২৯ জুলাই ২০২৬, বুধবার, ১০:৫৪:৩১ অপরাহ্ন


রাষ্ট্রীয় সম্পদ বানরের পিঠা ভাগ হচ্ছে
বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৯-০৭-২০২৬
রাষ্ট্রীয় সম্পদ বানরের পিঠা ভাগ হচ্ছে যুক্তফ্রন্টের বিক্ষোভ সমাবেশ


গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের উদ্যোগে মতিঝিলস্হ শিল্প মন্ত্রণালয়ের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত ৪৪টি শিল্প কারখানা ঢালাওভাবে দেশি-বিদেশি লুটেরাদের কাছে বিক্রির সরকারি চক্রান্তের প্রতিবাদে এই বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

সমাবেশে নেতৃবৃন্দ বলেন, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) কর্তৃক ঢালাওভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প কারখানাসমূহ দেশি-বিদেশি বেসরকারি কোম্পানির বিনিয়োগের জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ৫টি কর্পোরেশনের আওতাধীন ৪৪টি শিল্প প্রতিষ্ঠান উন্মুক্ত করার তথা বিক্রির গণবিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে সরকার। তারই অংশ হিসেবে আজ শিল্প মন্ত্রণালয়ে কর্পোরেট পুঁজির মালিকদের তথা লুটেরা গোষ্ঠীর সাথে বিডা এবং রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতিনিধি, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব/কর্মকর্তাদের এক সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। সেটা জেনেই জোটের পক্ষ থেকে এই বিক্ষোভের ঘোষণা দেওয়া হয়।

সমাবেশে নেতৃবৃন্দ বলেন, দেশের বিপুল সংখ্যক শিল্প কল কারখানা ঢালাওভাবে নিলামে তোলার উদ্যোগ দেখে মনে হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সম্পদ বানরের পিঠা ভাগ করা হচ্ছে।

সমাবেশে নেতৃবৃন্দ বলেন, দশ হাজার একরেরও বেশি জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত ৪৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প কারখানা ‘বিদ্যমান শিল্পসম্পদে পুনঃবিনিয়োগ’, ‘পুনর্গঠন ও পুনঃউন্নয়ন’, ‘ইজারাভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি ইজারাভিত্তিক ব্যবস্থা’, ‘যৌথ উদ্যোগ’, ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ ইত্যাদি নামে দেশি-বিদেশি বেসরকারি কোম্পানির কাছে বিক্রির জন্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ মূলত রাষ্ট্রীয় সম্পদ তথা জনগণের সম্পদের ওপর কর্পোরেট পুঁজির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এক সুপরিকল্পিত উদ্যোগ।

নেতৃনৃন্দ বলেন, সরকার এই উদ্যোগকে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কর্মসূচি হিসেবে মিথ্যা প্রচার করে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে এটি দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর পরামর্শে অনুসৃত নয়া উদারীকরণ ও বেসরকারিকরণ নীতিরই ধারাবাহিকতা মাত্র। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং দেশি-বিদেশি বৃহৎ কর্পোরেট পুঁজির চাহিদা অনুযায়ী রাষ্ট্রকে উৎপাদন ও শিল্প পরিচালনা থেকে সরিয়ে দিয়ে কেবল বেসরকারি পুঁজির পৃষ্ঠপোষকতার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার যে নীতি বিগত সরকারগুলোর আমল থেকে অনুসরণ করা হচ্ছে, এই উদ্যোগ তারই ধারাবাহিকতা।

নেতৃবৃন্দ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে যে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান মানেই লোকসানি, অদক্ষ, উৎপাদনশীলতার ঘাটতি ও অকার্যকর। বাস্তবতা হলো, পরিকল্পিতভাবে অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও মাথাভারী প্রশাসন জিইয়ে রাখা, সময়মতো অর্থ ছাড় না করে, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ না করে ও যন্ত্রের আধুনিকায়ন না করে, উৎপাদন সামগ্রীর বহুমূখিকরণ না করে, শ্রমিক প্রতিনিধসহ অংশিজনদের সমন্বয়ে দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করে, ট্রেড ইউনিয়নসমূহ সরকারি শ্রমিক সংগঠন কর্তৃক দখল করে এবং সরকার নীতিগত অবহেলার মাধ্যমে বহু রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকে পরিকল্পিতভাবে সংকটের মুখে ঠেলে দিয়ে লোকসানী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে। এরপর সেই সংকটে সৃষ্ট লোকসানকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে জনগণের সম্পদ অতীতের মতোই পানির দামে বেসরকারি মালিকানায় তুলে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। এটি কোনো অর্থনৈতিক সংস্কার নয়; বরং ধাপে ধাপে রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদের বেসরকারিকরণ তথা হরিলুটের নীতি।

নেতৃবৃন্দ বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ভূমি ও অবকাঠামো জনগণের সম্পদ। এসব সম্পদ কেবল বর্তমান প্রজন্মের নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরও জাতীয় সম্পদ। শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, আঞ্চলিক ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই সাময়িক আর্থিক লাভ কিংবা বিনিয়োগ আকর্ষণের মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে এই সম্পদের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল ও রহিত করা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী।

নেতৃবৃন্দ বলেন, ৪৪টি শিল্পসম্পদ বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করার ঘোষণা করা হয়েছে। কোন ক্রাইটেরিয়ার ভিত্তিতে এগুলো নির্বাচন করা হয়েছে, সম্পদগুলোর প্রকৃত আর্থিক মূল্য কত তা ইনভেন্ট্রি করা হয়েছে কিনা, কী শর্তে ইজারা বা যৌথ বিনিয়োগ হবে, রাষ্ট্রের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ কতটুকু বজায় থাকবে এসব বিষয়ে জনগণের সামনে কোনো স্বচ্ছ তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি। জাতীয় সম্পদ নিয়ে এ ধরনের সিদ্ধান্ত দেশের জনগণ, শিল্পের অংশীদার শ্রমিক, বিশেষজ্ঞ, এমনকি জাতীয় সংসদকে পাশ কাটিয়ে গ্রহণ করা গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প কারখানা বেসরকারি পুঁজির জন্য উন্মুক্ত করার গণবিরোধী তৎপরতা বন্ধ করার, প্রস্তাবিত ৪৪টি প্রকল্প ও প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ তালিকা, মূল্যায়ন ও প্রস্তাবিত চুক্তির শর্ত জনসমক্ষে প্রকাশ করা, শ্রমিক সংগঠন, অর্থনীতিবিদ, শিল্প বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের অংশগ্রহণে জাতীয় আলোচনা আয়োজন এবং বন্ধ সকল রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল পাটকলসহ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আধুনিকায়ন করে পুনরায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে চালুর জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় শিল্পনীতি প্রণয়নের দাবি জানান।

নেতৃবৃন্দ বলেন, জনগণের অর্থে গড়ে ওঠা রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প কারখানা কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দেশি-বিদেশি কর্পোরেট স্বার্থের ও তাদের মুনাফার উৎসে পরিণত হতে দেওয়া হবে না।

নেতৃবৃন্দ জাতীয় সম্পদ, অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব এবং রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প রক্ষায় সকল বাম প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল, সংগঠন, ব্যক্তিসহ সকল দেশপ্রেমিক জনগণকে ঐক্যবদ্ধ গণআন্দোলন গড়ে তুলে শাসকশ্রেণি ও দেশি বিদেশি লুটেরাদের ষড়যন্ত্র রুখে দাঁড়ানোর জন্য আহ্বান জানান।

সমাবেশ থেকে রাষ্ট্রায়ত্ব বন্ধ চিনিকল আধুনিকায়ন করে চালুর দাবিতে চিনিকল সংগ্রাম কমিটি আহুত আগামী ১০ আগস্ট ২০২৬ ঢাকায় সমাবেশ ও স্মারকলিপি পেশের কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জানানো হয় এবং সফল করার জন্য শ্রমিক-কর্মচারী-জনতার প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের সমন্বয়ক ও বাসদের সাধারণ সম্পাদক কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, সিপিবির সাধারণ সম্পাদক কমরেড আবদুল্লাহ ক্কাফি রতন, বাংলাদশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য করিম সিকদার, বিপ্লবী কমিউনিষ্ট লীগের সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য অধ্যাপক আব্দুস সাত্তার, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড মোশরেফা মিশু, বাসদ (মাহবুব) সাধারণ সম্পাদক হারুনার রশীদ ভূইয়া, বাসদ (মার্কসবাদী) সমন্বয়ক কমরেড মাসুদ রানা, জাতীয় গণফ্রন্টের ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়ক রজত হুদা, সোনার বাংলা পাটির সভাপতি সৈয়দ হারুন অর রশীদ। আরও বক্তব্য রাখেন, রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল ও পাটকল রক্ষা সংগ্রাম জাতীয় কমিটির নেতা কামরুজ্জামান ফিরোজ, আ.ক.ম জহিরুল ইলাম, ফয়েজ হোসেন, সত্যজিত বিশ্বাস। সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের আহবায়ক জামসেদ আনোয়ার তপন প্রমুখ।

শেয়ার করুন