২০ মে ২০২৬, বুধবার, ০৫:২২:০৮ অপরাহ্ন


নিউ ইয়র্কে ইমিগ্রেশন কোর্টে আইস গ্রেফতার কার্যক্রমে ফেডারেল বিচারকের নিষেধাজ্ঞা
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০-০৫-২০২৬
নিউ ইয়র্কে ইমিগ্রেশন কোর্টে আইস গ্রেফতার কার্যক্রমে ফেডারেল বিচারকের নিষেধাজ্ঞা আইস এজেন্টরা ২৬ ফেডারেল প্লাজা ইমিগ্রেশন কোর্ট হাউসের সামনে এক অভিবাসীকে গ্রেফতার করছে


নিউ ইয়র্ক সিটির ইমিগ্রেশন কোর্টে অভিবাসীদের গ্রেফতার করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ধাক্কা খেল ট্রাম্প প্রশাসন। গত সোমবার নিউ ইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট অব নিউ ইয়র্কের ইউএস ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের বিচারক পি. কেভিন কাস্টেল রায় দিয়ে ম্যানহাটনের ইমিগ্রেশন কোর্টগুলোতে ইউএস ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস) এজেন্টদের অভিবাসন গ্রেফতার কার্যক্রম অনেকাংশে বন্ধ করে দিয়েছেন। ম্যানহাটন ফেডারেল কোর্টের বিচারক পি. কেভিন কাস্টেল বলেন, আগের সিদ্ধান্তে স্পষ্ট ভুল ছিল এবং তা সংশোধন করা প্রয়োজন। বিচারকের এই সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন দমন নীতির বিরুদ্ধে একটি বড় আইনি ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গত বছর থেকে ম্যানহাটনের ২৬ ফেডারেল প্লাজা ইমিগ্রেশন কোর্টে নিয়মিত শুনানিতে অংশ নিতে আসা অভিবাসীদের হঠাৎ আটক করার ঘটনা ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবার সদস্যদের সামনে থেকেই অভিবাসীদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। এসব ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মানবাধিকার সংগঠন, আইনজীবী এবং রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ডেমোক্র্যাট নেতা এবং নিউ ইয়র্ক সিটির সাবেক কম্পট্রোলার ব্র‍্যাড ল্যান্ডার, যিনি বর্তমানে কংগ্রেস নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তিনি বলেন সরকারের অবস্থান পরিবর্তন ছিল বিস্ফোরক মিথ্যার স্বীকারোক্তি। তার ভাষায়, হাজারো অভিবাসীকে আটক করার জন্য ভুল আইনি ব্যাখ্যা ব্যবহার করা হয়েছিল।

এ মামলাটি দায়ের করে অভিবাসী অধিকার সংগঠন দ্য ডোর এবং আফ্রিকান কমিউনিটিজ টুগেদার। তাদের আইনজীবীরা আদালতে যুক্তি দেন, কোর্টে হাজিরা দিতে আসা ব্যক্তিদের গ্রেফতার করা সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী এবং এতে মানুষ আদালতে যেতে ভয় পাচ্ছে। আইনজীবীরা বলেন, বহু অভিবাসী বাধ্যতামূলক শুনানিতে উপস্থিত না হওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছেন শুধু গ্রেফতার আতঙ্কের কারণে। এতে পুরো বিচার প্রক্রিয়াই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা আদালতে যুক্তি দেন, কোর্টে গ্রেফতার অভিযান পরিচালনা করা নিরাপদ এবং কার্যকর। তাদের মতে, এতে স্থানীয় কমিউনিটিতে অভিযান চালানোর প্রয়োজন কমে যায় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ঝুঁকিও হ্রাস পায়।

প্রথমদিকে বিচারক কাস্টেল প্রশাসনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং আইসের এ নীতি বন্ধ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। কিন্তু চলতি বছরের মার্চে ম্যানহাটনের ইউএস অ্যাটর্নি অফিস আদালতে এক অস্বাভাবিক চিঠি পাঠিয়ে জানায়, তারা ভুলবশত ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির একটি নীতিমালার ওপর নির্ভর করেছিল।সরকার আদালতকে জানায়, এজেন্সির আইনজীবীর ভুলের কারণে আদালতে ভুল তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছিল। এ স্বীকারোক্তির পর বিচারক কাস্টেল আগের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করেন। রায়ে বিচারক বলেন, তার আগের সিদ্ধান্ত ভুল ধারণার ওপর ভিত্তি করে ছিল। তিনি লিখেছেন, আদালত আগে ধরে নিয়েছিল যে ২০২৫ সালের নীতিমালা ইমিগ্রেশন কোর্টেও প্রযোজ্য ছিল, কিন্তু পরে দেখা গেছে সেটি সঠিক নয়।

এ রায়ের ফলে ম্যানহাটনের ২৬ ফেডারেল প্লাজা, ২০১ ভারিক স্ট্রিট এবং ২৯০ ব্রডওয়ের ইমিগ্রেশন কোর্টগুলোতে আইসিইর গ্রেফতার কার্যক্রম সীমিত হয়ে গেল। তবে এই রায় সারা দেশে কার্যকর হবে না।

নিউ ইয়র্ক সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নের অভিবাসী অধিকারবিষয়ক মামলার পরিচালক অ্যামি বেলশার এ রায়কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, এখন মানুষ এ বিশ্বাস নিয়ে ইমিগ্রেশন কোর্টে যেতে পারবে যে সেখানে গিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হবে না। তিনি আরো জানান, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী আইসিইকে এখন পুরোনো নির্দেশিকা অনুসরণ করতে হবে, যেখানে শুধু খুব সীমিত পরিস্থিতিতে কোর্টে অভিবাসন গ্রেফতারের অনুমতি ছিল।

ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এক বিবৃতিতে বিচারকের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে। সংস্থাটি জানায়, যাদের বিরুদ্ধে অপসারণ কার্যক্রম শেষ হয়েছে, তাদের হেফাজতে নেওয়া সাধারণ বুদ্ধির বিষয়। আইন ভঙ্গকারীকে যেখানেই পাওয়া যাক, সেখানে গ্রেফতারে কোনো বাধা নেই। আমরা বিশ্বাস করি শেষ পর্যন্ত এই মামলায় আমরা জয়ী হব। মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়, বহু বছর ধরে আইসিই এবং অন্যান্য ফেডারেল সংস্থা সাধারণত ইমিগ্রেশন কোর্টে সিভিল গ্রেফতার অভিযান চালানো থেকে বিরত থাকতো। কারণ এতে অভিবাসীরা আদালতে হাজির হতে ভয় পেতে পারে।

এ নীতির ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের এপ্রিলে আইসিই একটি মেমো জারি করে, যেখানে কোর্টের ভেতরে বা আশপাশে এ ধরনের অভিযান নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু ২০২৫ সালের মে মাসে ট্রাম্প প্রশাসন ফেডারেল সংস্থাগুলোর ওপর প্রতিদিনের গ্রেফতার সংখ্যা বাড়ানোর চাপ দিলে আইসিই নতুন নীতিমালা জারি করে। সেই নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়, ইমিগ্রেশন কোর্টে অভিবাসীদের আটক করা যাবে। এরপর থেকেই ম্যানহাটনের আদালতগুলোতে নজিরবিহীন সংখ্যায় গ্রেফতার শুরু হয়। মামলায় বলা হয়, এতে পরিবারগুলো হঠাৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং আটক ব্যক্তিদের অনেককে কয়েকদিন পর্যন্ত পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হয়নি।

এ পরিস্থিতির প্রতিবাদে নিয়মিত বিক্ষোভ শুরু হয় আদালতের বাইরে। অনেক মানবাধিকার কর্মী এবং রাজনৈতিক নেতাও প্রতিবাদে যোগ দেন। কয়েকজনকে অভিবাসীদের সঙ্গে গ্রেফতারও করা হয়। বিচারক কাস্টেল জানিয়েছেন, আইসিইর নীতির বৈধতা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ বিচারিক পর্যালোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তার এই নির্দেশ কার্যকর থাকবে।

বাদীপক্ষ আরো ইঙ্গিত দিয়েছে, সরকারের হঠাৎ অবস্থান পরিবর্তন এবং ভুল তথ্য দেওয়ার ঘটনায় তারা আদালতের কাছে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দাবি করবে। এপ্রিলের এক শুনানিতে বিচারক কাস্টেল বলেন, শাস্তির প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে তিনি জানান, বিষয়টি পরে মামলার পরবর্তী ধাপে বিবেচনা করা হবে।

শেয়ার করুন