোসেন বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেন লেখা হবে তা নিয়ে বিতর্ক ছিল, এখন কিন্তু সে বিতর্ক নেই। কারণ প্রথমে আমরা পরিবর্তন নিতে পারতাম না। তিনি বলেন, আমি গ্রামে বড় হয়েছি। বিভিন্ন মৌসুমে বিভিন্ন চালের ভাত খেয়েছি, এখন নেই। হঠাৎ দেখি দেশি মুরগি, ব্রয়লার মুরগি। প্রথম অনেকেই খেয়েছে, কিন্তু দিনশেষে এখন অরগানিক খুঁজছে। 

অনুষ্ঠানে রেহমান সোবহানকে আজীন সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়। সম্মাননা তুলে দেন বিশ্বজিত সাহা, রোকেয়া হায়দার, ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদ, ড. নজরুল ইসলাম। নজরুল ইসলামের পরিচালনায় ছিল রেহমান সোবহান ও ড. রওনক জাহানের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান বাংলাদেশ ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে কথোপকথন। ছিল অতিথি কবিদের পরিবেশনা। ছিলেন মোস্তফা সারওয়ার, সুবোধ সরকার, গৌতম দত্ত, শামস আল মমীন, কৌশিক সেন, জাফর আহমেদ রাশেদ, দর্পন কবীর, রুদ্র শঙ্কর ও ফারুক আহমেদ। মুক্তধারার গৌরবোজ্জ্বল ৩৫ বছর নিয়ে ছিল প্রমাণ্য চিত্রপ্রদর্শনী। প্রবাসের জনপ্রিয় শিল্পী শাহ মাহবুবের সংগীতর মাধ্যমে শেষ হয় প্রথম দিনের অনুষ্ঠান। 

বইমেলার দ্বিতীয় দিন

নিউ ইয়র্কে ৩৫তম আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার দ্বিতীয় দিন গত ২২ ঝড়বৃষ্টি উপেক্ষা করে বিপুলসংখ্যক মানুষ ছুটে এসেছিলেন জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারে। বইপ্রেমী, লেখক, শিল্পী ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের উপস্থিতিতে মেলা প্রাঙ্গণ দিনভর ছিল সরব। সত্যি কথা বলতে কী এদিন বৃষ্টি এবং প্রচণ্ড ঠান্ডার কারণে বইয়ের স্টলগুলো ছিল ফাঁকা। কিন্তু সংগীতপ্রেমী বেশি থাকার কারণে অডিটোরিয়াম ছিল ভর্তি। মে মাসে বইমেলা বৃষ্টির ছোবল থাকে। এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করা হলেও উদ্যোক্তাদের ছিল খোঁড়া যুক্তি। একসঙ্গে এভাবে চারদিন পাওয়া যায় না। চারদিনের দরকার কী তিনদিন জনজমাট বইমেলা সবার কাম্য। বইমেলার মূল উদ্দেশ্য যদি বই বিক্রি হয়, তাহলে বিষয়টি নিয়ে আয়োজকদের চিন্তা করা উচিত। অনেক প্রকাশক বাংলাদেশ থেকে এসেছেন, তাদের অভিযোগ ছিল। কারো কারো মতে চারদিনের বইমেলায় যদি দুদিন বৃষ্টি থাকে। বিচার বিবেচনা করলে দুদিন মেলা হলো আর দুদিন বৃষ্টিতে ভেসে গেল। সেই সঙ্গে গিফট ছিল ঠান্ডা। বিনা পয়সায় সর্দি জ্বরের ব্যবস্থা। 

দ্বিতীয় দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল সাহিত্য অনুষ্ঠান ‘কলম ও কৌতূহল’। এতে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাদাত হোসাইন, দীপেন ভট্টাচার্য, কৌশিক সেন, আশরাফ কায়সার ও রাজু আলাউদ্দিন। সঞ্চালনা করেন পারমিতা হিম। 

এদিন মেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় বিতর্ক প্রতিযোগিতা। ‘প্রবাসজীবন-বাঙালিকে দিয়েছে বাণিজ্যিকতা, কেড়ে নিয়েছে আন্তরিকতা’ শীর্ষক এ বিতর্কে বিপক্ষ দলের দলনেতা বিরূপাক্ষ পালের ব্যঙ্গ-রসাত্মক যুক্তি দর্শকদের আনন্দ দেয়। অংশ নেন কাবেরী মৈত্রেয়, শামীম রেজা, মোহাম্মদ নাকিবউদ্দিন, বাবু কামরুজ্জামান, নাজনীন আহমেদ ও বিরূপাক্ষ পাল। 

পরে রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী অদিতি মহসিনের সুরেলা পরিবেশনায় দর্শক-শ্রোতারা রাত ১১টা পর্যন্ত মুগ্ধ হয়ে থাকেন। 

আয়োজকরা জানান, প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে, বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি প্রবাসী বাঙালিদের ভালোবাসা এখনো অটুট। বইমেলা শুধু বই কেনাবেচার স্থান নয়, এটি এখন প্রবাসে বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় ও মিলনমঞ্চে পরিণত হয়েছে। এ দিন ছিল নতুন বই পরিচিতি। অংশগ্রহণ করেন আশিক মুস্তফা, সৌরভ শিকদার, বদরুজ্জামান রুহেল, বনানী সিনহা, গোপন দাস, শারফুল আলম, এ মোহিত, আহবাব চৌধুরী খোকন, এসরাত জাহান বর্ণা, মোহাম্মদ আজাদ ও বিমল সরকার। পরিচালনায় ছিলেন আব্দুল্লাহ জাহিদ, ফারুক আজম ও কবির কিরণ। 

কাব্যের কোলাহলে অংশ নেন মোস্তফা সারওয়ার, রানু ফেরদৌস, ফিরোজ হুমায়ুন, জুলি রহমান, জান্নাতুল ফেরদৌস, হুমায়ুন কবীর ঢালি, মনিজা রহমান, সুরীত বড়ুয়া, ছন্দা বিনতে সুলতান, স্বপন বিশ্বাস, তাহমিনা খান, মহিবুর রহমান, বিমল সরকার, শামসুন ফৌজিয়া, হুমায়ুন কবির, মাকনুদা আহমেদ, কুলসুম আক্তার সুমী, শারফুল আলম, আরিফ আহমেদ, সোমা রোজারিও, এসরাত জাহান ও এবিএম সালেহ উদ্দীন। উপস্থাপনায় ছিলেন দিমা নেফারতিতি, যামিনী ইয়ং ও রাশেদা আক্তার। রবীন্দ্রনাথে রক্তবরবীতে চমৎকার উপস্থাপন করেন অভিনেত্রী শিরিন বকুল। সীমার মাঝে অসীম-অদিতি মহসীনের পরিবেশনায় দ্বিতীয় দিন শেষ হয়। 

সাহিত্য পুরস্কার পেলেন ড. আব্দুন নূর

কথাসাহিত্যিক, গবেষক ও ঔপন্যাসিক ড. আবদুন নূর বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠানরত ‘৩৫তম আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার’ ‘মুক্তধারা-জিএফবি সাহিত্য পুরস্কার’ পেয়েছেন। গত রোববার সন্ধ্যায় বইমেলার তৃতীয় দিনে মূলমঞ্চে নগদ তিন হাজার ডলারসহ এ সম্মাননা ক্রেস্ট ড. আব্দুন নূরকে প্রদান করেন বইমেলার আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক ড. নজরুল ইসলাম এবং জিএফবি গ্রুপের চেয়ারপারসন গোলাম ফারুক ভূঁইয়া। 

উল্লেখ্য, বেশ ক’বছর আগে সাহিত্য ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্যে এ পুরস্কার প্রবর্তন করেছে ‘আন্তর্জাতিক বইমেলা’ কমিটি এবং তার পুরো অর্থ প্রদান করছে নিউজার্সিভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জিএফবি গ্রুপ। 

বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে অবসরগ্রহণকারী ৮৭ বছর বয়সী ড. আব্দুন নূর গত বছরের ৩৪তম আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলায় ‘আজীবন সম্মাননা’ পদক লাভ করেছিলেন। যেটি এ বছর পেয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও অধ্যাপক রেহমান সোবহান। ড. আব্দুন নূর ওয়াশিংটন ডিসিতে দীর্ঘ সময় বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ হিসেবে যুক্ত থাকলেও ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকাল থেকেই লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত আছেন। তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে প্যাগাসাস, শূন্যবৃত্ত, বিচলিত সময়, ঢাকা শহর ঘিরে এবং চার দেওয়াল। তার উপন্যাসগুলোতে প্রবাসে বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম এবং ব্রিটিশ আমলে চুক্তিবদ্ধ দাসপ্রথা ও বাঙালিদের জীবনযাত্রার ইতিহাস বিস্তারিতভাবে উপস্থাপিত হওয়ায় মানবাধিকারের প্রশ্নটি জোরালোভাবে সামনে এসেছিল। 

তৃতীয় দিনে আরো ছিল অতিথি লেখকদের পরিবেশনা, স্বরচিত কবিতা পাঠের আসর, বই নিয়ে আলোচনা, আবৃত্তি, বাংলা সাহিত্যে সমকামিতা, ৩৫ বছরে বইমেলার সার্থকতা ও অর্জন, পরিবেশন করা হয় শিব্বির আহমেদ রচিত বইমেলার গান।

শেষ দিনে ছিলো উৎসবমুখর পরিবেশ

নিউ ইয়র্কে চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত ৩৫তম নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার সমাপ্তি হয়েছে উৎসবমুখর ও বর্ণাঢ্য পরিবেশে। সোমবার (২৫ মে) জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারে অনুষ্ঠিত সমাপনী দিনের আয়োজনে সকাল থেকেই ছিল দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। বইপ্রেমী, লেখক, প্রকাশক, শিল্পী, গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী এবং নতুন প্রজন্মের পাঠকদের প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে পুরো বইমেলা প্রাঙ্গণ পরিণত হয় এক মিলনমেলায়।

শেষ দিন ঘোষিত “চিত্তরঞ্জন সাহা শ্রেষ্ঠ প্রকাশনা পুরস্কার” অর্জন করে বাতিঘর। পুরস্কার ঘোষণা ও সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে মিলনায়তন। অনুষ্ঠানে মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারা বাংলা প্রকাশনা শিল্পে অবদানের জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রশংসা করেন। একই দিনে অনুষ্ঠিত হয় ইমদাদুল হক মিলনের স্মারক বক্তৃতা, জীবনানন্দ দাশ বিষয়ক আলোচনা এবং নজরুলের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বিশেষ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।

সমাপনী দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইনের মুখোমুখি অনুষ্ঠান। “কলম ও কৌতূহল”শীর্ষক এই সাহিত্য আড্ডায় দর্শকদের ছিল উপচে পড়া ভিড়। সাহিত্য, নতুন প্রজন্মের পাঠাভ্যাস, সামাজিক পরিবর্তন, লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং সৃজনশীলতার নানা দিক নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা হয়। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন বিশ্বজিত সাহা। দর্শকদের প্রশ্নোত্তর পর্বও ছিল অত্যন্ত প্রাণবন্ত।

শেষ দিনটি কার্যত শিশু-কিশোর ও যুবাদের উৎসবে রূপ নেয়। দিনব্যাপী রং-তুলিতে শিশু-কিশোর-যুব উৎসব, ছোটদের গল্পলেখার কর্মশালা, সংগীত, নৃত্য, কবিতা আবৃত্তি এবং তরুণদের লেখালেখি বিষয়ক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ বইমেলার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ সৃষ্টি করে।

বিশেষভাবে দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে “সৃজনশীলতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)”শীর্ষক অনুষ্ঠান। শতাধিক টিনএজার ও তরুণ সেখানে অংশ নিয়ে সাহিত্য, প্রযুক্তি, ভবিষ্যতের শিক্ষা, মানবসৃজনশীলতা এবং এআই-এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করে। তরুণদের অংশগ্রহণে এই সেশনটি বইমেলার অন্যতম আলোচিত পর্বে পরিণত হয়। বক্তারা বলেন, ভবিষ্যতের সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও মানবিক বোধ, সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক শিকড়কে ধরে রাখাই হবে আগামী প্রজন্মের বড় চ্যালেঞ্জ।

শেষ দিনের আবহাওয়াও ছিল মনোরম। টানা দুই দিনের বৃষ্টির পর উজ্জ্বল রোদ ও সুন্দর আবহাওয়ায় দর্শনার্থীদের উপস্থিতি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বইমেলার বিভিন্ন স্টলে ছিল ব্যাপক বই বিক্রি। প্রকাশকরা জানান, শেষ দিনে পাঠকদের আগ্রহ ও বিক্রি ছিল অত্যন্ত সন্তোষজনক। বিশেষ করে নতুন বই, গবেষণাগ্রন্থ, শিশুতোষ বই এবং প্রবাসজীবনভিত্তিক প্রকাশনাগুলোর প্রতি পাঠকদের আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো।

সমাপনী অনুষ্ঠানে আগামী বছরের ৩৬তম নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার তারিখও ঘোষণা করা হয়। জানানো হয়, ২০২৭ সালের বইমেলা অনুষ্ঠিত হবে আগামী ২১ মে থেকে ২৪ মে পর্যন্ত।

চার দিনের এই বইমেলা আবারও প্রমাণ করলো- বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি শুধু ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাঙালির হৃদয়ে এটি এক জীবন্ত সাংস্কৃতিক বন্ধন। নিউ ইয়র্কের এই বইমেলা এখন শুধু একটি বইমেলা নয়, বরং প্রবাসে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।

শেয়ার করুন