০১ জুলাই ২০২৬, বুধবার, ০৬:১৫:৪২ অপরাহ্ন


বেইজিংয়ের রেড কার্পেটে তারেক রহমানের পা
দিল্লিকে এড়িয়ে ‘বিকল্প’ অক্ষের সূচনা
বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট করা হয়েছে : ০১-০৭-২০২৬
দিল্লিকে এড়িয়ে ‘বিকল্প’ অক্ষের সূচনা চীনের রাষ্ট্রপতির সাথে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী


বাংলাদেশের ক্ষমতার পালাবদল এবং বৈদেশিক নীতির বহু উত্থান-পতন সমৃদ্ধ ইতিহাস। অতি সম্প্রতি সম্পন্ন হওয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের (২২-২৬ জুন ২০২৬) চীন সফর বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম একটি সাহসী ও কৌশলগত মোড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ক্ষমতার মসনদে বসার পর এটিই ছিল তাঁর প্রথম দ্বিপাক্ষিক বিদেশ সফর। যদিও আনুষ্ঠানিক সফরসূচিতে প্রথমে মালয়েশিয়াকে স্থান দিয়ে প্রোটোকলের একটি ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করা হয়েছিল, তবে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির টেবিলে আসল গুরুত্বটা যে বেইজিং সফরকে ঘিরেই ছিল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

সবচেয়ে বড় চমক এবং এই সফরের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত আপত্তি ও দৃষ্টিকে এক প্রকার উপেক্ষা করেই বেইজিংয়ের কাছ থেকে তিস্তা ব্যারেজ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনায় সরাসরি সহায়তার প্রতিশ্রুতি আদায়। এটা বাংলাদেশের এ যাবৎকালের মধ্যে সবচে বড় অর্জন। 

বেইজিংকে বেছে নেওয়া: দিল্লিকে এড়িয়ে ‘বিকল্প’ অক্ষের সূচনা?

বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি ও কূটনীতিতে দিল্লির যে একচ্ছত্র প্রভাব ছিল, তারেক রহমান সরকার গঠনের পরপরই তা পুনর্মূল্যায়নের টেবিলে উঠেছে। মালয়েশিয়ায় প্রথম পা রাখলেও, কূটনৈতিক মহলে স্পষ্ট বার্তা ছিল মূল লক্ষ্য বেইজিং। ভারতের চিরবৈরী প্রতিবেশী চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাস বিষয়ক জাদুঘর পরিদর্শন এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর সঙ্গে একান্ত বৈঠক প্রমাণ করে, ঢাকা এখন একমুখী পররাষ্ট্রনীতির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে বহুমাত্রিক শক্তির ভারসাম্য তৈরি করতে চায়। দিল্লিকে এক প্রকার পাশ কাটিয়ে সরাসরি বেইজিংয়ের রেড কার্পেটে পা রাখা বাংলাদেশের নতুন সরকারের একটি বড় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত, যা বেইজিং সফলভাবেই লুফে নিয়েছে।

তিস্তা ব্যারেজ ও মহাপরিকল্পনা : ভারতের আপত্তি উপেক্ষা করে বড় অর্জন

এই সফরের সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক ঘটনা হলো তিস্তা নদীর পানি বণ্টন ও ব্যারেজ প্রকল্পে চীনের প্রত্যক্ষ কারিগরি ও আর্থিক সহায়তার বিষয়টি চূড়ান্ত করা। ভারত দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের তিস্তা প্রকল্পে চীনের প্রবেশকে তাদের শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’-এর নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করে আসছিল। পূর্ববর্তী সরকার ভারতের এই সংবেদনশীলতাকে সমীহ করলেও, তারেক রহমানের প্রশাসন দেশের পানির ন্যায্য হিস্যা ও উত্তরাঞ্চলের মরণদশা দূর করতে সরাসরি চীনের হাত ধরেছে।

এটি দিল্লির জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা যে, বাংলাদেশ এখন নিজের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় অন্য কোনো আঞ্চলিক শক্তির ‘ভেটো’ বা আপত্তি মানতে প্রস্তুত নয়। চীনের এই প্রকল্পে যুক্ত হওয়া ঢাকার জন্য একটি বিশাল স্ট্র্যাটেজিক জয়।

সফরের সফলতার খতিয়ান

প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চীনের ‘বিশ্বস্ত বন্ধু ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। চার দিনের এই সফরের দৃশ্যমান অর্জনগুলো হলো:

এ সফরে উদীয়মান শিল্প, সংযোগ অবকাঠামো (কানেক্টিভিটি), এবং আঞ্চলিক সমন্বয় জোরদারে ১৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।

এছাড়াও দুই দেশের সম্পর্ককে ‘নতুন যুগের কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্বে’ (ঈড়সসঁহরঃু রিঃয ধ ংযধৎবফ ভঁঃঁৎব রহ ঃযব হবি বৎধ) উন্নীত করা হয়েছে। বাংলাদেশ চীনের ‘গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ (এউও)-এ আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিয়েছে।

ভারতকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ার এই নীতি দীর্ঘমেয়াদে দিল্লির সাথে সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও ট্রানজিট ইস্যুতে বড় ধরণের টানাপোড়েন তৈরি করতে পারে। তিন দিকে ভারতবেষ্টিত একটি দেশের জন্য বেইজিংকে দিয়ে দিল্লিকে কাউন্টার করার এই কৌশল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

চীনের বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের প্রস্তাব দেশের অর্থনীতিতে স্বস্তি আনলেও শ্রীলঙ্কা বা পাকিস্তানের মতো ঋণের ফাঁদের ঝুঁকি তৈরি করে। এছাড়া পশ্চিমা বিশ্ব (বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র) ঢাকার এই বেইজিংমুখী অবস্থানকে কতটা সহজভাবে নেবে, তা দেখার বিষয়।

বেইজিংয়ের সাথে যৌথ ইশতেহারে বাংলাদেশ ‘এক চীন নীতি’ এবং তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতার কথা যেভাবে পুনর্ব্যক্ত করেছে, তা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের নিরপেক্ষ ভাবমূর্তিকে কিছুটা একপেশে করে তুলতে পারে।

এক নজরে অর্জন তারেক রহমানের 

তিস্তা প্রকল্প ও অবকাঠামো: তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে চীনের সহায়তা এবং মোংলা বন্দর সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহায়তা: উন্নয়ন সহযোগিতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কৃষি, শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং মিডিয়া খাতে সহযোগিতার পথ সুগম হয়েছে।

রাজনৈতিক সমর্থন: চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং বহিরাগত হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

কৌশলগত অংশীদারিত্ব: দুই দেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ (ঝঃৎধঃবমরপ চধৎঃহবৎংযরঢ়) পর্যায়ে উন্নীত করার বিষয়ে একমত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাগ্লোবাল সাউথ ও ব্রিকস: বৈশ্বিক পর্যায়ে ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষা এবং ব্রিকসসহ বিভিন্ন বহুপাক্ষিক ফোরামে একসঙ্গে কাজ করার ব্যাপারে সমঝোতা হয়েছে।

বাণিজ্য বৃদ্ধি: চীনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং চীনা বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। এই সফরের সার্বিক অগ্রগতি এবং সমঝোতা স্মারকগুলোর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ভিত্তি স্থাপন করেছে। 

সবশেষ 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই চীন সফরকে এক কথায় এক বিশাল রূপান্তর বলা চলে। সবাইকে এড়িয়ে, বিশেষ করে ভারতের প্রভাব বলয়কে পাশ কাটিয়ে বেইজিংয়ের সাথে হাত মেলানো এবং তিস্তার মতো স্পর্শকাতর প্রকল্পে চীনকে যুক্ত করা নিঃসন্দেহে একটি অত্যন্ত সাহসী ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তবে বেইজিংয়ের এই বিশাল সাফল্য তখনই টেকসই হবে, যখন ঢাকা চীনের ঋণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে এবং একই সাথে ভারতের ক্ষোভ প্রশমন করে একটি টেকসই দ্বিপাক্ষিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পারবে। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশ এখন আর কেবল একটি ‘বাফার স্টেট’ বা দর্শক নয়, বরং তারেক রহমানের এই সফরের মাধ্যমে ঢাকা নিজেকে একটি অত্যন্ত চতুর ও স্বাধীন প্লেয়ার হিসেবে প্রমাণ করার লড়াইয়ে নেমেছে।

শেয়ার করুন