ঢাকায় বিজিবি মোতায়েন
বেশ কয়েকদিন ধরেই জামায়াতের হুমকি ধামকি চলছিল। জামায়াতের নেতারা বিএনপি সরকারকে উদ্দেশ্য করে বলেই ফেলেছে ‘মনে হচ্ছে, আরেকটা অনিবার্য বিপ্লবের জন্য আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। হুঁশিয়ায় করে বলা হচ্ছে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা না হলে পরিস্থিতি ভালো হবে না। বিএনপি সরকারকে উদ্দেশ্য করে বলে যাচ্ছেন, ‘ভালোয় ভালোয় দাবি মেনে নিন। আমাদের সুড়সুড়ি দেবেন না। যারা ফাঁসিকে খুশি মনে মেনে নেয়, তারা ভয় পায় না। আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে গণভোটের রায় মানতে বাধ্য করা হবে-ইত্যাদি...।
অন্যদিকে গণরায়ের বাস্তবায়ন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন দাবিতে কর্মসূচি নিয়ে মাঠে আছে ১১ দলীয় জোট। এর পাশাপাশি মাঝে মাঝে নিষিদ্ধ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল কিংবা অপার থেকে হুংকারের ব্যাপার স্যাপার তো রয়েছেই।
তাহলে ৬ জেলায় সেনা মোতায়েন কেনো?
এসব নিয়ে এমনিতেই ক্ষমতাসীন বিএনপি যে কিছুটা বেকায়দা আছে সত্য, তবে বিচলিত বা বড়ো ধরনের উদ্বেগ নেই। হয়তবা বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের নীতিনির্ধারকরা মনে করেন বিষয়গুলির রাজনৈতিকভাবে সমাধান সম্ভব। কিন্ত হুট করেই এমন কি হলো যে দেশের ৬ জেলায় সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিতে হলো সরকারকে? জানা গেলো ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, গাজীপুর, চট্টগ্রাম ও ফরিদপুরে এই সিদ্ধান্তের আওতায় সেনা মোতায়েন আছে। তাও আবার ২২ জুন থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত এসব জেলায় সেনাসদস্য মোতায়েন থাকবে। এর পাশাপাশি পাঁচটি জেলায় গত সোমবার সন্ধ্যা থেকে মাঠে নেমেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এছাড়া বলা হয় যে, ২৩ জুন মঙ্গলবার রাজধানীতে মোতায়েন থাকবে ১৮ হাজার পুলিশ সদস্য। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক-২ শাখা থেকে ২২ জুন সোমবার জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে যে, ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকা, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকা, গাজীপুর মেট্রোপলিটন এলাকা, নারায়ণগঞ্জ জেলা, গোপালগঞ্জ জেলা ও ফরিদপুর জেলার শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা, জননিরাপত্তা নিশ্চিত এবং জনগণের জানমালের সুরক্ষায় ২২ জুন থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ এর আওতায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক সেনাসদস্য মোতায়েনের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।’
কিন্তু কেনো?
মাত্র চার মাস হয়েছে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে। এমন কি ঘটে গেলো যে আওয়ামী লীগের মাত্র কয়েকটি ঝটিকা মিছিল আর ওপার থেকে কয়েকদফা হুংকারে বিএনপি ভয় পেয়ে গেলো? নাকি ক্ষমতাসীন দলটি তাদের সমর্থন হারিয়ে ফেলার ইঙ্গিত পেয়েছেন? একথা ঠিক ২৩ জুন কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগ সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। আর এজন্য দলটি বাংলাদেশের ভেতরে তাদের সাংগঠনিক মাঠে উপস্থিতি জানান দিতেই পারে। তাই হয়তোবা হাক ডাক দিয়ে কিছু কর্মসূচিও নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে মঙ্গলবার দলটির পক্ষ থেকে বড় আকারে ঝটিকা মিছিল বের করতে নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে শোনা যায়। এছাড়া প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দেশজুড়ে সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া কথা-ও শোনা গেছে। কিন্তু তা মোকাবিলায় তো জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিভিন্ন দল পৃথকভাবে রাজপথে অবস্থানের কর্মসূচি নিযেছেই। জামায়াত-এনসিপিসহ ১১ দলীয় ঐক্য মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকায় সমাবেশের কর্মসূচি দেয়।
কার বা কাদের প্রতি সন্দেহে শক্ত অবস্থান প্রশাসনের
তবে একথা ঠিক যে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত বিভিন্ন সংগঠনটির ঝটিকা মিছিল বা সমাবেশকে টার্গেট করে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করেনি ক্ষমতাসীন বিএনপি। এর বদলে তাদের সমর্থিত সরকার শক্ত প্রশাসনির পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বিএনপি সরকার এতো শক্ত প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিলো কেনো? কারো কারো মতে, এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের দ্বারা ওপার থেকে এসে চট করে ঢুকে পড়া কিংবা বিশাল উগ্র কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামা নানান কারণেই সম্ভব না, এতে পুরো বাংলাদেশের জনগণের সমর্থনও থাকবে না বলেই অনেকে মনে করেন। এবিষয়টা বিএনপি সরকারও বুঝে। কিন্তু কারো কারো মতে, সরকারের সন্দেহ অন্য জায়গায়। কেননা কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে মাঠে উপস্থিতি লক্ষ্য করে কারো কারো পক্ষে ‘গুপ্ত কোনো পরিকল্পনা’ হাজির করে তা বাস্তবায়ন করার প্রেক্ষাপটও তৈরি হয়ে যেতে পারে। কেননা বিএনপি মাথায় আছে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের ঘটনা। সেদিন চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদ শেষের দিনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের ডাকা ’লগি-বৈঠা’ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পল্টন ও বায়তুল মোকাররম এলাকায় জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের সাথে ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বাঁধে। এতে অন্তত ৬ জন নিহত এবং শতাধিক আহত হন। আর এই ধরনের ঘটনার পুরো দায়ভার সেদিন ক্ষসতাসীন বিএনপির ঘাড়েই এসে পড়ে। এবং কারো কারো মতে, সেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে এক এগারোর সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়ে করা হয়।
উল্লেখ্য বাংলাদেশে ২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি সেনাবাহিনীর সমর্থনে একটি অরাজনৈতিক সরকারের ক্ষমতা নেওয়ার যে ঘটনা ঘটেছিল। কারো কারো মতে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনটির ২৩ জুন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজপথে দলটির ঝটিকা উপস্থিতিতে শঙ্কিত নয় সরকার। বরং এধরনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বড়ো ধরনের কোনো নাশকতা ও এর পরিপ্রেক্ষিতে কেউ যেনো তা ভিন্নখাতে নিয়ে যতো না পারে সেজন্যই সর্তক রযেছে সরকার। আর এর পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষমতাসীন দেশের ৬ জেলায় সেনা, ৫ জেলায় বিজিবি মোতায়েনের মতো বড়ো ধরনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে কারো কারো অভিমত।