১৩ মে ২০২৬, বুধবার, ০৬:৫৬:৫৫ অপরাহ্ন


ট্রাম্পের ওপর হামলার ঘটনাগুলো সাজানো, বিশ্বাস বহু মার্কিনির
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৩-০৫-২০২৬
ট্রাম্পের ওপর হামলার ঘটনাগুলো সাজানো, বিশ্বাস বহু মার্কিনির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং সন্দেহভাজন কোল টমাস অ্যালেন


যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক সহিংসতা ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নিয়ে উদ্বেগ আরো গভীর হয়েছে নতুন এক জরিপ প্রকাশের পর। জরিপে দেখা গেছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে সংঘটিত সাম্প্রতিক হত্যাচেষ্টা বা হামলার ঘটনাগুলো সাজানো ছিল বলে বিশ্বাস করেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মার্কিনি। অনলাইন সংবাদমাধ্যমের নির্ভরযোগ্যতা মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান নিউজ-গার্ড প্রকাশিত জরিপ অনুযায়ী, প্রায় প্রতি চারজন মার্কিন নাগরিকের একজন মনে করেন, গত এপ্রিলে হোয়াইট হাউস করেসপনডেন্টস ডিনারে ঘটে যাওয়া গুলির ঘটনা ছিল সাজানো নাটক। জরিপে সবচেয়ে বড় বিস্ময়কর তথ্য হলো রাজনৈতিক বিভাজন। ডেমোক্র‍্যাট সমর্থকদের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিশ্বাস করেন যে ঘটনাটি পরিকল্পিতভাবে সাজানো হয়েছিল। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের মধ্যে এমন বিশ্বাসের হার অনেক কম-প্রায় আটজনে একজন।

গত এপ্রিলে ওয়াশিংটন হিলটন হোটেলে অনুষ্ঠিত হোয়াইট হাউস করেসপনডেন্টস ডিনারে গুলির ঘটনা ঘটে। পরে ফেডারেল গ্র‍্যান্ড জুরি অভিযুক্ত বন্দুকধারী কোল টমাস অ্যালেনের বিরুদ্ধে চারটি ফৌজদারি অভিযোগ আনে, যার মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগও রয়েছে।

ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ে। এসব দাবিতে বলা হয়, ট্রাম্প প্রশাসন জনসমর্থন বাড়ানো, রিপাবলিকান পার্টিকে রাজনৈতিকভাবে লাভবান করা এবং হোয়াইট হাউসের পরিকল্পিত বলরুম প্রকল্পের পক্ষে জনমত তৈরির জন্য ঘটনাটি সাজিয়েছে।তবে এখন পর্যন্ত এমন দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ইউ-গভ পরিচালিত এই জরিপে ১ হাজার মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ক অংশ নেন। জরিপটি ২৮ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত পরিচালিত হয়। ফলাফলে দেখা যায়: ২৪ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন করেসপন্ডেন্টস ডিনারের হামলার ঘটনা সাজানো ছিল। ৪৫ শতাংশ বিশ্বাস করেন ঘটনাটি বাস্তব। বাকি ৩২ শতাংশ নিশ্চিত নন। জরিপে আরো দেখা যায়, ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসের প্রবণতা বেশি।

২০২৪ সালে ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে আরো দুটি হামলার ঘটনা ঘটেছিল। একটি হয়েছিল বাটলারে নির্বাচনী সমাবেশে এবং অন্যটি ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল গলফ ক্লাবে।। জরিপে দেখা যায়, পেনসিলভানিয়ার বাটলার হামলাটি সাজানো ছিল বলে বিশ্বাস করেন ২৪ শতাংশ উত্তরদাতা। ডেমোক্র‍্যাটদের মধ্যে এ হার ছিল ৪২ শতাংশ, যেখানে রিপাবলিকানদের মধ্যে মাত্র ৭ শতাংশ। অন্যদিকে ফ্লোরিডার গলফ ক্লাব হামলাটি সাজানো ছিল বলে মনে করেন ১৬ শতাংশ আমেরিকান। ডেমোক্র‍্যাটদের মধ্যে এই হার ২৬ শতাংশ, রিপাবলিকানদের মধ্যে ৭ শতাংশ। সব মিলিয়ে জরিপে অংশ নেওয়া ডেমোক্র‍্যাটদের ২১ শতাংশ বিশ্বাস করেন, ট্রাম্পকে ঘিরে তিনটি ঘটনাই সাজানো ছিল। স্বাধীন ভোটারদের মধ্যে এ হার ১১ শতাংশ এবং রিপাবলিকানদের মধ্যে মাত্র ৩ শতাংশ।

নিউজ গার্ডের সম্পাদক সোফিয়া রুবিনসন বলেন, এ ফলাফল মার্কিন সমাজে সরকার ও গণমাধ্যমের প্রতি বাড়তে থাকা অনাস্থার প্রতিফলন। তার ভাষায়, রাজনৈতিক বিভাজনের সব পক্ষের মানুষই এখন প্রশাসন ও মিডিয়ার ওপর আস্থা হারাচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে তারা অনলাইনে যাচাইবিহীন তথ্য সহজে বিশ্বাস করছে। হোয়াইট হাউস এসব ষড়যন্ত্র তত্ত্ব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র ডেভিস ইঙ্গল বলেন, যে কেউ মনে করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই নিজের হত্যাচেষ্টা সাজিয়েছেন, সে সম্পূর্ণ নির্বোধ।

বোস্টন ইউনিভার্সিটির মিডিয়া ম্যানিপুলেশন গবেষক অধ্যাপক জোয়ান ডোনোভান বলেন, ট্রাম্পের রাজনৈতিক শৈলীতে ‘শোম্যানশিপ’ বা নাটকীয় উপস্থাপনার প্রভাব এতোটাই বেশি যে অনেক মানুষ সহজেই এসব ঘটনার সত্যতা নিয়ে সন্দেহ করছে।তিনি বলেন, অনেকের কাছে বিষয়টি হলিউড সিনেমার মতো মনে হয়। পুরো সরকারি কাঠামো যেন এখন একটি রিয়েলিটি টিভি শোতে পরিণত হয়েছে। তবে তিনি আরো বলেন, বামপন্থী বা ডেমোক্র‍্যাট সমর্থকদের মধ্যে ষড়যন্ত্রমূলক চিন্তাভাবনা বাড়ছে কারণ অনেকেই প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছেন।

অনলাইন চরমপন্থা পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন ওপেন মেজারসের জ্যেষ্ঠ গবেষক জ্যারেড হোল্ট বলেন, এসব পরিসংখ্যান দেখায় যে যুক্তরাষ্ট্রে ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাস করা এখন অনেকের কাছে প্রায় স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। তার ভাষায়, এ জরিপের ফল আমাকে খুব বেশি অবাক করেনি। পরিস্থিতি অবশ্যই উদ্বেগজনক। ষড়যন্ত্রমূলক চিন্তাভাবনা এখন আমেরিকার রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে গভীরভাবে সংক্রমিত করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যখন মানুষ সরকার, আইন ব্যবস্থা ও গণমাধ্যমের ওপর আস্থা হারায়, তখন তারা জটিল ঘটনার ব্যাখ্যা হিসেবে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের দিকে ঝুঁকে পড়ে। জোয়ান ডোনোভান বলেন, যখন মানুষ মনে করে সরকার সত্য গোপন করছে বা আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না, তখন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বিশ্বাস করা অনেক সহজ হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, রাজনৈতিক মেরুকরণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্যের বিস্তার এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থাহীনতা একসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক পরিবেশকে আরো অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

শেয়ার করুন