আইপিডি লগো
জাতীয় আবাসন নীতি ২০১৬-এ সবার জন্য সাশ্রয়ী ও নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করার অঙ্গীকার থাকলেও এর বাস্তবায়নে রাষ্ট্রের কার্যকর কর্মপরিকল্পনা নেই। একারণে দেশের নগর এলাকায় আবাসন সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত এবং শ্রমজীবী মানুষের জন্য নিরাপদ, মানসম্মত ও সাশ্রয়ী আবাসনের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। কিন্তু আবাসন বাজারনির্ভর হয়ে পড়ায় নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। একারণে শুধুমাত্র ঢাকাকেন্দ্রীক নীতি দিয়ে সমগ্র বাংলাদেশের আবাসন সংকট সমাধান করা অসম্ভব।
এসব বক্তব্য উঠে আসে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) পক্ষ থেকে দেওয়া এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খানের বিবৃতিতে। এবছর বিশ্ব বসতি দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘সর্বজনীন বাসস্থান, টেকসই নগরায়ণ’ এর পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন করতে সবার জন্যে মানসম্মত ও নিরাপদ আবাসনকে সরকারের অগ্রাধিকার কর্মসূচিতে আনা উচিত।
এতে আরও বলা হয় যে, আইপিডি মনে করে, আবাসনকে শুধু বাজার ও বেসরকারি খাতের উপর ছেড়ে না দিয়ে সরকারকে সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ হিসবে সবার জন্য মানসম্মত ও সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিতে কার্যকর ও সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে হবে। আইপিডির পক্ষ থেকে এর পাশাপাশি বলা হয় বাংলাদেশের আবাসন সংকট শুধু ঢাকার সংকট নয়, এটি জাতীয় নগর ও স্থানিক পরিকল্পনার সংকট। আবাসন বাজারনির্ভর হয়ে পড়ায় নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ছাড়া এই সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। দেশের বিভাগীয় ও জেলা শহরসহ অধিকাংশ পৌর এলাকায় পরিকল্পিত আবাসন কাঠামো গড়ে না ওঠায় অপরিকল্পিতভাবে কৃষিজমি, জলাভূমি ও প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা ধ্বংস করে আবাসন সম্প্রসারণ হচ্ছে। এর ফলে শুধু পরিবেশ ও কৃষিজমির ক্ষতি নয়, শহরগুলোতে জলাবদ্ধতা, যানজট এবং নাগরিক সেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
অন্যদিকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ শিল্প ও কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক শহরগুলোতে বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী মানুষ প্রাতিষ্ঠানিক আবাসনের সুযোগ না পেয়ে বস্তি ও অনানুষ্ঠানিক বসতিতে বসবাস করছেন। বস্তি উচ্ছেদ করে আবাসন সংকট সমাধান করা যাবে না; বরং স্বল্পবিত্ত মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসনের জোগান বাড়ানোর জন্য বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করে যথাযথ উদ্যোগ নেয়া দরকার।
এদিকে সারা দেশের নগর এলাকায় সার্বজনীন আবাসন ও টেকসই নগরায়ন নিশ্চিত করতে আইপিডির পক্ষ থেকে নিম্নের সুপারিশ-ও করা হয়। এগুলো হলো উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সিটি কর্পোরেশন, গণপূর্ত অধিদপ্তরসহ যেকোনো সরকারি কিংবা বেসরকারি আবাসন প্রকল্পে সর্বনিম্ন ১০ থেকে ১৫ শতাংশ জমি অথবা নির্মিত ফ্ল্যাট/ডুয়েলিং ইউনিট নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্তদের জন্য সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। একই সাথে রাষ্ট্রকে নগর পরিকল্পনার মাধ্যমে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য ভূমির পর্যাপ্ত জোগান নিশ্চিত করতে হবে। শহরের বস্তির ও অনানুষ্ঠানিক বসতিগুলোকে কোনো স্থায়ী বিকল্প না দিয়ে রাতারাতি উচ্ছেদ করাটা টেকসই সমাধান নয়। এর বদলে বস্তি ও নিম্ন আয়ের এলাকার মানোন্নয়নের (অন সাইট আপগ্রেডেশন) মাধ্যমে সেখানেই আলো-বাতাস, নিরাপদ পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও চলাচলের পথ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, পাবলিক-প্রাইভেট-কমিউনিটি পার্টনারশিপ মডেল অনুসরণে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য একটি বাজারভিত্তিক টেকসই আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। এই মডেলে সরকার জমি ও নীতিগত সুবিধা দেবে, আর বেসরকারি খাত বিনিয়োগের মাধ্যমে সর্বসাধারণের সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণ করবে। ঢাকাকেন্দ্রিক মাত্রাতিরিক্ত অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্রীকরণ এই শহরের ওপর অনাবশ্যক চাপের মূল কারণ। অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ বাস্তবায়িত হলে ঢাকামুখী অতিরিক্ত মানুষের চাপ কমবে এবং সমগ্র দেশে একটি সুষম ও টেকসই স্থানিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা ও আঞ্চলিক উন্নয়ন: সারা দেশের জন্য জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা আইনের আওতায় একটি সমন্বিত আঞ্চলিক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। প্রতিটি বিভাগীয় ও জেলা শহরকে তাদের ভৌগোলিক সুবিধা অনুযায়ী শিল্প ও আবাসনের সমন্বিত ’গ্রোথ সেন্টার’ হিসেবে বিকাশ করতে হবে। সেই অনুযায়ী আবাসন এর চাহিদা বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন আয়শ্রেণীর জন্য পরিকল্পিত আবাসন এলাকা তৈরি করতে হবে। সাশ্রয়ী আবাসন ফান্ড ও বিশেষ অর্থায়ন: জাতীয় আবাসন নীতি অনুসরণ করে জাতীয় সাশ্রয়ী আবাসন তহবিল গঠন করতে হবে। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য কম সুদে ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণে গৃহনির্মাণের সুযোগ তৈরি করতে হবে। শিল্পাঞ্চল (যেমন: ইপিজেড, অর্থনৈতিক অঞ্চল) ও প্রধান প্রধান শহরের অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য সরকারি উদ্যোগে ভাড়াভিত্তিক সামাজিক আবাসন নির্মাণ নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় নগর সংস্থাসমূহের ক্ষমতায়ন: সকল সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভায় দক্ষ নগর পরিকল্পনাবিদ নিয়োগের মাধ্যমে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন এর মাধ্যমে আবাসন এর জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। জলাভূমি ও কৃষিজমি রক্ষা করে টেকসই আবাসন গড়ে তুলতে হবে এবং পরিবেশবান্ধব ব্লক-ইটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। জাতীয় আবাসন নীতি ২০১৬-এর কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঢাকা-চট্টগ্রাম এর মত বড় শহর থেকে শুরু করে দেশের প্রান্তিক পৌরসভা পর্যন্ত সুষম অবকাঠামো, নাগরিক সুবিধা ও সাশ্রয়ী আবাসন সুবিধা ছড়িয়ে দেওয়াই হলো টেকসই ও বৈষম্যহীন নগর বাংলাদেশ গড়ার একমাত্র পথ। আবাসনকে সরকারের রাজনৈতিক প্রাধিকারে নিয়ে আসা দরকার। সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়ন এর মাধ্যমে সরকারকে দেশের নগর এলাকায় আবাসন এর সংকটের টেকসই সমাধান করতে হবে বলে মনে করে আইপিডি।