২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বুধবার, ১১:০৫:৪৯ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
হোয়াইট হাউসে প্রবেশাধিকার বন্ধ : ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা মসজিদ ও ডিয়ারবর্নের মেয়রকে হুমকির অভিযোগে রোজভিলের নারী অভিযুক্ত ইসলামবিরোধী বক্তব্যের বিরুদ্ধে টেক্সাসে মুসলিমদের পাল্টা লড়াই তিন ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীকে গুলি : জেসন ইটন দোষী সাব্যস্ত অনথিভুক্ত শিশুদের সরকারি শিক্ষার অধিকার নিয়ে নতুন বিতর্ক প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রবাসী বাংলাদেশী ফোরামের ৯ দাবি ‘বেস্ট অব দ্য ওয়েস্ট’ ইয়ুথ লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ডে সম্মানিত তাহমিদ চৌধুরী সরকারি কর্মকর্তা সেজে বাড়ছে প্রতারণা চল্লিশ বছর আগের সেই দিনটির কথা দিয়েই শুরু ড. খলিলের চুক্তি না হলে ইরানকে ধ্বংসের হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের


ফিনল‍্যান্ড সুয়োমেনলিন্না সমুদ্রের বুকে ইতিহাসের দুর্গ
হাবিব রহমান
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৩-০৯-২০২৬
ফিনল‍্যান্ড সুয়োমেনলিন্না সমুদ্রের বুকে ইতিহাসের দুর্গ সুয়ামেনলিন্নার পথে ফেরিতে লেখক


সকালের হেলসিঙ্কি। জানালার কাচে তখনও উত্তরের নরম আলো। রাতের অন্ধকার পুরোপুরি সরে যায়নি, অথচ শহর জেগে উঠেছে অনেক আগেই। আমি দাঁড়িয়ে আছি হেলসিঙ্কির একটি হোটেলের জানালার পাশে। দূরে সমুদ্রের ওপর হালকা কুয়াশা। মনে হচ্ছিল, ফিনল্যান্ডের এ রাজধানী শহরটি যেন ঘুম ভাঙার পরও কিছুক্ষণ স্বপ্নের মধ্যে রয়ে গেছে। আজ আমার গন্তব্য- সমুদ্রের বুকের সেই বিখ্যাত দুর্গ, সুয়োমেনলিন্না।

হেলসিঙ্কিতে জুলাইয়ের রাত আসলে রাত নয়। এগারোটার পরেও আকাশে একটা ফিকে গোলাপি আলো লেগে থাকে, আর ভোর চারটে বাজতে না বাজতেই সেই আলো আবার সোনালি হয়ে ওঠে। তাই আগের রাতে ঘুম এসেছিল দেরিতে। তারপরও তাড়াহুড়া করে উঠে পড়েছি। সকাল সকাল বেরোতে হবে। গন্তব্য-সমুদ্রের বুকের সেই বিখ্যাত দুর্গ, সুয়োমেনলিন্না।

এসপ্লানাদি সড়কের ধারের পুরনো এই হোটেলটা আমার খুব পছন্দের। উঁচু সিলিং, কাঠের মেঝে, জানালার বাইরে লিন্ডেন গাছের সারি। সকালে নাস্তার টেবিলে বসে দেখলাম, রাইয়ের কালচে রুটি, হালকা নোনতা মাখন, শসা, টমেটো, আর ছোট্ট একটা বাটিতে লিঙ্গনবেরির জ্যাম। কফিটা কড়া, একটু তেতো, কিন্তু প্রথম চুমুকেই শরীরটা জেগে উঠল। ফিনিশরা নাকি পৃথিবীতে মাথাপিছু সবচেয়ে বেশি কফি খায়। প্রথম দিনেই বুঝে গিয়েছিলাম, কথাটা মিথ্যে নয়। ঠিক সাড়ে ৮টায় রিসেপশন থেকে ফোন এলো, আপনার গাইড এসে গেছেন। লবিতে নেমে দেখি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণী। হালকা নীল রঙের উইন্ডব্রেকার, কাঁধে ক্যানভাসের ব্যাগ, সোনালি চুল পেছনে ঢিলে করে বাঁধা। 

আমাকে দেখে সে এগিয়ে এল, হাসিটা একটু লাজুক, কিন্তু চোখদুটো আশ্চর্য রকম পরিষ্কার, ঠিক বাল্টিকের জলের মতো ধূসর-নীল। হ্যোভা হুওমেন্তা! (সুপ্রভাত) সে হাত বাড়িয়ে দিল।

—আমি আইনো। আজ সারাদিন তোমার ভ্রমণসঙ্গী।

—আইনো, নামটা খুব সুন্দর। আমি বললাম।

—আমাদের জাতীয় মহাকাব্য কালেভালার একটা চরিত্রের নাম, সে বললো। গল্পটা অবশ্য খুব দুঃখের। সে সমুদ্রে হারিয়ে গিয়েছিল। 

—আমি বললাম, আশা করি আজ কেউ সমুদ্রে হারাবে না। সে হেসে ফেললো।

—বললো, দেরি হয়ে যাচ্ছে। চলো ফেরি ধরতে হবে।

হোটেল থেকে মার্কেট স্কোয়ার, মানে কাউপ্পাতোরি, হেঁটে মাত্র কয়েক মিনিট। এসপ্লানাদি পার্কের সবুজ ঘাসে তখন শিশির শুকোচ্ছে। বেঞ্চে বসে এক বৃদ্ধ খবরের কাগজ পড়ছেন, পায়ের কাছে গুটিসুটি মেরে বসে আছে একটা ছোট্ট কুকুর। সাইকেলের ঘণ্টা বাজিয়ে পাশ দিয়ে চলে গেল অফিসগামী এক তরুণ। আইনো হাঁটতে হাঁটতে দেখাচ্ছিল, ওই যে সবুজ ট্রাম, হেলসিঙ্কির ট্রাম প্রায় শতবর্ষের পুরোনো ব্যবস্থা। আর ওই ফোয়ারার মূর্তিটা দেখ, হাভিস আমান্দা। সমুদ্র থেকে উঠে আসা এক জলকন্যা। স্নাতক পাসের দিনে ছাত্রছাত্রীরা ওর মাথায় সাদা টুপি পরিয়ে দেয়। তুমিও পরিয়েছিলে? 

—আমি তো ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে চিৎকার করেছিলাম শুধু, সে হাসলো। মূর্তির কাছে পৌঁছানো অত সহজ নয়।

মার্কেট স্কোয়ারে তখন কমলা রঙের তাঁবুর নিচে দোকানিরা পসরা সাজাচ্ছে। টুকটুকে লাল স্ট্রবেরি, গাঢ় নীল ব্লুবেরি, সবুজ খোসার তাজা মটরশুঁটি, যা ফিনিশরা নাকি কাঁচাই খায়। একপাশে ধোঁয়া উঠছে ভাজা মাছের দোকান থেকে। মাথার ওপর দিয়ে চিৎকার করে উড়ে যাচ্ছে সিগাল। 

—সাবধান,আইনো আমার হাতের দিকে ইশারা করল। এখানকার সিগালরা খুব সাহসী। হাত থেকে আইসক্রিম ছিনিয়ে নেয়। আমার হাতে তো কিছু নেই। 

—এখনো নেই, সে দুষ্টু হাসি দিয়ে বলল, আর একটা দোকান থেকে এক ঠোঙা স্ট্রবেরি কিনে আমার হাতে দিল। এবার সাবধান থাক।

স্ট্রবেরিগুলো এতো মিষ্টি যে অবাক হয়ে গেলাম। আইনো বুঝিয়ে দিলো, উত্তরের গ্রীষ্মে দিন প্রায় অন্তহীন, তাই ফলগুলো দীর্ঘ সময় সূর্যের আলো পায়, মিষ্টতা জমে বেশি। মনে হলো, এ দেশটাও হয়তো তেমন, দীর্ঘ শীতের পর যেটুকু আলো পায়, সবটুকু জমিয়ে রাখে ভেতরে। জেটিতে দাঁড়িয়েছিল সাদা-নীল রঙের ফেরিটা। আইনো দুটো টিকেট কেটে আনলো, আমি টাকা দিতে চাইলে মাথা নেড়ে বললো, লাগবে না, গাইডের প্যাকেজে ধরা আছে। আমরা গিয়ে বসলাম ফেরির পেছনের খোলা ডেকে। ইঞ্জিন গর্জে উঠলো, জল কেটে ফেরি এগোতে লাগলো। পেছনে ধীরে ধীরে সরে যেতে লাগলো হেলসিঙ্কির তটরেখা। পেছনে তাকাও, আইনো বললো। তাকিয়ে দেখি এক অপূর্ব দৃশ্য। টিলার ওপর লাল ইটের উসপেনস্কি ক্যাথেড্রাল, মাথায় সোনালি গম্বুজ রোদে ঝিকমিক করছে। একটু দূরে সাদা ধবধবে হেলসিঙ্কি ক্যাথেড্রাল, সবুজ গম্বুজ নিয়ে যেন আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। জলের ধারে বিশাল নাগরদোলা, তার পাশে সমুদ্রের জলেই বানানো সুইমিং পুল, যেখানে এই সকালেও কয়েকজন সাঁতার কাটছে।

এতো ঠান্ডা জলে? আমি অবাক। এটা তো গ্রীষ্ম! আইনো হাসল। শীতকালে আমরা বরফ কেটে জলে নামি।

—তুমিও? অবশ্যই। একবার শীতে এসো, আমি নিয়ে যাব। কথাটা সে হালকা চালেই বলেছিল, কিন্তু আমার মনের কোথাও যেন একটা ছোট্ট ঢেউ উঠলো। ফেরি এগিয়ে চললো ছোট ছোট দ্বীপের মাঝ দিয়ে। কোনোটায় একটা লাল কাঠের কটেজ, সামনে ছোট্ট জেটি আর নৌকা। কোনোটা নিছক গ্রানাইট পাথর, হাজার বছরের হিমবাহে মসৃণ হয়ে যাওয়া, তার ওপর রোদ পোহাচ্ছে পাখির দল। বাতাসে লবণ আর পাইনের গন্ধ মেশানো। বাতাস একটু জোরে বইছিল। আইনোর চুলের কয়েকটা গোছা খুলে গিয়ে উড়ছিল মুখের সামনে। সে বিরক্ত হয়ে সেগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিলো, বাতাস আবার খুলে দিলো। শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে হাসলো।

—বাল্টিক আমার সঙ্গে সবসময় এমন দুষ্টুমি করে। হয়তো বাল্টিকও তোমাকে পছন্দ করে, আমি বললাম। সে এক মুহূর্ত আমার দিকে তাকিয়ে রইলো, তারপর চোখ সরিয়ে জলের দিকে তাকালো। গাল দুটো হালকা লাল হয়ে উঠলো, হয়তো বাতাসের জন্য, হয়তো নয়। মাত্র পনেরো-বিশ মিনিটের যাত্রা। সামনে ধূসর পাথরের দেয়ালঘেরা দ্বীপগুলো ভেসে উঠলো। ফেরি থেকে নেমেই চোখে পড়লো গোলাপি রঙের একটা লম্বা ভবন, মাথায় ঘড়িওয়ালা ছোট্ট মিনার। জেটির পাশ দিয়ে পাথর বাঁধানো পথ ধীরে ধীরে উঠে গেছে।

আইনো থামলো, ব্যাগ থেকে একটা পুরোনো মানচিত্রের কপি বের করলো, শুরুর আগে একটু গল্প বলি—সে বললো আর তার গলার স্বর বদলে গেল, যেন গল্পকথক। 

—১৮ শতকের মাঝামাঝি। ফিনল্যান্ড তখন সুইডেনের অধীনে। পূর্বদিকে রাশিয়া দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে, সেন্ট পিটার্সবার্গ নতুন রাজধানী, বাল্টিকে রুশ নৌবহর। সুইডেনের ভয়, পরের আক্রমণে ফিনল্যান্ড হাতছাড়া হবে। তাই ১৭৪৮ সালে তারা সিদ্ধান্ত নিলো, হেলসিঙ্কির মুখে এ দ্বীপগুলোর ওপর এমন এক সমুদ্রদুর্গ গড়বে, যা কেউ ভাঙতে পারবে না। আর সেটা কে বানালো? আমি জানতে চাইলাম।

—অগাস্টিন এহরেন্সভার্ড। তরুণ এক সামরিক অফিসার, মাত্র ত্রিশের ঘরে বয়স। কিন্তু তার স্বপ্ন ছিল বিশাল। সে এর নাম দিয়েছিল স্ভেয়াবোর্গ, মানে সুইডেনের দুর্গ। আজ আমরা বলি সুওমেনলিন্না, ফিনল্যান্ডের দুর্গ। নাম বদলাল কবে? ১৯১৮ সালে, ফিনল্যান্ড স্বাধীন হওয়ার পর। একটা নাম বদল মানে পুরো একটা ইতিহাসের মালিকানা বদল।

আমরা হাঁটতে লাগলাম। ছয়টা দ্বীপ সেতু আর বাঁধ দিয়ে যুক্ত, আইনো আঙুল দিয়ে দেখালো। পথের দুপাশে পুরোনো হলুদ আর লাল রঙের বাড়ি, জানালায় ফুলের টব। একটা বাচ্চা সাইকেল চালিয়ে আমাদের পাশ দিয়ে চলে গেল। এখানে মানুষ থাকে? আমি জিজ্ঞেস করলাম। প্রায় ৮০০ জন। এটা শুধু জাদুঘর নয়, একটা জীবন্তপাড়া। এখানে স্কুল আছে, দোকান আছে, লাইব্রেরি আছে। শীতে যখন পর্যটক থাকে নাতখন এ দ্বীপ শুধু তাদের।

শুনে একটু ঈর্ষা হচ্ছে। আমি বললাম। আমারও হয়, আইনো স্বীকার করলো। ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন দেখি, একদিন এখানকার কোনো পুরোনো বাড়িতে থাকবো, জানালা দিয়ে সমুদ্র দেখবো। আমরা পৌঁছলাম দুর্গের প্রধান চত্বরে, সুউরি লিন্নানপিহা, মহাআঙিনা। চারদিকে পাথরের ভবন, মাঝখানে সবুজ ঘাস, আর তার কেন্দ্রে একটা সমাধি। এহরেন্সভার্ডের কবর, আইনো নিচু গলায় বললো। যে দুর্গ সে বানিয়েছিল, সেখানেই সে শুয়ে আছে। তার সমাধিফলকে লেখা আছে, মোটামুটি এরকম: উত্তরসূরিরা, নিজের ভিতের ওপর দাঁড়াও, বিদেশি সাহায্যের ওপর ভরসা করো না। সমাধির সামনে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। বাতাসে গাছের পাতার শব্দ। দূরে কোথাও সিগালের ডাক। কিন্তু এতো শক্তিশালী দুর্গ, এটা কি কখনো পরাজিত হয়েছিল? আমি জানতে চাইলাম।

আইনোর মুখে একটা বিষণ্ন হাসি ফুটলো। এটাই সবচেয়ে রহস্যময় গল্প। ১৮০৮ সাল, ফিনিশ যুদ্ধ। রুশ সেনারা দুর্গ ঘিরে ফেললো। কিন্তু সরাসরি আক্রমণ করলো না, বরং শুরু করল মনস্তাত্ত্বিক খেলা। ভুয়া খবর ছড়ালো, সুইডেন হেরে যাচ্ছে, সাহায্য আসবে না। দুর্গের সেনাপতি কার্ল ওলোফ ক্রনস্টেডট, একজন সম্মানিত নৌ-বীর, তিনি হঠাৎ আত্মসমর্পণ করলেন। প্রায় কোনো যুদ্ধ ছাড়াই।

কেন?

কেউ ঠিক জানে না। কেউ বলে বিশ্বাসঘাতকতা, কেউ বলে তিনি সৈনিক আর সাধারণ মানুষের প্রাণ বাঁচাতে চেয়েছিলেন। শীত, রসদের টান, হতাশা। সুইডেনে তাকে দোষী করা হয়। ইতিহাস এখনো তার বিচার শেষ করেনি। অদ্ভুত, আমি বললাম। যে দুর্গ কেউ ভাঙতে পারবে না বলে বানানো হলো, তার পতন হলো মানুষের মনের ভেতর থেকে। আইনো আমার দিকে তাকালো, একটু বিস্মিত হয়ে। 

—ঠিক বলেছ। দেয়াল যত শক্তই হোক, মন ভেঙে গেলে সব শেষ। সেই মুহূর্তে কথাটা শুধু দুর্গের গল্প মনে হলো না। আমরা এগিয়ে গেলাম দক্ষিণে, কুস্তানমিয়েক্কা দ্বীপের দিকে। এখানে দুর্গের দেয়াল সবচেয়ে প্রাচীন আর সবচেয়ে নাটকীয়। ঘাসে ঢাকা মাটির ঢিবির ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে পুরনো কামান, মুখ সমুদ্রের দিকে। সুড়ঙ্গের মতো অন্ধকার পথ, ভেতরে ঠান্ডা, স্যাঁতসেঁতে পাথরের গন্ধ।

একটা সুড়ঙ্গে ঢুকতেই আলো প্রায় নিভে গেল। আমি মোবাইলের টর্চ জ্বালাতে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ পায়ের নিচে একটা উঁচু পাথরে হোঁচট খেলাম। আইনো সঙ্গে সঙ্গে আমার হাতটা ধরে ফেলল। সাবধান! এখানে মেঝে অসমান। সুড়ঙ্গের বাইরে না আসা পর্যন্ত সে হাতটা ছাড়লো না। বাইরে আলোয় এসে দুজনেই যেন একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লাম। সে হাত ছেড়ে দিয়ে চুল ঠিক করার ভান করলো।

—এ সুড়ঙ্গে, সে তাড়াতাড়ি গাইডের স্বরে ফিরে গেল, ১৮৫৫ সালে ক্রিমিয়ার যুদ্ধের সময় সৈন্যরা আশ্রয় নিয়েছিল। তখন দুর্গ রাশিয়ার হাতে। ব্রিটিশ আর ফরাসি যুদ্ধজাহাজ টানা প্রায় দুদিন গোলা বর্ষণ করেছিল। পুরো আকাশ লাল হয়ে গিয়েছিল। হেলসিঙ্কির মানুষ পাহাড়ে উঠে সেই আগুন দেখেছিল। দেয়ালে এখনো কিছু জায়গায় পুরোনো ক্ষতচিহ্ন। আমি হাত রাখলাম ঠান্ডা পাথরে। মনে হলো, পাথরগুলো কথা বলতে পারলে কত আর্তনাদ, কত প্রার্থনা, কত চিঠি না লেখা ভালোবাসার গল্প শোনাতো।

এরপর আমরা পৌঁছলাম কিংস গেটের কাছে, কুনিঙ্কানপোর্তি। সমুদ্রের দিকে মুখ করা এক রাজকীয় পাথরের তোরণ, ১৭৫০-এর দশকে বানানো। একসময় সুইডেনের রাজা নিজে জাহাজ থেকে নেমে এই পথে দুর্গে ঢুকেছিলেন। তোরণের নিচে দাঁড়িয়ে সামনে তাকালাম। অসীম নীল সমুদ্র, দূরে কয়েকটা পালতোলা নৌকা, দিগন্তে একটা বিশাল ক্রুজ জাহাজ ধীরে ধীরে এগোচ্ছে এস্তোনিয়ার দিকে। এখান থেকে সোজা গেলে তালিন, আইনো বললো। আর তারও ওপারে, পুরো পৃথিবী। তুমি কখনো চলে যেতে চাওনি এই পুরো পৃথিবীতে? সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। বললো-চেয়েছি। অনেকবার। কিন্তু প্রতিবার এই তোরণের নিচে এসে মনে হয়, যারা চলে যায় তাদের জন্য কাউকে তো অপেক্ষা করতে হয়। হয়তো আমি সেই অপেক্ষার মানুষ। বাতাসের শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছিল না।

মন হালকা করতে আইনো আমাকে নিয়ে গেল ভেসিক্কো দেখতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার একটা ফিনিশ সাবমেরিন, এখন ডাঙায় তুলে রাখা জাদুঘর। ভেতরে ঢুকে অবাক হলাম, এতো সরু, এতো ঠাসাঠাসি! যন্ত্রপাতি, পাইপ, ভালভ, আর তার মাঝে সরু বাঙ্ক। এখানে বিশজনের মতো নাবিক থাকতো, আইনো বললো। সপ্তাহের পর সপ্তাহ, জলের নিচে। এত কাছাকাছি থাকতে থাকতে তো কেউ কারো কাছে কিছু লুকোতে পারত না। হয়তো সেজন্যই তারা ভাইয়ের মতো হয়ে যেত, সে বললো। আমাদের একটা শব্দ আছে, সিসু। এর কোনো সঠিক অনুবাদ নেই। মানে অনেকটা, যখন সব শক্তি শেষ, তখনও টিকে থাকার জেদ।

—সিসু, আমি আওড়ালাম। শিখে রাখলাম। তারপর গেলাম দ্বীপের গির্জায়। আইনো বললো, এটা প্রথমে রুশ গ্যারিসনের অর্থোডক্স গির্জা হিসেবে বানানো হয়েছিল, পরে স্বাধীনতার পর লুথেরান গির্জায় রূপ পায়। সবচেয়ে মজার কথা, এর চূড়াটা আজও বাতিঘর হিসেবে কাজ করে, রাতে জাহাজকে আলো দেখায়। একটা গির্জা, যেটা একসঙ্গে প্রার্থনার জায়গা আর পথ দেখানোর আলো, আমি বললাম। খুব কাব্যিক। তুমি সবকিছুতেই কবিতা খুঁজে পাও। আইনো হাসল। আজ কবিতা খুঁজতে হচ্ছে না। নিজে থেকেই সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে। সে উত্তর দিল না। কিন্তু হাঁটার সময় লক্ষ করলাম, আমাদের দুজনের মাঝের দূরত্বটা একটু কমে এসেছে।

দুপুর গড়িয়ে যেতেই আইনো আমাকে নিয়ে গেল সমুদ্রের ধারে একটা পুরোনো পাথরের ভবনে গড়ে ওঠা রেস্তোরাঁয়। ভেতরে কাঠের টেবিল, মোমবাতি, দেয়ালে পুরনো জাহাজের ছবি। আমরা বসলাম জানালার পাশে, যেখান থেকে জল দেখা যায়। আজ আমি অর্ডার দেবো, আইনো ঘোষণা করলো। তোমাকে আসল ফিনল্যান্ডের স্বাদ দিতে হবে। প্রথমে এল লোহিকেইত্তো, স্যামন মাছের স্যুপ। ক্রিমি, হালকা সোনালি, ভেতরে নরম আলু, গাজর, টুকরো টুকরো গোলাপি স্যামন, আর ওপরে ছড়ানো সবুজ ডিল পাতা। প্রথম চামচেই চোখ বুজে এল। ঘন, উষ্ণ, সমুদ্রের স্বাদে ভরা।

কেমন? আইনো উৎসুক চোখে তাকিয়ে। 

—মনে হচ্ছে কেউ একটা ঠান্ডা দিনে কম্বল জড়িয়ে দিলো। সে খুশিতে হেসে উঠলো। বললো, ঠিক এটাই! আমার দিদিমা শীতের রাতে এটা রাঁধতেন। ওর রেসিপিতে একটু বেশি ক্রিম থাকতো। তারপর এল কারেলিয়ান পাই, কারিয়ালানপিরাক্কা। পাতলা রাইয়ের খোসার ভেতর নরম চালের পায়েসের মতো পুর, দেখতে ছোট্ট নৌকার মতো। সঙ্গে ডিম-মাখন, সেদ্ধ ডিম কুচি করে মাখনের সঙ্গে মেশানো। এটা খেতে হয় এভাবে, আইনো নিজে এক চামচ ডিম-মাখন পাইয়ের ওপর মাখিয়ে আমার প্লেটে রাখলো।

প্রধান পদ ছিল পোরোনক্যারিসতুস, হরিণের মাংসের পাতলা টুকরো মাখনে ধীরে রান্না করা, সঙ্গে মাখন দেওয়া আলু ভর্তা, আর টকমিষ্টি লিঙ্গনবেরি সস। মাংসটা নরম, সামান্য বুনো গন্ধ, আর লিঙ্গনবেরির টক সেটাকে অপূর্ব ভারসাম্যে বেঁধে রেখেছে। আমাদের দেশে, আমি বললাম, ভাত-ডাল-মাছ ছাড়া দুপুরের খাবার ভাবাই যায় না। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে, আলু ভর্তার সঙ্গে একটা আত্মীয়তা খুঁজে পেলাম।

আলু ভর্তা? তোমরাও খাও? সরষের তেল, কাঁচা লঙ্কা আর পেঁয়াজ দিয়ে। নাম আলুভাতে। আলু-ভাতে, সে সাবধানে উচ্চারণ করলো, আর এতো মিষ্টি ভুল উচ্চারণ হলো যে আমি হেসে ফেললাম। সে কৃত্রিম রাগে ভুরু কোঁচকাল। হাসছে কেন? আমি তো চেষ্টা করছি! খাওয়ার ফাঁকে সে নিজের কথা বললো। হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস পড়ে, গ্রীষ্মে গাইডের কাজ করে। বাবা মৎস্যজীবী ছিলেন, দেশের পূর্ব উপকূলের এক ছোট শহরে। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে নৌকায় যেত, বাবা তারা চিনিয়ে দিতেন। তিন বছর আগে বাবা মারা গেছেন। সেজন্যই সমুদ্র আমার কাছে একই সঙ্গে ঘর আর বিদায়, সে বললো, জানালার বাইরে তাকিয়ে।

আমি কী বলবো বুঝতে পারলাম না। শুধু আলতো করে বললাম, তোমার বাবা নিশ্চয়ই খুব গর্বিত হতেন। তুমি যেভাবে এই দুর্গের গল্প বলেন, মনে হয় পাথরগুলোও বেঁচে ওঠে। তার চোখ চিকচিক করে উঠলো। ‘কিতোস’, সে ফিসফিস করে বললো। যার অর্থ ধন্যবাদ। খাওয়ার পর আমরা দ্বীপের পশ্চিম দিকে ঘুরলাম, যেখানে মানুষ কম। পাথরের ঢালে বুনোফুল, হলুদ আর বেগুনি। এক জায়গায় দেয়ালের ওপর বসে এক বৃদ্ধ দম্পতি সমুদ্র দেখছিলেন, হাতে হাত রেখে। আইনো তাদের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। পঞ্চাশ বছর পর, সে প্রায় নিজের মনেই বললো, আমিও এভাবে কারো সঙ্গে এখানে বসতে চাই। বেলা ৩টা নাগাদ আমরা পৌঁছলাম একটা ছোট্ট ক্যাফেতে, পাহাড়ের ঢালে, বাগানে কাঠের টেবিল-চেয়ার পাতা। নিচে সমুদ্র ঝলমল করছে।

ফিনল্যান্ডে বিকেলের কফি একটা ধর্মের মতো, আইনো বললো। কাহভিতাউকো, কফি বিরতি। অফিসে পর্যন্ত আইন করে দেওয়া আছে। সে নিয়ে এলো দুকাপ কফি আর দুটো কোরভাপুস্তি। দারুচিনির বান, যার নামের মানে নাকি ‘কানে থাপ্পড়’, কারণ দেখতে অনেকটা চ্যাপ্টা কানের মতো। ওপরে মোটা দানার চিনি ছড়ানো, ভেতরে এলাচের সুবাস। এলাচ! আমি অবাক। এটা তো আমাদের দেশের মসলা। দেখলে, তোমার দেশ আর আমার দেশ, এতো দূরে, তবু এক কামড়ে মিলে গেল। বানটা গরম, নরম, মুখে দিতেই গলে গেল। কফির তেতোর সঙ্গে দারুচিনি-এলাচের মিষ্টতা, আর সামনে অন্তহীন নীল জল। জীবনের সবচেয়ে সুন্দর বিকেলগুলোর একটা, বুঝতে পারছিলাম, আর এটাও বুঝতে পারছিলাম যে এই বিকেলটা শেষ হয়ে যাবে।

তুমি কাল কোথায় যাচ্ছো? আইনো জিজ্ঞেস করলো, কাপের দিকে চোখ রেখে। সকালের ফ্লাইট। নিউইয়র্কে ফেরা। ও একটা ছোট্ট শব্দ, কিন্তু তার ভেতরে অনেকখানি নীরবতা। কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ। একটা চড়ুই এসে টেবিলের কোণে বসল, বানের গুঁড়োর আশায়। আইনো একটু ভেঙে দিল তাকে। জান, সে অবশেষে বলল, আমি প্রতি গ্রীষ্মে অনেক পর্যটককে এ দ্বীপ দেখাই। বেশিরভাগই ছবি তোলে, তারিখ মুখস্থ করে, চলে যায়। কিন্তু তুমি নানা প্রশ্ন কর, কেন আত্মসমর্পণ, কেন অপেক্ষা, কেন সমুদ্র। আজ অনেকদিন পর মনে হলো, আমি কারো সঙ্গে সত্যিকারের কথা বলছি। আমারও তাই মনে হয়েছে, আইনো। আমি এসেছিলাম একটা দুর্গ দেখতে। কিন্তু ফিরে যাচ্ছি একটা মানুষকে চিনে। সে মুখ তুলে তাকালো। চোখদুটো ভেজা, কিন্তু ঠোঁটে হাসি। সাড়ে পাঁচটার ফেরি ধরার জন্য আমরা ধীরে ধীরে জেটির দিকে হাঁটলাম। কেউ তাড়াহুড়ো করছিলাম না। পথে আইনো একটা ছোট্ট বুনো ফুল তুলে নিল, হালকা নীল, নাম জানাল কেলো, ব্লুবেল ধরনের। সেটা আমার শার্টের বুকপকেটে গুঁজে দিলো।

স্মৃতি হিসেবে। শুকিয়ে গেলেও ফেলবেনা। ফেরিতে আবার খোলা ডেকে বসলাম। এবার বাতাস শান্ত। সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়েছে, কিন্তু উত্তরের গ্রীষ্মে সে সহজে ডোবে না, শুধু আলোটা ঘন সোনালি হয়ে যায়, মধুর মতো। সেই আলোয় জল যেন গলানো সোনা। পেছনে সুওমেনলিন্নার দেয়ালগুলো ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে, গির্জার চূড়াটা তখনো স্পষ্ট। সামনে হেলসিঙ্কির তটরেখা আবার ফুটে উঠলো, তবে সকালের থেকে আলাদা। ক্যাথেড্রালের সাদা দেয়াল এখন গোলাপি আভায় রাঙা, উসপেনস্কির সোনালি গম্বুজ যেন আগুন ধরে আছে। জেটির ধারে মানুষের ভিড়, কেউ বসে আইসক্রিম খাচ্ছে, কেউ গিটার বাজাচ্ছে।

আইনো আমার কাঁধের কাছে একটু সরে এসে বসল। আমরা কেউ কথা বলছিলাম না। কিছু মুহূর্তে কথার দরকার হয় না। শুধু ইঞ্জিনের গুঞ্জন, জলের ছলছল, আর দুজন মানুষের পাশাপাশি নীরব থাকা। এক সময় সে আস্তে বললো, 

—সিগালগুলো দেখো। ওরা সারাদিন সমুদ্রে ঘোরে, কিন্তু সন্ধ্যায় ঠিক ফিরে আসে।

মানুষও ফিরে আসে, আইনো। যদি ফেরার মতো কোনো জায়গা থাকে। সে আমার দিকে এক পলক তাকিয়ে চোখটা নামিয়ে নিলো। ফেরি থেকে নেমে কাউপ্পাতোরি পেরিয়ে আমরা হোটেলের দিকে হাঁটলাম। এসপ্লানাদি পার্কে তখন সন্ধ্যার ভিড়, একটা খোলা মঞ্চে কেউ অ্যাকর্ডিয়নে একটা বিষণ্ন ফিনিশ ট্যাঙ্গো বাজাচ্ছিল। আইনো বলল, ফিনিশরা ট্যাঙ্গো ভালোবাসে, কারণ ট্যাঙ্গোর সুরে আনন্দ আর বেদনা একসঙ্গে থাকে, ঠিক ওদের মনের মতো। হোটেলের দরজার সামনে এসে আমরা থামলাম। 

আইনো দুহাত জ্যাকেটের পকেটে ঢুকিয়ে বললো, আমার কাজ এখানেই শেষ। আমি পকেট থেকে একটা ছোট্ট জিনিস বের করলাম। সকালে মার্কেট স্কোয়ারে তার অলক্ষ্যে কিনেছিলাম, কাঠের তৈরি একটা ছোট্ট নৌকা, হাতে খোদাই করা। তোমার বাবার নৌকার কথা শুনে মনে হলো এটা তোমার কাছেই থাকা উচিত। আইনো নৌকাটা হাতে নিলো। অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলো। তারপর তার চোখ থেকে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো।

—তুমি খুব অন্যায় করছো, সে ভাঙা গলায় বললো। একদিনে কাউকে এতোটা মনে জায়গা দিতে নেই। সে কান্না আর হাসি মিশিয়ে হেসে ফেললো। সামনে এগিয়ে এসে আমার একটা হাত ধরল। বাল্টিকের বাতাসে এলোমেলো তার চুল থেকে সমুদ্র আর দারুচিনির গন্ধ বেরোচ্ছিল। ফিনিশ ভাষায় বিদায়ের অনেক শব্দ আছে, সে বললো। কিন্তু আমি সেগুলো বলবো না। আমি বলবো, নাহদ্যান তাস। মানে, আবার দেখা হবে।

—নাহদ্যান তাস, আইনো। আমি বললাম। সে ঘুরে দাঁড়ালো, হাঁটতে শুরু করলো পার্কের দিকে। কয়েক পা গিয়ে থামলো, পেছন ফিরে হাত নাড়লো। হাতে ধরা সেই ছোট্ট কাঠের নৌকা। তারপর লিন্ডেন গাছের ছায়ায় সে হারিয়ে গেল।

ভ্রমণ-টীকা

যাতায়াত: হেলসিঙ্কির মার্কেট স্কোয়ার (কাউপ্পাতোরি) থেকে সারা বছর ফেরি চলে, যাত্রা মোটামুটি ১৫-২০ মিনিট। হেলসিঙ্কির সাধারণ গণপরিবহন টিকেটেই যাওয়া যায়।

যা দেখবেন: মহাআঙিনা ও এহরেন্সভার্ডের সমাধি, কিংস গেট, কুস্তানমিয়েক্কার প্রাচীর ও সুড়ঙ্গ, সাবমেরিন ভেসিক্কো, বাতিঘর-গির্জা, সুওমেনলিন্না মিউজিয়াম।

যা খাবেন: লোহিকেইত্তো (স্যামন স্যুপ), কারেলিয়ান পাই, পোরোনক্যারিসতুস (হরিণের মাংস), আর বিকেলে কফির সঙ্গে কোরভাপুস্তি।

পরামর্শ: আরামদায়ক জুতো পরুন, পথ পাথুরে ও উঁচু-নিচু। গ্রীষ্মেও সমুদ্রের বাতাসে একটা হালকা জ্যাকেট রাখুন। খোলা সময় ও ফেরির সূচি ভ্রমণের আগে একবার দেখে নিন।

শেয়ার করুন