২০ মে ২০২৬, বুধবার, ০৪:১২:৪৫ অপরাহ্ন


মেডিকেইড তথ্য ব্যবহার করে অভিবাসী শনাক্তকরণে আতঙ্ক ও বিতর্ক
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০-০৫-২০২৬
মেডিকেইড তথ্য ব্যবহার করে অভিবাসী শনাক্তকরণে আতঙ্ক ও বিতর্ক মেডিকেইড


যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন ইস্যু আবারও জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে এসেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এবার মেডিকেইড সুবিধাভোগীদের তথ্য ব্যবহার করে অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত ও বহিষ্কারের উদ্যোগ জোরদার করেছে। শুধু ফেডারেল সরকারই নয়, বেশ কয়েকটি রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত স্টেটও এই নীতিতে সক্রিয়ভাবে যোগ দিয়েছে। তারা জনস্বাস্থ্য বিভাগকে অভিবাসন আইন প্রয়োগের অংশ হিসেবে ব্যবহার করছে, যা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে মানবাধিকার সংগঠন, স্বাস্থ্যনীতি গবেষক এবং অভিবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে। সম্প্রতি নর্থ ক্যারোলিনা এমন একটি অঙ্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে, যেখানে রাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেসব মেডিকেইড সুবিধাভোগীর বৈধ অভিবাসন মর্যাদা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে, তাদের তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির (ডিএইচএস) কাছে পাঠাতে হবে। এর আগে ইন্ডিয়ানা, লুইজিয়ানা, মন্টানা ও ওয়াইওমিং একই ধরনের আইন পাস করেছে। এছাড়া ওকলাহোমা ও টেনেসিতেও অনুরূপ বিল নিয়ে আলোচনা চলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়; বরং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে অভিবাসন নজরদারির অংশে পরিণত করার একটি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন।

মেডিকেইড হলো যুক্তরাষ্ট্রের নিম্ন আয়ের মানুষ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং শিশুদের জন্য পরিচালিত একটি সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি। বর্তমানে ৭ কোটি ৫০ লাখেরও বেশি মানুষ মেডিকেইড এবং চিলড্রেনস হেলথ ইনস্যুরেন্স প্রোগ্রামের (চিপ) আওতায় রয়েছে। আইন অনুযায়ী, বৈধ কাগজপত্র ছাড়া থাকা অভিবাসীরা মেডিকেইড সুবিধা পাওয়ার যোগ্য নন। তবে গ্রিনকার্ডধারী, আশ্রয়প্রার্থী, শরণার্থী এবং কিছু বৈধ নন-সিটিজেন এই সুবিধা পেতে পারেন। নতুন আইনগুলো মূলত এই সুবিধাভোগীদের অভিবাসন তথ্য আরো কঠোরভাবে যাচাই করতে চায়। নর্থ ক্যারোলিনার নতুন আইনে বলা হয়েছে, অক্টোবর থেকে রাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীরা নন-সিটিজেন মেডিকেইড গ্রহীতাদের কাছ থেকে বৈধ অভিবাসন নথি চাইবেন। কারো নথি সন্তোষজনক না হলে তার তথ্য ফেডারেল অভিবাসন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। টেনেসির প্রস্তাবিত আইন আরো কঠোর। সেখানে শুধু স্বাস্থ্য বিভাগ নয়, সব রাজ্য সরকারি সংস্থাকে সন্দেহভাজন অবৈধ অভিবাসীদের তথ্য রিপোর্ট করতে হবে।

ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে যে সরকারি কল্যাণমূলক কর্মসূচিতে জালিয়াতি ও অবৈধ সুবিধাভোগী রয়েছে। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন আইনগুলোর উদ্দেশ্য হলো মেডিকেইড জালিয়াতি রোধ এবং অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ। নর্থ ক্যারোলিনার রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা ডনি ল্যামবেথ আইনসভায় বলেন, এই বিল শুধু জরুরি খাতে অর্থায়নের জন্য নয়; বরং মেডিকেইড ব্যবস্থায় থাকা জালিয়াতি ও অপব্যবহার শনাক্ত করার জন্যও। তবে সমালোচকরা বলছেন, বাস্তবে এ পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য রাজনৈতিক। তাদের মতে, স্বাস্থ্যসেবাকে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার বানানো হচ্ছে।

অভিবাসী পরিবারে ভয় ও অনিশ্চয়তা

নতুন নীতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে মিশ্র অভিবাসন মর্যাদাসম্পন্ন পরিবারগুলোর ওপর। অর্থাৎ এমন পরিবার, যেখানে কিছু সদস্য যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হলেও অন্যরা নন-সিটিজেন বা অভিবাসন প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। লুইজিয়ানায় গত বছর একই ধরনের আইন কার্যকর হওয়ার পর অনেক পরিবার তাদের নাগরিক সন্তানদের জন্যও মেডিকেইড আবেদন করতে ভয় পাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ইমিগ্রেশন আইনজীবী ইয়েসেনিয়া পোলাঙ্কো-গালদামেজ বলেন, এই আইন মানুষকে ভাবতে বাধ্য করছে-চিকিৎসা নিতে গেলে কি তাদের তথ্য অভিবাসন কর্তৃপক্ষের হাতে চলে যাবে? সন্তানকে হাসপাতালে নিলে কি পুরো পরিবার ঝুঁকিতে পড়বে? ২০২৫ সালের একটি জরিপে দেখা গেছে, যেসব প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি নিজেদের সম্ভবত বৈধ কাগজপত্রবিহীন বলে মনে করেন, তাদের প্রায় অর্ধেক জানিয়েছেন যে পরিবারের কেউ চিকিৎসা নেওয়া এড়িয়ে গেছেন, কারণ তারা ভয় পেয়েছেন তথ্য ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের নজরে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এ নীতির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে শিশুরা। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি চারজন শিশুর মধ্যে একজন অভিবাসী পরিবারের সঙ্গে বসবাস করে। এদের অধিকাংশই মার্কিন নাগরিক। জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর চিলড্রেন অ্যান্ড ফ্যামিলিজের গবেষক লিওনার্দো কুয়েলো বলেন, আপনি হয়তো ভাবছেন একজন অভিবাসীকে লক্ষ্যবস্তু করছেন, কিন্তু বাস্তবে পুরো পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তার মতে, অনেক বাবা-মা এখন চিকিৎসা বা স্বাস্থ্যবীমার আবেদন করা থেকে বিরত থাকবেন, যাতে পরিবার অভিবাসন তদন্তের আওতায় না আসে।

ক্যাটো ইনস্টিটিউটের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া নাগরিকদের তুলনায় অনেক কম কল্যাণমূলক সুবিধা ব্যবহার করেন।একইসঙ্গে নন-সিটিজেনদের মধ্যে কল্যাণমূলক জালিয়াতির হারও কম। এছাড়া স্বাস্থ্য বিভাগগুলো ইতোমধ্যেই আবেদনকারীদের অভিবাসন মর্যাদা যাচাই করে থাকে। ফলে নতুন আইনগুলো বাস্তবে অতিরিক্ত নজরদারি ছাড়া আর কিছু নয় বলে মনে করছেন সমালোচকরা।

স্বাস্থ্যসেবা ও অভিবাসন : বিপজ্জনক মিশ্রণ?

বিশ্লেষকদের মতে, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে অভিবাসন নজরদারির সঙ্গে যুক্ত করলে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমে যায়। ফ্লোরিডায় ২০২৩ সালে একটি আইন পাস হয়, যেখানে হাসপাতাল কর্মীদের রোগীদের অভিবাসন অবস্থা জানতে বলা হয়। ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই আইনের কারণে বহু নন-সিটিজেন চিকিৎসা নিতে ভয় পাচ্ছেন, পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং মানসিক চাপ বেড়েছে। টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটও ২০২৪ সালে ফ্লোরিডার মতো একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসা নিতে ভয় পেলে শুধু অভিবাসীরাই নয়, পুরো সমাজ ঝুঁকিতে পড়ে। সংক্রামক রোগ, মাতৃস্বাস্থ্য সমস্যা এবং শিশুস্বাস্থ্যের মতো ক্ষেত্রগুলোতে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।

অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত অঙ্গরাজ্যগুলো ট্রাম্প প্রশাসনের এ নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় দায়ের করা একটি মামলায় ২১টি অঙ্গরাজ্য যুক্ত হয়েছে। মামলায় দাবি করা হয়েছে, মেডিকেইড তথ্য ব্যবহার করে অভিবাসীদের শনাক্ত করা গোপনীয়তার অধিকার লঙ্ঘন করে। একজন ফেডারেল বিচারক রায় দিয়েছেন যে, মেডিকেইড গ্রহীতাদের পরিচয় শেয়ার করা যেতে পারে, তবে তাদের চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য নয়। তবে মামলাটি এখনো চলমান। ডিএইচএস এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

নর্থ ক্যারোলিনার ডেমোক্র্যাট গভর্নর জশ স্টেইন বিলটিতে স্বাক্ষর করার পরও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি আইনপ্রণেতাদের প্রতি আহ্বান জানান, যাতে বৈধভাবে বসবাসরত প্রায় ২৭ হাজার গর্ভবতী নারী ও শিশুর মেডিকেইড সুবিধা সুরক্ষিত থাকে। তবে অভিবাসনবিষয়ক ধারা নিয়ে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করেননি। পর্যবেক্ষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির সঙ্গে রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত রাজ্যগুলো এখন আরো ঘনিষ্ঠভাবে একাত্ম হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে ব্যবহার করে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার প্রবণতা আগামী দিনে আরো বাড়তে পারে।

আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এই নীতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে আস্থার সংকট। মানুষ যদি মনে করে হাসপাতালে গেলে বা সরকারি সহায়তা নিলে তারা বহিষ্কারের ঝুঁকিতে পড়বে, তাহলে তারা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও এড়িয়ে যাবে। ইমিগ্রেশন আইনজীবী পোলাঙ্কো-গালদামেজ বলেন, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা তখনই কার্যকর হয়, যখন মানুষ নিরাপদ বোধ করে। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবা আর অভিবাসন এনফোর্সমেন্ট একসঙ্গে মিশে গেলে পরিবারগুলো আরো অন্ধকারে চলে যাবে।সব মিলিয়ে, মেডিকেইড তথ্য ব্যবহার করে অভিবাসী শনাক্তকরণের নতুন নীতি যুক্তরাষ্ট্রে শুধু রাজনৈতিক বিতর্কই নয়, মানবিক ও জনস্বাস্থ্য সংকটের আশঙ্কাও তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এর প্রভাব আগামী বহু বছর ধরে আমেরিকার স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও অভিবাসী সমাজে অনুভূত হতে পারে।

শেয়ার করুন