যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ভবনের বাইরে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব (বার্থরাইট সিটিজেনশিপ) বজায় রাখার দাবিতে বিক্ষোভে অংশ নেন অধিকারকর্মীরা।
যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী শিশুদের জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব (বার্থ রাইট সিটিজেনশিপ) বাতিলের চেষ্টা করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক জারি করা নির্বাহী আদেশকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে বাতিল করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট। ৩০ জুন মঙ্গলবার প্রকাশিত বহুল প্রতীক্ষিত এই রায়ে আদালত পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে জন্ম নেওয়া শিশু তাদের বাবা-মায়ের অভিবাসন অবস্থান বৈধ, অস্থায়ী কিংবা অনথিভুক্ত যাই হোক না কেন সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি সাম্প্রতিক দশকগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক রায়, যা শুধু ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির জন্য বড় ধাক্কাই নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত লাখো অভিবাসী পরিবারের ভবিষ্যৎও নিশ্চিত করেছে।
সুপ্রিম কোর্ট ৬-৩ ভোটে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ বাতিল করে। তবে সাংবিধানিক প্রশ্নে পাঁচজন বিচারপতির সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামত ছিল। প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামত লিখেছেন। তার সঙ্গে একমত হন বিচারপতি এলেনা কাগান, সোনিয়া সোটোমেয়র, অ্যামি কোনি ব্যারেট এবং কেতানজি ব্রাউন জ্যাকসন। তারা মত দেন যে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনী লঙ্ঘন করেছে। বিচারপতি ব্রেট ক্যাভানফ আদালতের চূড়ান্ত রায়ের সঙ্গে একমত হলেও ভিন্ন যুক্তি দেন। তিনি বলেন, বিদ্যমান ফেডারেল আইন যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া এসব শিশুকে নাগরিকত্ব প্রদান করে। তাই নির্বাহী আদেশটি আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলেও তিনি এটিকে সংবিধানবিরোধী বলে মনে করেননি। অন্যদিকে বিচারপতি ক্লারেন্স থমাস, স্যামুয়েল আলিটো এবং নিল গরসাচ ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান সমর্থন করে ভিন্নমত প্রদান করেন।
রায়ে প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস লিখেছেন, নাগরিকত্ব তখন যেমন ছিল, আজও তেমনই-এটি অধিকার ভোগের অধিকার এবং আমাদের রাজনৈতিক সমাজে পূর্ণ অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা। ১৪তম সংশোধনীর প্রণেতারা এই প্রতিশ্রুতি এই দেশে জন্ম নেওয়া প্রতিটি স্বাধীন মানুষের জন্য সম্প্রসারিত করেছিলেন। আজ আমরা সেই প্রতিশ্রুতিই রক্ষা করছি। এই মন্তব্যকে রায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রায়ে প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর ভাষা, এর প্রণয়নের ইতিহাস এবং সুপ্রিম কোর্টের দীর্ঘদিনের নজিরসবকিছুই প্রমাণ করে যে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশু জন্মের মুহূর্ত থেকেই মার্কিন নাগরিক। তিনি বলেন, ১৮৯৮ সালের ইউনাইটেড স্টেটস বনাম ওয়ং কিম আর্ক মামলার পর থেকে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই নীতিই অনুসরণ করা হয়েছে এবং কোনো প্রেসিডেন্ট নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সেই সাংবিধানিক অধিকার বাতিল করতে পারেন না।
রবার্টস আরও লেখেন, ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী যদি নাগরিকত্বকে বাবা-মায়ের অভিবাসন অবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তাহলে ১৪তম সংশোধনীর স্পষ্ট ভাষা ও উদ্দেশ্য সম্পূর্ণভাবে বদলে যাবে। আদালতের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বিচারিক এখতিয়ারের অধীন বলতে এমন প্রায় সব মানুষকেই বোঝায় যারা যুক্তরাষ্ট্রের আইন মানতে বাধ্য। অনথিভুক্ত অভিবাসী, আশ্রয়প্রার্থী, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, পর্যটক বা অস্থায়ী কর্মী সকলেই যুক্তরাষ্ট্রের আইন ও আদালতের অধীন। ফলে তাদের সন্তানদেরও জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
বিচারপতি এলেনা কাগান, সোনিয়া সোটোমেয়র এবং কেতানজি ব্রাউন জ্যাকসন পৃথক কোনো মতামত না লিখে প্রধান বিচারপতির সাংবিধানিক বিশ্লেষণের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত হন। তারা মনে করেন, ১৪তম সংশোধনীর ভাষা এতটাই স্পষ্ট যে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এর ব্যতিক্রম তৈরি করার কোনো সুযোগ নেই।
রক্ষণশীল বিচারপতি অ্যামি কোনি ব্যারেটও সংখ্যাগরিষ্ঠের সঙ্গে একমত হয়ে বলেন, সংবিধানের ভাষা পরিবর্তন না করে নির্বাহী ক্ষমতার মাধ্যমে নাগরিকত্বের মৌলিক সংজ্ঞা বদলে দেওয়া যায় না। তার মতে, সুপ্রিম কোর্টের দায়িত্ব হলো দীর্ঘদিনের সাংবিধানিক ব্যাখ্যা রক্ষা করা।
বিচারপতি ব্রেট ক্যাভানফ ভিন্ন যুক্তিতে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ বাতিলের পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি বলেন, বর্তমানে কার্যকর ফেডারেল নাগরিকত্ব আইন যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া এসব শিশুকে নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ফলে নির্বাহী আদেশটি বিদ্যমান আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তবে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিদের মতো এটিকে সরাসরি সংবিধানবিরোধী ঘোষণা করেননি। তার মতে, ভবিষ্যতে কংগ্রেস যদি আইন পরিবর্তন করে, তাহলে বিষয়টি নতুন করে আইনি পর্যালোচনার সুযোগ থাকতে পারে।
অন্যদিকে বিচারপতি ক্লারেন্স থমাস তার ৯১ পৃষ্ঠার দীর্ঘ ভিন্নমতে বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা ১৪তম সংশোধনীর মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে গেছেন। তার মতে, এই সংশোধনী মূলত গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সদ্য মুক্ত আফ্রিকান-আমেরিকানদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার জন্য গৃহীত হয়েছিল; এটি বিদেশি পর্যটক, অস্থায়ী ভিসাধারী বা অনথিভুক্ত অভিবাসীদের সন্তানদের জন্য প্রণীত ছিল না।
থমাস আরও বলেন, আজ আদালত অসাধারণ একটি পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রেসিডেন্টের সেই আদেশকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়েছে, যা বিদেশি অস্থায়ী দর্শনার্থী এবং অবৈধভাবে অবস্থানকারী ব্যক্তিদের সন্তানদের নাগরিকত্ব সীমিত করতে চেয়েছিল। তিনি অভিযোগ করেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা ১৪তম সংশোধনীকে তার ঐতিহাসিক অর্থের বাইরে সম্প্রসারণ করেছেন।
বিচারপতি স্যামুয়েল আলিটো থমাসের সঙ্গে একমত হয়ে বলেন, আদালত নির্বাহী শাখার সাংবিধানিক ক্ষমতার ওপর অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ করেছে। তার মতে, সংবিধানের নাগরিকত্ব ধারা নিয়ে এখনও যুক্তিসঙ্গত বিতর্কের সুযোগ রয়েছে এবং আদালত সেই বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে ফেলেছে।
বিচারপতি নিল গরসাচও ভিন্নমতে যোগ দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিচারিক এখতিয়ারের অধীন শব্দগুচ্ছের ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা নিয়ে আরও সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা উচিত ছিল। তার মতে, সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা অতীতের নজিরকে অত্যন্ত বিস্তৃতভাবে প্রয়োগ করেছেন।
সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা অবশ্য এই যুক্তিগুলো প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ১৪তম সংশোধনীর ভাষা, কংগ্রেসের বিতর্ক, ১৮৯৮ সালের ওয়ং কিম আর্ক রায় এবং এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের ধারাবাহিক আইনি চর্চা প্রমাণ করে যে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশুদের নাগরিকত্ব জন্মের মুহূর্ত থেকেই নিশ্চিত হয়। আদালত স্পষ্ট করে দেয়, এই সাংবিধানিক অধিকার পরিবর্তন করতে চাইলে নির্বাহী আদেশ বা সাধারণ আইন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন হবে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান সংশোধন।
ট্রাম্প কী চেয়েছিলেন?
দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দিনেই ট্রাম্প নির্বাহী আদেশ ১৪১৫৬-এ স্বাক্ষর করেন। আদেশ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নিলেও দুটি শ্রেণির শিশু আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে মার্কিন নাগরিক হতো না। প্রথমত, যেসব শিশুর মা যুক্তরাষ্ট্রে অনথিভুক্ত অভিবাসী এবং বাবা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক বা বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা নন। দ্বিতীয়ত, যেসব শিশুর মা পর্যটক, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, অস্থায়ী কর্মী বা অন্য কোনো অস্থায়ী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন এবং বাবা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক বা গ্রিন কার্ডধারী নন।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি ছিল, এ ধরনের শিশুরা সংবিধানে ব্যবহৃত সাবজেক্ট টু দ্য জুরিসডিকশন বা যুক্তরাষ্ট্রের বিচারিক এখতিয়ারের অধীন নয়। ফলে তারা জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকারী নয়।
আদালত কেন এই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করল
সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যাখ্যা সংবিধানের ভাষা, ইতিহাস এবং দীর্ঘদিনের আইনি নজিরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আদালত ব্যাখ্যা করে, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত অনথিভুক্ত অভিবাসী, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, অস্থায়ী কর্মী কিংবা পর্যটক-সবাই যুক্তরাষ্ট্রের আইন ও আদালতের অধীন। তাই তাদের সন্তানরাও ১৪তম সংশোধনীর নাগরিকত্ব সুরক্ষার আওতায় পড়ে।আদালত আরও জানায়, নাগরিকত্ব কোনো ব্যক্তির স্থায়ী আবাস বা ডোমিসাইলের ওপর নির্ভর করে-এমন যুক্তিরও কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই।
১৪তম সংশোধনীর ইতিহাস
১৮৬৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের পর সংবিধানে যুক্ত হয় ১৪তম সংশোধনী।এর মূল উদ্দেশ্য ছিল দাসপ্রথা বিলুপ্তির পর মুক্ত আফ্রিকান-আমেরিকানদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা। তবে সংশোধনীর ভাষা অত্যন্ত বিস্তৃত।সেখানে বলা হয়েছে,"যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী বা নাগরিকত্ব গ্রহণকারী এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিচারিক এখতিয়ারের অধীন থাকা সকল ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক।"এই ভাষাই এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
১৮৯৮ সালের নজির পুনর্ব্যক্ত
রায়ে সুপ্রিম কোর্ট আবারও ১৮৯৮ সালের ঐতিহাসিক ইউনাইটেড স্টেটস বনাম ওয়ং কিম আর্ক মামলার উল্লেখ করেছে। সেই মামলায় আদালত রায় দিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া চীনা অভিবাসী দম্পতির সন্তান জন্মসূত্রেই মার্কিন নাগরিক। বর্তমান রায়ে আদালত জানিয়েছে, ওই নজির এখনও সম্পূর্ণ কার্যকর এবং সেটিই যুক্তরাষ্ট্রের জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের সাংবিধানিক ভিত্তি।
নিম্ন আদালতেও ট্রাম্পের পরাজয়
জানুয়ারি ২০২৫ সালে নির্বাহী আদেশ জারির পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে মামলা হয়।নিউ হ্যাম্পশায়ার, ম্যাসাচুসেটস, ওয়াশিংটনসহ একাধিক ফেডারেল আদালত আদেশটির কার্যকারিতা স্থগিত করেন। পরে এসব আদালত রায় দেন যে নির্বাহী আদেশটি সংবিধানবিরোধী। সুপ্রিম কোর্ট মূলত নিউ হ্যাম্পশায়ারের একটি মামলার রায় বহাল রেখেছে। ফলে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কোথাও কার্যকর হওয়ার সুযোগই পায়নি।
বছরে আড়াই লাখের বেশি শিশু প্রভাবিত হতো
মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউট এবং পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির পপুলেশন রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণা অনুযায়ী, ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ কার্যকর হলে প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ ৫৫ হাজার নবজাতক জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব হারাত। এর মধ্যে শুধু অনথিভুক্ত অভিবাসী পরিবারের সন্তানই নয়, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, অস্থায়ী কর্মী, গবেষক, পর্যটক, আশ্রয়প্রার্থী এবং গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের সন্তানরাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
নির্বাহী আদেশ কার্যকর হলে এসব শিশু জন্মের পর মার্কিন পাসপোর্ট, সামাজিক নিরাপত্তা নম্বর (সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বর), ফেডারেল পরিচয়পত্রসহ বিভিন্ন সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতো। পরবর্তীকালে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, চাকরি, ভোটাধিকার এবং বৈধ অভিবাসন সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রেও তারা গুরুতর আইনি অনিশ্চয়তার মুখে পড়ত।বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে একটি নতুন অনথিভুক্ত জনগোষ্ঠী সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতো।
ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া
রায়ের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুবই খারাপ। তিনি দাবি করেন, কংগ্রেস চাইলে সহজেই আইন পরিবর্তন করে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করতে পারে। তবে সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা যেহেতু ১৪তম সংশোধনীর ব্যাখ্যার ভিত্তিতে রায় দিয়েছেন, তাই সাধারণ আইন পাস করে এই অধিকার বাতিল করা সম্ভব নয়। এটি পরিবর্তন করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে, যার জন্য কংগ্রেসের দুই-তৃতীয়াংশ এবং অঙ্গরাজ্যগুলোর তিন-চতুর্থাংশের অনুমোদন প্রয়োজন।
আদালতে নজিরবিহীন উপস্থিতি
এপ্রিল মাসে এই মামলার শুনানিতে ট্রাম্প নিজে সুপ্রিম কোর্টে উপস্থিত ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কোনো বর্তমান প্রেসিডেন্টের এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক মামলায় ব্যক্তিগত উপস্থিতি অত্যন্ত বিরল।শুনানির সময় রক্ষণশীল ও উদারপন্থী উভয় পক্ষের বিচারপতিরাই ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি নিয়ে কঠোর প্রশ্ন তোলেন।
কেন এই রায় এত গুরুত্বপূর্ণ?
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় শুধু জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব রক্ষা করেনি; এটি প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতারও একটি স্পষ্ট সীমারেখা টেনে দিয়েছে। আদালত জানিয়ে দিয়েছে, সংবিধানে নিশ্চিত করা মৌলিক অধিকার কোনো প্রেসিডেন্ট নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাতিল করতে পারেন না। এটি ভবিষ্যতের যেকোনো প্রশাসনের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক নজির হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের জন্য কী অর্থ বহন করে?
এই রায়ে সবচেয়ে বেশি স্বস্তি পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি, ভারতীয়, পাকিস্তানি, নেপালি এবং অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী পরিবার। যুক্তরাষ্ট্রে হাজার হাজার বাংলাদেশি পরিবার বর্তমানে শিক্ষার্থী ভিসা, কর্মভিসা, আশ্রয় আবেদন, অস্থায়ী সুরক্ষিত মর্যাদা, গ্রিন কার্ডের আবেদন অথবা অন্যান্য বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়ায় রয়েছে। আবার অনেকে দীর্ঘদিন ধরে বৈধ কাগজপত্র ছাড়াও বসবাস করছেন। ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ কার্যকর হলে এসব পরিবারের যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া সন্তানদের নাগরিকত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতো। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সেই আশঙ্কার অবসান হয়েছে।
ভবিষ্যতে কি আবার এই ইস্যু আদালতে আসতে পারে?
জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক ভবিষ্যতেও চলবে। যদি কোনো কংগ্রেস নতুন আইন পাস করার চেষ্টা করে অথবা ভবিষ্যতের কোনো প্রশাসন ভিন্ন পদ্ধতিতে এই অধিকার সীমিত করতে চায়, তাহলে বিষয়টি আবার আদালতে যেতে পারে। তবে বর্তমান রায় অত্যন্ত শক্তিশালী সাংবিধানিক নজির তৈরি করেছে। ফলে সংবিধান সংশোধন ছাড়া জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিল করা কার্যত অসম্ভব বলেই মনে করছেন অধিকাংশ সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ।
অভিবাসন নীতিতে বড় ধাক্কা
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের অভিবাসন নীতির অন্যতম প্রধান অঙ্গ ছিল জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করা। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ে সেই পরিকল্পনা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। একই সঙ্গে আদালত আবারও স্পষ্ট করেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে এবং মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার চূড়ান্ত দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের।
আইনজীবী ও সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় আগামী কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইন, নাগরিকত্ব নীতি এবং সাংবিধানিক ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান নজির হিসেবে বিবেচিত হবে।
ট্রান্সজেন্ডার খেলোয়াড় নিষিদ্ধের রায়কে ‘বড় বিজয়’ বললেন ট্রাম্প
৩০ জুন, ২০২৬ (মঙ্গলবার) যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট নারীদের খেলাধুলায় ট্রান্সজেন্ডার অ্যাথলেটদের অংশগ্রহণ সীমিত করার পক্ষে রায় দেয়। এই সিদ্ধান্তকে নিজের প্রশাসনের জন্য একটি বড় বিজয় হিসেবে অভিহিত করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ৩০ জুন মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প বলেন, বড় বিজয়: যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট এইমাত্র নারীদের খেলাধুলায় পুরুষদের অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে।
এই রায়টি এসেছে ৩০ জুন, ২০২৬ তারিখে নিষ্পত্তি হওয়া দুটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায়-ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া বনাম বি.পি.জে.. এবং লিটল বনাম হিকক্স। মামলাগুলোতে পশ্চিম ভার্জিনিয়া ও আইডাহোর সেই আইনকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল, যেখানে ট্রান্সজেন্ডার মেয়ে ও নারীদের জন্মগত লিঙ্গের পরিবর্তে তাদের লিঙ্গ পরিচয়ের ভিত্তিতে নারী ক্রীড়া দলে অংশ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
সুপ্রিম কোর্ট রায়ে জানায়, টাইটেল নাইন অনুযায়ী স্কুল ও কলেজগুলো জৈবিক লিঙ্গের ভিত্তিতে নারী ও পুরুষদের জন্য পৃথক ক্রীড়া দল গঠন করতে পারে। আদালত সর্বসম্মতিক্রমে (৯-০) সিদ্ধান্ত দেয় যে এসব আইন টাইটেল নাইন লঙ্ঘন করে না। পাশাপাশি, ৬-৩ ভোটে আদালতের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা রায় দেন যে পশ্চিম ভার্জিনিয়া ও আইডাহোর আইন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ইকুয়াল প্রোটেকশন ক্লজ-ও লঙ্ঘন করে না। ট্রাম্প বলেন, এই সিদ্ধান্ত নারীদের খেলাধুলায় ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করবে এবং এটি নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য একটি ঐতিহাসিক বিজয়।অন্যদিকে, ট্রান্সজেন্ডার অধিকারকর্মী ও নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো রায়টির সমালোচনা করে বলেছে, এটি ট্রান্সজেন্ডার শিক্ষার্থী ও ক্রীড়াবিদদের বিরুদ্ধে বৈষম্যকে উৎসাহিত করবে এবং বিষয়টি নিয়ে ভবিষ্যতেও আইনি লড়াই অব্যাহত থাকবে।