২০ মে ২০২৬, বুধবার, ০৩:৩৫:৫০ অপরাহ্ন


এনসিপির একলা চলা নীতির নেপথ্যে জামায়াতের অহঙ্কারী আচরণ
সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০-০৫-২০২৬
এনসিপির একলা চলা নীতির নেপথ্যে জামায়াতের অহঙ্কারী আচরণ জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির লগো


একলা চলতে চায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। আর থাকতে চায় না জামায়াতে ইসলামীর সাথে। এ-নিয়ে নানান ধরনের জল্পনা কল্পনা আছে। আছে অনেক ক্ষোভ ও নেপথ্য কথা। এনসিপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে এব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য জানা গেছে। 

শুরুতে ছাত্র-জনতার উৎসাহের নেপথ্যে

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) হলো বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম ছাত্র-নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দল, যা ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর আত্মপ্রকাশ করে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং জাতীয় নাগরিক কমিটির উদ্যোগে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই দলটির আহ্বায়ক হলেন নাহিদ ইসলাম। দলটির আত্মপ্রকাশের দিন রাজধানীসহ সারাদেশে সাড়া ফেলে দেয়। আত্মপ্রকাশের দিন দূরদূরান্ত থেকে সর্বস্তরের ছাত্র-জনতা ওইদিন অনেক আশা আকাংখা নিয়ে নতুন দলের ছায়াতলে সমবেত হতে থাকে। তাদের সবার ধারণা ছিল বিএনপি-আওয়ামী লীগ-জামায়াতের ইসলামীসহ বাইরে একটি নতুন রাজনৈতিক দল হবে। যাদের মধ্যে থাকবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক মনোভাব ও এর পাশাপাশি সবাইকে নিয়ে দেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার। পুরো দেশের মানুষকে নিয়ে হবে তাদের যাত্রা। থাকবে না জাতি-ধর্ম ভেদাভেদ। কিন্তু এনসিপি জন্ম নেওয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে খবর রটে যায় এটিও একটি সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলের আশ্রয়ে প্রশয়ে আরেকটি দল ‘কৌশলী দোকান’। আর এমন পরিস্থিতি থেকে এনসিপি থেকে দূরে চলে যায় অনেকে। এমনকি এর সাথে থাকার নেপথ্যের কারিগররা দূরে সরে যেতে থাকে। 

সরে যায় জামায়াত

এদিকে এনসিপি গঠনের সময় ধারণা বরা হয়েছিল যে নেতৃত্বে জামায়াত সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের শিবিরের নেতাদের রাখা হবে যারা ২৪ জুলাইয়ে অবদান রেখেছিল বলে দাবি করে। সেজন্য এনসিপি গঠনের দিনে কয়েক হাজার শিবিরের নেতাকর্মী সমবেত হয়। কিন্তু বিফল হয়ে তারা দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে ফিরে যায়। তাদের দলের নেতৃত্বকে এনসিপির নেতৃত্বে না পেয়ে বলা যায় এই দলের প্রতি শিবিরের সরাসরি সমর্থন সরিয়ে ফেলে। আর এর পর থেকে এনসিপির কোনো জনসমাবেশেই আর তেমন ছাত্র-জনতার উপস্থিতি চোখে পড়েনি। 

আবারো জামায়াতেই ফিরে আসা

এদিকে এমন পরিস্থিতিতে এনসিপি রাজনৈতিক মাঠে বলা চলে অনেকটা একা হয়ে যায়। আর এই সুযোগে বিএনপি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেশ ফুরফুরে মেজাজে চলতে থাকে। এদিকে জামায়াতে ইসলামীও পড়ে যায় বিপাকে। ফলে জামায়াত ও এনসিপি উভয়ে উভয়ের স্বার্থে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ১১ দলীয় জোট করে আবারো কাছাকাছি চলে আসে। অনেকে মনে করেন এই দু’টি দলের কাছাকাছি আসার পেছনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রভাবশালী কয়েকজন উপদেষ্টা জড়িত ছিল। তবে একসাথে জোট করে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে শাপলা কলি প্রতীকে অংশ নিয়ে ছয়টি আসনে জয় পায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী মোট ৬৮টি আসনে জয়লাভ করে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল এবং প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। 

কিন্তু এখন কেনো একলা চলা এনসিপির

কিন্ত প্রশ্ন দেখা দিয়েছে এখন কোনো কি কারণে এনসিপি একেলা চলতে আগ্রহী হলো? এব্যাপারে এনসিপির বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীদের সাথে আলাপ করে বিভিন্ন ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মতে, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল ১১-দলীয় জোট বা ঐক্য, যা মূলত দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ইসলামপন্থী ও সমমনা দলগুলোর একটি সক্রিয় নির্বাচনী ও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু এনসিপির বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীদের মতে, নির্বাচনের পরে জামায়াতের কোনো পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এনসিপিকে হিসাবেই নেয় না। তাদের আচরণ অনেকটা বড়ো দল বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগের মতোই লক্ষ্য করা গেছে। এনসিপির এসব নেতাকর্মী দেশ প্রতিনিধিকে জানান, তারা খুব কাছ থেকে দেখেছেন জামায়াতের অহঙ্কারী মনোভাব, যেনো তারাই বর্তমানে ক্ষমতায়। 

সব সুবিধা নিয়ে এনসিপিকে জামায়াতের বাই বাই

এনসিপি নেতারা দেশ প্রতিনিধিতে তাদের নাম না প্রকাশ করার স্বার্থে আক্ষেপ করে আরো জানান, কিভাবে জামায়াত-শিবির তাদেরকে বগলদাবা করে নিয়ে নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রশাসনিক সুযোগ সুবিধাগুলি হাতিয়ে নিয়েছে। তারা বলেন, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এই ড. মুহাম্মদ ইউনূস বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের যে কোনো স্তরের নেতাকর্মীদের খুবই ভালোবাসতেন, সম্মান করতেন, গুরুত্ব দিয়ে তাদের অভাব অভিযোগ শুনতে। জামায়াত এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের নির্মমভাবে কৌশলে ব্যবহার করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রশাসনের অনেক উচ্চ পর্যায়ে তারা বিএনপির ঘরনার কাউকেই ভিড়তে দেয়নি। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে জামায়াত সমর্থিত শিক্ষক-কর্মচারী এমনকি নিম্নশ্রেণীর কর্মচারিদের দ্রুত নিয়োগ দিয়ে ইতোমধ্যে শিক্ষাঙ্গণগুলি করায়াত্ত করে ফেলেছে। তাদের মতে, অন্তর্বতী সরকারের সময়ে জামায়াত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ইমেজকে ব্যবহার করে স্বরাষ্ট্র, আইন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বেশি ব্যবহার করেছেন। এসব মন্ত্রণালয়ে জামায়াত সমর্থিত চাকরি-বাকরিসহ সব ধরনের সুবিধার ব্যবস্থা করে নেয়। প্রশাসনের পর গণমাধ্যমে হাত বাড়ায় জামায়াত। এখানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ইমেজকে ব্যবহার করে বিএনপি আদর্শে বিশ্বাসীদের গড়া পেশাজীবী সংগঠনে ঢুকে পড়ে। সব স্থানে জামায়াত-শিবির সমর্থিতারা নিজেদের পছন্দের লোকদের চাকরি-বাকরি নিয়ে গণমাধ্যম করায়াত্ত করে ফেলে। বিএনপির আদর্শে গড়া পেশাজীবী সংগঠনগুলি এখন বলা চলে জামায়াতে গুপ্ত ঘাটি হিসাবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। কিন্ত একসময়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রক্তমাখা ইমেজকে পুঁজি করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসনকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিলেও এখন তাদের আর গুরুত্বই দিচ্ছে না জামায়াত বা শিবির। এখন সেই জামায়াত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ইমেজে গড়া এনসিপিকে পাত্তাই দেয় না। কোনো ধরনের রাজনৈতিক সুবিধাও দিতে চায় না,পাছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ইমেজে গড়া দলটি সবার কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠে। এনসিপির বেশ কয়েকজন নেতারা এই প্রতিনিধিকে জানান, এখন তারা সংসদের ভেতরে বাইরে মুখে বিরোধীতা করে ফেনা তুললেও গোপনে কিন্তু বিএনপির থেকে সব ধরনের সুবিধা নিচ্ছে। আর এই কাজটি আরও কৌশলে সারতে এনসিপিকে ব্যবহার করতে চাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করতে চায়। যা এনসিপিার শীর্ষ পর্যায়েরা কয়েকজন আমলে না নিলেও অধিকাংশ বুঝে ফেলেছে। তাই দলটির শীর্ষ থেকে তৃণমূলের সব পর্যায়ের এসিপির নেতাকর্মীরা এখন জামায়াতের লেজুরবৃত্তি পরিহার করতে চায়। একারণে অনেকটা তৃণমূলের চাপে এনসিপি একলা চলতে চাওয়ার দিকে হাঁটছে। 

আছে পশ্চিমাদের চাপ.... ‘এনসিপিতে ডানপন্থার উত্থান’

এদিকে এনসিপির একটি সূত্র জানায়, তারা এখন পশ্চিমাদেরও চাপের মুখে। কেননা পশ্চিমারা চায় না বাংলাদেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রক্তমাখা ইমেজকে পুঁজি করে কোনো দল উগ্রবাদী কোনো দলের লেজুরবৃত্তি বা তাদের সাথে জোট করা। পশ্চিমারা বাংলাদেশে একটি তাদের মতে, মডারেট ও স্বাধীনতার স্বপক্ষের অসাম্প্রদায়িক দলকে পছন্দ করে। দলের ভেতরেও প্রতিনিয়ত উগ্রবাদিদের সঙ্গ ত্যাগের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে ‘এনসিপিতে ডানপন্থার উত্থান’ হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলে ঢাকা মহানগর উত্তর এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেছেন সদস্য সচিব সর্দার আমিরুল। তিনি তার এই পদত্যাগপত্রে এনসিপিতে ডানপন্থার উত্থানকে দায়ী করেছেন। পদত্যাগপত্রে আমিরুল লিখেছেন, এনসিপির প্রাথমিক লক্ষ্য, আদর্শ ও নীতির কারণে আগ্রহ নিয়ে এনসিপিতে যোগ দিয়েছিলেন। দলটির মধ্যপন্থী ভূমিকার কারণে তিনি আগ্রহ পান বলে দাবি করেন। কিন্তু নির্বাচনকালীন ডানপন্থী (জামায়াত) জোটে যোগ দেওয়ার কারণে এনসিপির সঙ্গে রাজনীতির আগ্রহ হারান তিনি। আমিরুলের ভাষ্য, এতদিন কৌশলগত কারণে জোট থেকে দূরত্ব বজায় রাখলেও দলীয় কার্যক্রম অব‍্যাহত রেখেছিলেন। তার মতো আরো অনেকে এখন এনসিপি ছেড়ে অন্যদলে যোগ দিচ্ছে। এই জন্য এনসিপির নেতারা মনে করেন তাদের জন্য এখন একা চলাই শ্রেয় বলে মনে করেন।

পাশাপাশি চাপে রাখতেও চায় জামায়াকে

এদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রক্তমাখা ইমেজকে ধারণ করে গড়ে উঠা এনসিপির একলা হাঁটার পেছনে আরেকটি বড়ো কারণ বলে অনেকে জানিয়েছেন। তা-হলো দলটি চায় জামায়াতের অহংকারি ভাব রুখে দিতেও তারা একলা চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে করে দলটি জামায়াতকে বেকায়দায় ফেলে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে পারবে এই আশায়।

জামায়াতকে চাপে রাখা এতো সহজ না

একটি সুত্র জানায়, এনসিপি যে কায়দায় জামায়াতকে এখন মোকাবেলা করতে চায় সেই ধরনের সাংগঠনিক শক্তি বা ইমেজ তাদের নেই। জামায়াত একটি সুসংগঠিত ক্যাডার ভিত্তিক দল। এই দলকে কৌশলে ঘায়েল করা এনসিপির মতো নতুন জন্ম নেওয়া দলের পক্ষে সম্ভব না। কারণ এনসিপিকেই রুখে দিতে বা ব্যর্থ করে দিতে মাঠে আওয়ামী লীগের সব ধরনের তৎপরতা লক্ষ্যণীয়। আর জামায়াত সব সময় ঝোপ বুঝে কোপ মেরে চলার ব্যাপারে অতি কৌশলী। অন্যদিকে এনসিপি গঠনের সময়ে অনেকের মনে আশা জাগিয়ে তুলেছিল। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠন নিয়ে দলটির ভেতরেই দেখা দিয়েছে নানান ধরনের সংকট। প্রতিমাসেই দল থেকে পদত্যাগের হিরিক আছে। এমন বাস্তবতায় এনসিপি ‘একলা চলার মতো’ কৌশল কতটা কার্যকর হবে তা সময় বলে দেবে।

শেয়ার করুন