শেখ হাসিনা, আজিজ আহমেদ ও বেনজীর আহমেদ
অবশেষে বহুল আলোচিত ও সাড়া জাগানো শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের নিরীহ আলেম-ওলামাদের ওপর পাশবিক হামলা ও হত্যাযজ্ঞ ঘটানোর অভিযোগ আলোর মুখ দেখতে শুরু করেছে। ২০১৩ সনে সংঘটিত ওই ক্ষত এতদিন বাংলাদেশের আলেম সমাজ বয়ে বেড়াচ্ছিল। জুলাই আন্দোলনের পর নির্বাচিত বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণে পাঁচ মাসের মাথায় ওই হত্যাযজ্ঞের ঘটনা বিচারের কাঠগড়ায় তুলেছেন।
২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের অবস্থান কর্মসূচিতে পরিচালিত যৌথবাহিনীর অভিযান বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে। তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে শাপলা চত্বরের ঘটনাকে ‘রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে প্রশাসনিক পদক্ষেপ’ হিসেবে চিত্রায়িত করা হলেও তা বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কাছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চরম অপব্যবহারের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, মতিঝিলে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এ অভিযান চালানো হয়। কিন্তু বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থাগুলো শুরু থেকেই এ অভিযানে ব্যাপক প্রাণহানি ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছিল। পরবর্তী এক দশকে রাজনৈতিক সমীকরণের কারণে বিষয়টি অন্তরালেই থেকে যায়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক দৃশ্যপটের আমূল পরিবর্তনের পর হেফাজতে ইসলাম পুনরায় ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করে, যা দীর্ঘ এক দশক ধরে চাপা পড়ে থাকা এ সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়াকে আবার সচল করে।
মামলার বর্তমান আইনি অবস্থা ও ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত
২৭ জুলাই ২০২৬ তারিখে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেন। সেখানে প্রসিকিউশনের অনুসন্ধানে শাপলা চত্বর অভিযানে ৫৮ জন নিহত হওয়ার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়েছে।
শেখ হাসিনাসহ ওই ঘটনার রূপকারদের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারি
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ ও সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদসহ মোট ৪১ জন আসামির মধ্যে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। এদিকে ইতোমধ্যে বিভিন্ন অপরাধে গ্রেফতারকৃত আসামিদের মধ্যে এ মামলায় বর্তমানে ৯ জন আসামি গ্রেফতার রয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হক, সাবেক ডিআইজি মোল্যা নজরুল ইসলাম, শাহরিয়ার কবির, সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল এবং সাংবাদিক ফারজানা রুপা ও মোজাম্মেল বাবু।
এক নজরে ৪১ জন যারা
প্রসিকিউশনের অভিযোগে শেখ হাসিনার পাশাপাশি তৎকালীন সরকারের একাধিক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আসামি করা হয়েছে।
অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন- তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু, তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, সাবেক প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, তৎকালীন যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন মাহমুদ, গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক ও মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, ৭১ টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু, সাংবাদিক ফারজানা রুপা, সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হক, সাবেক আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক মো. মোখলেছুর রহমান, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, তৎকালীন র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপস) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মজিবুর রহমান, সাবেক ডিআইজি আব্দুল জলিল মণ্ডল, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি শেখ মুহাম্মাদ মারুফ হাসান, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি (এসবি) মাহবুব হোসেন, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি (এসবি) মনিরুল ইসলাম, তৎকালীন ডিএমপির ডিসি (সদর দপ্তর ও প্রশাসন) মো. আনোয়ার হোসেন, তৎকালীন ডিএমপির ডিসি (ট্রাফিক-দক্ষিণ) আশরাফুজ্জামান, তৎকালীন ডিএমপির এডিসি (মতিঝিল জোন) এসএম মেহেদী হাসান, সাবেক ডিআইজি হারুন-অর-রশীদ, সাবেক ডিআইজি বিপ্লব কুমার সরকার, সাবেক ডিআইজি সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম, তৎকালীন ডিএমপির এডিসি (মতিঝিল বিভাগ) মো. আসাদুজ্জামান, অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এসএম শিবলী নোমান এবং তৎকালীন মতিঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিএম ফরমান আলী।
ফ্লাশ ব্যাক শেখ হাসিনার কটূক্তি
তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করা হয় যে, মতিঝিল ও আশপাশের এলাকায় সহিংসতা, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায় ভাঙচুর এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ার কারণেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অভিযান চালানো হয়েছে। বিরোধীরা শত শত মৃত্যুর দাবি করলেও সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তা পুরোপুরি অস্বীকার করে এবং অভিযানে সীমিত সংখ্যক নিহতের দাবি জানায় এবং হেফাজত কর্মীরা রং মেখে পড়ে ছিল সে কথাও জানান হয়।
মিডিয়া ব্ল্যাকআউট ও সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ
ওইদিনের অভিযানের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করার কারণে এবং উসকানিমূলক সংবাদ পরিবেশনের অভিযোগে তৎকালীন সরকার ‘দিগন্ত টিভি’ ও ‘ইসলামিক টিভি’র সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়। হেফাজতের সমাবেশ ও শেখ হাসিনাকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক/কটূক্তি শাপলা চত্বরের ঘটনার আগে ও পরে দুপক্ষের রাজনৈতিক ও সামাজিক বক্তব্যে ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল।
হেফাজতে ইসলাম ও তৎকালীন বিরোধী দলগুলো এ অভিযানকে ‘গণহত্যা’ ও ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ বলে অভিহিত করে। আলেমদের ওপর গুলি চালানো এবং বুট পরিহিত অবস্থায় কোরআন শরিফ বা মাদরাসার ছাত্রদের প্রতি অবমাননার নানা অভিযোগ এনে সরকারকে তীব্র তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও সমালোচনা করা হয়।
কিন্তু তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল থেকে দাবি করা হয়, হেফাজতের আলেম-ওলামারা ধর্মের নামে রাজনীতি করছেন, পবিত্র কোরআনে আগুন দিয়েছেন এবং উগ্রবাদী কার্যকলাপ চালিয়েছেন। সমাবেশস্থল থেকে আলেমদের পালিয়ে যাওয়া বা নারী শাপলা চত্বরে না আসার বিষয় নিয়েও সরকারের পক্ষ থেকে কটূক্তিমূলক মন্তব্য করা হয়েছিল।
সবশেষ
২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনা কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি দমনের ঘটনা ছিল না; এটি ছিল বাংলাদেশের আইনি ও রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বাঁক। ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ আমলে নেওয়ার মধ্য দিয়ে এ ঘটনার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি নিষ্পত্তির সুনির্দিষ্ট ধাপ শুরু হলো। এখন মূল দেখার বিষয় প্রসিকিউশন আন্তর্জাতিক মানের আইনি সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করে এই বহুল আলোচিত মামলার চূড়ান্ত রায়ে সুনির্দিষ্ট বিচার নিশ্চিত হবে এটাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।