মেডিকেইড
নতুন ফেডারেল নিয়মে নিউইয়র্ক সিটিতে মেডিকেইড নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। শহরের প্রায় ৩৬ লাখ মেডিকেইড গ্রাহকের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯ লাখ মানুষ কভারেজ হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। তবে এই ৯ লাখ মানুষ নিশ্চিতভাবে মেডিকেইড হারাবেন না। নতুন নিয়মের শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে কিংবা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা না দিলে তাদের স্বাস্থ্যবীমা বাতিল হতে পারে। বিশেষ করে নতুন প্রশাসনের পরিবর্তিত নিয়মের কারণে ভাষাগত ও তথ্যগত সহায়তার অভাবে অনেক বাংলাদেশি অভিবাসীও স্বাস্থ্যবীমা হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সংকট সামনে এলেও বাংলাদেশি কমিউনিটির শীর্ষস্থানীয় সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে এখনো ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম, মেডিকেইড নবায়নে সহায়তা, আইনি পরামর্শ কিংবা সরকারি সংস্থার সঙ্গে সমন্বিত কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। নিউইয়র্ক সিটির অন্যতম বৃহৎ বাংলাদেশি সংগঠন বাংলাদেশ সোসাইটির ভূমিকা নিয়েও তাই প্রশ্ন উঠছে। কমিউনিটির বিভিন্ন অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও অন্যান্য কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হলেও, হাজার হাজার বাংলাদেশি অভিবাসীর স্বাস্থ্যবীমা রক্ষার মতো জরুরি বিষয়ে সংগঠনটি কেন কোনো বড় কর্মসূচি নিচ্ছে না, এ নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করছেন অনেকে।
কমিউনিটির সদস্যদের মতে, শুধু অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্যেই একটি সামাজিক সংগঠনের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। সংকটের সময় সদস্যদের পাশে দাঁড়ানো, সরকারি সুবিধা সম্পর্কে সচেতন করা এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে সহায়তার ব্যবস্থা করাও সংগঠনগুলোর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। মেডিকেইড নিয়ে সম্ভাব্য এই সংকট আরও গভীর হওয়ার আগেই বাংলাদেশ সোসাইটিসহ কমিউনিটির অন্যান্য সংগঠনকে জরুরি ভিত্তিতে মাঠে নামার দাবি উঠেছে।
নতুন নিয়মে ১৯ থেকে ৬৪ বছর বয়সী নির্দিষ্ট মেডিকেইড গ্রাহকদের মাসে অন্তত ৮০ ঘণ্টা কাজ, চাকরির প্রশিক্ষণ, কমিউনিটি সার্ভিস অথবা পড়াশোনায় যুক্ত থাকার প্রমাণ দিতে হবে। নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে মাসিক আয় অন্তত ৫৮০ ডলার হলেও এই শর্ত পূরণ হয়েছে বলে বিবেচিত হতে পারে। নতুন আবেদনকারীদের জন্য নিয়মটি কার্যকর হবে ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে। বর্তমানে মেডিকেইড থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে নবায়নের সময় নতুন শর্ত প্রযোজ্য হবে এবং প্রথম দফায় পরিবর্তন শুরু হবে ১ মার্চ ২০২৭ থেকে।
আরও বড় পরিবর্তন হলো, নির্দিষ্ট কর্মক্ষম বয়সী গ্রাহকদের বছরে একবারের পরিবর্তে প্রতি ছয় মাসে মেডিকেইড নবায়ন করতে হতে পারে। ফলে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সময়মতো নথি জমা দিতে না পারলে কভারেজ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে। নতুন নিয়মের কারণে প্রশাসনিক কাগজপত্রের বোঝা বাড়বে বলে নিউইয়র্ক সিটি হেলথ ডিপার্টমেন্টও সতর্ক করেছে।
নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটিতেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্বল্প আয়ের বহু পরিবার, বয়স্ক বাবা মা, সন্তান এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে এমন সদস্য মেডিকেইডের ওপর নির্ভরশীল। স্বাস্থ্যবীমা হারালে চিকিৎসা, ওষুধ ও হাসপাতালের ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য বড় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে নতুন কাজের শর্ত সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। গর্ভবতী নারী, ১৪ বছরের কম বয়সী সন্তানের বাবা মা বা অভিভাবক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং গুরুতর চিকিৎসাগত প্রয়োজন রয়েছে এমন কিছু গ্রাহক ছাড় পেতে পারেন। মাদক বা অ্যালকোহল নিরাময় কর্মসূচিতে থাকা ব্যক্তি, নির্দিষ্ট সরকারি সহায়তা কর্মসূচির আওতাভুক্ত মানুষ এবং সম্প্রতি কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া নির্দিষ্ট ব্যক্তিরাও ছাড়ের আওতায় পড়তে পারেন।
বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো স্ন্যাপ বা খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির সঙ্গে মেডিকেইডের নতুন নিয়মের সম্পর্ক। যারা স্ন্যাপের কাজের শর্ত পূরণ করছেন অথবা নগদ সহায়তা কর্মসূচির নিয়ম মেনে চলছেন, তাদের ক্ষেত্রে মেডিকেইডের নতুন কাজের শর্ত থেকে ছাড় পাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। তবে এই ছাড় প্রযোজ্য কি না, তা সরকারি নথির মাধ্যমে নিশ্চিত করা জরুরি। আয়ের তথ্য যাচাইয়ের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আসছে। নিউইয়র্ক স্টেট গ্রাহকদের সম্মতি থাকলে বেতন সংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের জন্য একটি বেসরকারি তথ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে। এর ফলে নিয়োগকর্তার বেতন সংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করে কাজের শর্ত পূরণের বিষয়টি যাচাই করা সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে গ্রাহকদের নিজের তথ্য সঠিক রাখা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
অভিবাসীদের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে। ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে ফেডারেল সরকার গ্রিন কার্ড না থাকা কিছু শরণার্থী, অ্যাসাইলি এবং অন্যান্য বৈধ অভিবাসী শ্রেণির মেডিকেইডের জন্য ফেডারেল অর্থায়ন বন্ধ করেছে। তবে নিউইয়র্কের নিজস্ব আইনি সুরক্ষার কারণে সংশ্লিষ্ট অনেকেই মেডিকেইড কভারেজ ধরে রাখতে পারবেন। তাই ফেডারেল অর্থায়ন বন্ধ হওয়া মানেই নিউইয়র্কে তাদের মেডিকেইড তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়।
নতুন ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে প্রশাসনিক জটিলতা। কাজ, প্রশিক্ষণ, পড়াশোনা বা ছাড় পাওয়ার যোগ্যতার প্রমাণ সময়মতো জমা না দিলে যোগ্য ব্যক্তিও মেডিকেইড হারাতে পারেন। তাই সরকারি চিঠি ও নোটিশ নিয়মিত দেখা, যোগাযোগের তথ্য হালনাগাদ রাখা এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আগে থেকেই প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নিউইয়র্ক স্টেট ইতোমধ্যে সম্ভাব্যভাবে প্রভাবিত গ্রাহকদের কাছে নোটিশ পাঠিয়েছে।
নিউইয়র্ক সিটি হেলথ ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে, গ্রাহকদের সহায়তার জন্য বিনামূল্যে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং বাংলা ভাষাতেও তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। মেডিকেইড নিয়ে সমস্যায় পড়লে বা নিজের ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম প্রযোজ্য কি না বুঝতে না পারলে স্বাস্থ্য বিভাগের পরামর্শদাতার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে। সহায়তার জন্য ৩৪৭ ৬৬৫ ০২১৪ নম্বরে ফোন করা যায়।
২০২৭ সালের পরিবর্তন এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি, কিন্তু প্রস্তুতির সময় শুরু হয়ে গেছে। বিশেষ করে নিউইয়র্কের বাংলাদেশি পরিবারগুলোর জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো নতুন নিয়ম নিজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি না তা জানা, সরকারি নোটিশের জবাব সময়মতো দেওয়া এবং কাজ বা ছাড়ের প্রমাণ সংরক্ষণ করা। কারণ নতুন ব্যবস্থায় মেডিকেইড হারানোর কারণ শুধু যোগ্যতা হারানো নয়, সময়মতো সঠিক তথ্য দিতে ব্যর্থ হওয়াও হতে পারে।